kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

রাজনীতিকে ওরা কোথায় নিয়ে গেছে

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৩ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রাজনীতিকে ওরা কোথায় নিয়ে গেছে

রাজনীতি নিয়ে একসময় মানুষের আগ্রহ ছিল। মানুষ রাজনীতিবিদদের শ্রদ্ধা করত। তাঁদের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগ করার মাধ্যমে জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে স্থির থাকতে দেখে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীরা ছিলেন মানুষের কাছে একেকজন আদর্শ। কমিউনিস্টরা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারতেন না। কিন্তু মানুষ তাঁদের আশ্রয় দিত। খাওয়ার ব্যবস্থার পর অর্থসংকট থাকলে কিছু অর্থ হাতে তুলেও দিত।

আওয়ামী লীগের বঙ্গবন্ধুর কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণ জেলার একজন নেতাকর্মীও অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে রাজনীতি করতেন। বেঁচে থাকার জন্য এসব দলের নেতাদের ওকালতি, ডাক্তারি ও শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থাকতে দেখা যেত। নেতাদের তেমন কেউই ধনী ছিলেন না। সাধারণ কর্মীরা বেশ কষ্টেই দিন যাপন করতেন। তার পরও মিছিল-সমাবেশে তাঁদের অগ্রণী ভূমিকা দেখা যেত। থানা ও জেলা পর্যায়ের নেতারা যখন সমাবেশে বক্তৃতা করতেন, তখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে শুনত। বড় নেতা এলে তো কথাই ছিল না। তাঁদের বক্তৃতায় দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, সাধারণ মানুষের জীবনের যে ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হতো, তা মানুষকে আকর্ষণ করত। নেতাদের যেমন লেখাপড়া ছিল, মানুষকেও তাঁরা রাজনীতিসচেতন করতে সক্ষম ছিলেন।

রাজনীতিবিদদের সেই ত্যাগ ও তিতিক্ষার পথ ধরেই পাকিস্তানকে একদিন আমরা বিদায় জানাতে পেরেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের মতো সশস্ত্র পন্থায় দেশ স্বাধীন করতে কোটি কোটি মানুষ পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা, বিশেষত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা এবং আরো অসংখ্য নেতার প্রতি মানুষ ছিল সম্পূর্ণরূপে আস্থাশীল। নেতারা রাজনীতিকে মানুষের কাছে মহৎ আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। সে কারণে রাজনীতি বললেই নেতা, নেতা বললেই রাজনীতি বোঝানো হতো। মানুষ রাজনীতিকে মহৎ মিশন হিসেবে দেখেছে। দেশের জন্য মহৎ আদর্শের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ভূমিকা দেশ ও জাতির অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হতো।

কিন্তু এখন রাজনীতির প্রতি মানুষের ধারণা পাল্টে গেছে। এর জন্য জনগণ দায়ী নয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু নতুন রাষ্ট্রের জন্য রাজনীতিকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আদর্শের বিচ্যুতিকেও তিনি কোনো অবস্থায়ই সহ্য করছিলেন না। দলের অনেক এমপি  এবং শীর্ষস্থানীয় নেতাকেও দল থেকে বের করে দিয়েছিলেন। যাঁরা দলের আদর্শবিরোধী কাজ করতেন, যাঁদের ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি করতে দেখা যেত, তাঁদের তিনি প্রকাশ্যে ভর্ত্সনা করতেন, কঠোর ভাষায় সমালোচনাও করতেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দল এবং দেশের রাজনীতিকে জনকল্যাণবাদী আদর্শের ধারায় পরিচালিত করা। তিনি যদি পর্যাপ্ত সময় পেতেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে আমাদের এতটা হতাশ হতে হতো না। ১৯৭৫ সালে তাঁকে হত্যার পর আদর্শবাদী অন্যান্য রাজনীতিবিদকেও হত্যা করা হয়েছে কিংবা জেলে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সদম্ভে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিবিদদের জন্য আমি রাজনীতি কঠিন করে দেব।’ তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন না। রাতারাতি রাজনীতিবিদ হওয়াও যায় না। কিন্তু ক্ষমতা দখল করে তাঁকে রাজনীতির পোশাক তো পরতে হয়েছে। দল গঠন করতে হয়েছে, নেতা জোগাড় করতে হয়েছে, ওই সব নেতার নেতা হয়েছেন তিনি। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল ও নেতা গঠনের প্রকল্প—যাঁদের দেশপ্রেম, রাজনীতির অতীত আদর্শ, জনকল্যাণবাদী চিন্তাধারার কোনো প্রয়োজন পড়েনি। এই ধারাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে গেলে মূলধারার রাজনীতি দুর্বল ও ক্ষীণ হতে হতে একসময় বিলুপ্ত হয়েছে বললে খুব বেশি অন্যায় করা হবে না। এখন রাজনীতিতে রাজনীতি নেই, রাজনীতিবিদও নেই, আদর্শও নেই। তবে যাঁদের আমরা এখন রাজনীতিতে দেখি, তাঁদের বেশির ভাগেরই জীবন-জীবিকার সঙ্গে অর্থবিত্ত মুখ্য হয়ে ওঠে। অর্থবিত্ত কামাই করতে তাঁদের কোনো সমস্যা নেই। রাজনৈতিক দলে নাম লেখাতে পারলেই টাকা কিভাবে নিজের পকেটে আনতে হয় সেটি তাঁরা খুব ভালো করে জানেন, টাকা হলে অনেক মৌমাছি জোটে। নিজের হাতে মৌমাছির চাক থাকলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মোটেও সমস্যা হয় না। গত প্রায় চার দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমনই এক চরিত্র ও চিত্র লাভ করেছে, যা থেকে বাদ পড়ছে না বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া আদর্শের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপির অবস্থা নতুন করে কিছু বলার নেই। এমনকি একসময়ের আদর্শবাদী রাজনৈতিক দলগুলো এখন রাজনীতির মাঠে নেই। সেগুলোও নানা ভাগে বিভক্ত, জীবন-জীবিকার টানাপড়েনে হারিয়ে যেতে বসেছে।

দুঃখ হচ্ছে আওয়ামী লীগের জন্য। কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনা সবাইকে হতবাক করেছে।  কালের কণ্ঠ গত রবিবার ‘ভাইকে নিজের দলীয় পদ লিখে দিয়েছেন এমপি’ শিরোনামে একটি চমকপ্রদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, রাজবাড়ী-১ আসনের কয়েকবারের সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী কেরামত আলী গত নির্বাচনের আগে ছোট ভাইকে দলীয় পদ লিখে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ছোট ভাই বড় ভাইকে চাপ দিয়েই কাজটি করিয়ে নিলেন। বড় ভাই জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। স্ট্যাম্পে ছোট ভাইকে সেই পদ ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করলেন। অথচ গোটা জেলা কমিটি কিছু জেনেও জানতে পারেনি। ছোট ভাই বড় ভাইকে রাজনীতিতেও কোণঠাসা করে ফেলেছেন। তাহলে অন্যদের অবস্থা কী হতে পারে, তা অনুমান করা যেতে পারে।

আরেকজন এমপির কথা সম্প্রতি আরেকটি পত্রিকায় বেশ গুরুত্ব দিয়েই প্রকাশ পেয়েছে। নাটোরের একটি আসনের সম্মানিত সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক উত্থানের কথা এসেছে পত্রিকায়। নাটোরে প্রভাব বিস্তার এবং দলের ও অঙ্গসংগঠনের সব পদ-পদবিতে পরিবারের সব সদস্য-সদস্যা, নিকটাত্মীয়-স্বজনকে বিভিন্ন পদে আসীন করানো এবং দেশে-বিদেশে বিলাসী বাড়িঘর, বিত্ত-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির যে বিবরণ উঠে এসেছে, তাতে মনে হয় নাটোরে আলাদিনের চেরাগ একটি নয়, অসংখ্য জ্বলে উঠেছে। কিন্তু বাতি নিভে গেছে আওয়ামী লীগের ঘরে ঘরে। রাজনীতি করতে পারছে না। যাঁর নাম আগে দেশের কেউ জানত না, এখন তাঁর ‘পারিবারিক ক্যারিসমা’ দেখে সবাই বিস্মিত, এমন গুণধর এমপি থাকলে দেশে তো আর গরিব লোক থাকার কথা নয়। সবারই আলিশান বাড়িঘর, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি দেশে-বিদেশে হয়ে যাওয়ার কথা। যিনি নিজের জন্য এত কিছু করতে পারেন, তিনি পরের জন্য পারবেন না, সে তো হয় না। তবে তিনি পারেন তাদের জন্যই করতে, যারা তার লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্য হতে পারে। খবরে প্রকাশ, শফিকুল ইসলামের কারণে নাটোরের রাজনীতি এখন আর আগের জায়গায় নেই। যাঁরা ত্যাগী ছিলেন, তাঁরা পেড়ে উঠছেন না। দল তাহলে কাদের সুরক্ষা দেবে?

এ ধরনের তথ্য আরো অনেক সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বারের খাতা খুললেই পাওয়া যাবে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমে অনেক রথী-মহারথীর প্রভাব, দুর্নীতি, টাকা লুটপাট, দলকে হাতের মুঠোয় নেওয়ার যথেষ্ট নজির রয়েছে। তাঁরা নিজেরা অর্থবিত্ত খাচ্ছেন, দলকেও খেয়ে আদর্শ ও জনশূন্য করে ফেলেছেন। অথচ দলের সভাপতি শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনায় যে দক্ষতা ও অর্জন দেশের সাধারণ মানুষ ও সারা বিশ্বকে দেখাতে পেরেছেন, তাতে এই সব রথী-মহারথীর মনে হয় কিছুই যায়-আসে না। কিন্তু তাঁদের কারণেই দলকে অনেক সমালোচনা শুনতে হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে তাঁদের দুর্নামের ভাগ আওয়ামী লীগকে নিতে হতে পারে। সুতরাং তাঁদের তাড়িয়ে দলের সভাপতি যোগ্য, সৎ, মেধাবী, আদর্শবান, বিনয়ী এবং রাজনীতিসচেতন নেতাদের সামনে নিয়ে আসবেন, সেটিই আওয়ামী লীগের শুভানুধ্যায়ীদের একান্ত কামনা।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা