kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

আবাসিক হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা গ্রহণ কাম্য নয়

ড. মোহা. হাছানাত আলী

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মহামারি কভিডের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও তছনছ হয়ে গেছে। দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পর সরকারি সিদ্ধান্তে গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মান্য করার কথা বলা হয়েছে। এসংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সুখবর নেই। কিন্তু দেশের ছোট-বড় প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিকভাবে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা জোরালোভাবে বলা হলেও তা যে পুরোপুরি প্রতিপালন করা হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। পরীক্ষার হলে হয়তো শিক্ষকদের চাপে শিক্ষার্থীরা মাস্ক পরতে বাধ্য হচ্ছে; কিন্তু কক্ষের বাইরে এসেই তারা মাস্ক খুলে পকেটে রাখছে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। শারীরিক দূরত্ব প্রতিপালন করার কোনো আগ্রহ তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের এমন দায়িত্বহীন আচরণ করোনা ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে দেশের অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিকভাবে পরীক্ষা চলমান থাকলেও আবাসিক হলগুলো এখনো বন্ধ। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্থানীয় মেস মালিকের বিভিন্ন অন্যায় ও অন্যায্য শর্ত মেনে নিয়ে মেসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। মেস মালিকের বিভিন্ন অন্যায় শর্ত মেনে নিয়ে হলেও শিক্ষাজীবন দ্রুত শেষ করার জন্য তারা একটি কক্ষে গাদাগাদি করে বসবাস করতে অনেকটা বাধ্য হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুজনের কক্ষে চারজন আবার চারজনের কক্ষে ছয়-সাতজন অবস্থান করছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে একজন ছাত্রের মেসে এক মাস অবস্থান করার প্রয়োজন হলেও তিন মাসের কম সময়ের জন্য শিক্ষার্থীদের মেস ভাড়া দেওয়া হচ্ছে না। এতে একদিকে তাদের যেমন শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে বেশির ভাগ মেসের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বাড়িয়ে তুলছে। আমরা জানি, করোনায় গ্রামের মানুষের আয়-রোজগার বহুগুণে কমে গেছে। ফলে সন্তানদের বাড়তি শিক্ষা ব্যয় অভিভাবকদের মাথাব্যথার আরেকটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হলগুলো খুলে দেওয়া হলে অভিভাবকরা তাঁদের এই বাড়তি চাপ থেকে রক্ষা পেতেন। অন্যদিকে যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলগুলো খুলে দেওয়া হতো, তাহলে সেখানকার পরিবেশ নিঃসন্দেহে মেসের পরিবেশের চেয়ে অনেক উন্নত হতো। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা সহজ হতো। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে ছেলেমেয়েরা হলে থাকতে পারত। কিন্তু হল বন্ধ রেখে শারীরিকভাবে পরীক্ষা গ্রহণ কতটা যৌক্তিক? কতটা মানবিক?

তার পরও এটা ভেবে ভালো লাগে, হল খুলে দিতে না পারলেও শিক্ষার্থীরা অন্তত দীর্ঘ সেশনজটের কবল থেকে রেহাই পাবে, পরীক্ষাজট থেকে মুক্ত হবে। তবে এটা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে হল বন্ধ রেখে শারীরিকভাবে পরীক্ষা গ্রহণ কোনোভাবেই—মানবিক বা চিকিৎসাবিজ্ঞান—কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রত্যাশিত নয়।

হল বন্ধ রেখে যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা বেপরোয়াভাবে স্বাস্থ্যবিধি ভঙ্গ করছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। করোনা দেশ থেকে চলে গেছে বা করোনার ঝুঁকি কমে গেছে, তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। বরং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা করোনার তৃতীয় ঢেউ আসা নিয়ে বেশ শঙ্কিত।

বিশেষজ্ঞ কমিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে যেসব শর্তের কথা বলেছিল তার বেশির ভাগই বর্তমানে শিক্ষাঙ্গনে প্রতিপালিত হচ্ছে না বা হতে দেখা যাচ্ছে না। গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটকের সামনে অভিভাবকদের উপচে পড়া ভিড় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। অভিভাবকদের এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিত। দেশে এই মুহূর্তে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার নিম্নমুখী। তাই অনতিবিলম্বে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খুলে দিয়ে শারীরিকভাবে ক্লাস ও পরীক্ষা যত দ্রুত শুরু করা যাবে, ততই মঙ্গল। সুখের কথা, এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আবাসিক হলগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মেডিক্যাল কলেজগুলোর হোস্টেলও খুলে দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও অতি দ্রুত তাদের আবাসিক হল খুলে দেবে এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করে ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করবে বলেই বিশ্বাস। তবে স্বাস্থ্যবিধি মান্য করার ব্যাপারে কোনো আপস করা চলবে না।

লেখক : অধ্যাপক, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]



সাতদিনের সেরা