kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বিশ্বসভায় বাংলা ভাষায় বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা

সৌমিত্র শেখর

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিশ্বসভায় বাংলা ভাষায় বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা

বাংলা ভাষার বিশ্বপরিচিতি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে। যে বইটির জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, সেটি ইংরেজিতে লেখা ‘সঙ্ অফারিংস’। বিশ্বসভায় বাংলা ভাষা উচ্চারণ প্রথম করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, একেবারে জাতিসংঘের সাধারণ সভায়, ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। বৃহত্তম বিশ্বদরবারে এর আগে বাংলা ভাষা আর এভাবে উপস্থাপিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক, যিনি জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন। সেই ধারাবাহিকতায় পরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে বাংলায় বক্তৃতা করেন। এবারও তিনি জাতিসংঘে বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছেন।

জাতিসংঘের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বাংলা আগেও উচ্চারিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও তেমনটি করেছিলেন ১৯৫২ সালের অক্টোবরে চীন দেশে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু এ প্রসঙ্গে লিখেছেন : ‘পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান সাহেব ইংরেজি করে দিলেন। ইংরেজি থেকে চীনা, রুশ ও স্প্যানিশ ভাষায় প্রতিনিধিরা শুনবেন। কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করলেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ায় অন্যান্য দেশেও আমি কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য।’ এই স্বাজাত্য ও ভাষাপ্রীতির জন্যই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই শুধু করেননি, আন্তর্জাতিকভাবেও এর প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।

জাতিসংঘের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের আগে বঙ্গবন্ধুর নাম ঘোষিত হলে বিশ্বনেতারা ব্যাপক করতালি দিয়ে তাঁঁকে অভিনন্দিত করেন এবং বঙ্গবন্ধু বক্তৃতামঞ্চে উঠে মাথা নুইয়ে সেই শুভেচ্ছার প্রত্যুত্তর দেন। তিনি জাতিসংঘকে ‘মানবজাতির পার্লামেন্ট’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধিত্ব লাভ করায় বিশ্বের সবাই যে আন্তরিকভাবে খুশি, সে কারণে তিনি আত্মশ্লাঘাও বোধ করেন। এটিকে তিনি বলেন বাঙালি জাতির জন্য এক ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’। বিশ্বের পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিরুদ্ধবাদের কারণে জাতিসংঘের সদস্য পদ পেতে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পর প্রায় পৌনে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু জাতিসংঘের সনদেই আছে মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থনের কথা। বিশ্বসভায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানে জাতিসংঘের এই বিলম্বকে পরোক্ষভাবে স্মরণ করিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু। এটি কম সাহসের কথা নয়। তিনি বলেন, ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সাথে শান্তি ও সৌহার্দ নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন।’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে জাতিসংঘের চেতনারই বাস্তবায়ন, এই কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু মূলত সেদিন পাকিস্তান-চীন-আমেরিকাপন্থী দেশগুলোর অবস্থানের যোগ্য প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, বঙ্গবন্ধু তাঁর এই ভাষণে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার লাখ লাখ বীরযোদ্ধার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে বলেন, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদের সংগ্রাম আর আত্মত্যাগও জাতিসংঘের সনদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, তাই সমর্থনযোগ্য। তিনি উল্লেখ করেন, আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম, গিনি বিসাউ, বাংলাদেশ এই সংগ্রামে বিরাট বিজয় অর্জন করেছে। বঙ্গবন্ধু বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে আরব বিশ্বের মুক্তিকামী দেশগুলো নামিবিয়া, জিম্বাবুয়েসহ ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। এই কথার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু কিন্তু তৎকালীন দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে নিজের অবস্থানও পরিষ্কার করেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর এই ভাষণে জাতিসংঘকে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। একদিকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর অন্যদিকে আণবিক যুদ্ধের প্রস্তুতি যে বিশ্বব্যাপী অমানবিকতাকে ইন্ধন দেয় এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে বৈষম্যের সৃষ্টি করে—এই বিরোধ জাতিসংঘকে সমাধান করতে হবে। বঙ্গবন্ধু আস্থার সঙ্গে বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে মানবিক উন্নয়ন সাধিত হবে না।

বঙ্গবন্ধু যেন বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর মনের কথা তুলে ধরেন, তিনি যেন শোষিতের কণ্ঠস্বর হয়ে জাতিসংঘে আওয়াজ তোলেন। বঙ্গবন্ধু শুধু সমস্যার কথা তুলেই দায়িত্ব শেষ করেননি। তিনি সমাধানের কথাও বলেছেন। সমাধান খুব কঠিন নয়। একগুঁয়েমি ত্যাগ করে দেশগুলো পরস্পরের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেই সংকট সমাধান হবে বলে তিনি মনে করেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের স্বাস্থ্য এবং পরিবারের কল্যাণের জন্য পর্যাপ্ত জীবনযাত্রার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেন এবং নিজ নিজ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করার ডাক দেন। সে সময় দেখা গেছে, দরিদ্র দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ নানা অজুহাতে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো অধিকার করে নিয়ে দরিদ্র দেশগুলোকে অধিকতর দরিদ্র করে তোলে। বঙ্গবন্ধু এর থেকে মুক্তির কথা উচ্চারণ করেছেন।

জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণে বিশ্বশান্তির কথা জোর দিয়ে বলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর সবার প্রতি বন্ধুত্ব নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করেছে। বিশ্বময় যেখানেই শান্তি প্রতিষ্ঠার লড়াই চলে, বাংলাদেশ সেটাই সমর্থন জানায়। মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার খর্ব করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর নয়। প্রতিবেশী ভারত ও নেপালের সঙ্গেই শুধু নয়, পাকিস্তানের সঙ্গেও সৌভ্রাতৃত্বমূলক আচরণ করেছে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান চরমভাবে অমানবিকতা প্রদর্শন করলেও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে, যার মধ্যে ছিল ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দিকে ক্ষমা প্রদর্শন।

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, বাঙালির প্রতি আত্মবিশ্বাস প্রকাশ এবং বাঙালির আত্মশক্তির দৃঢ়ত্ব ঘোষণা। তিনি মানুষের অজেয় শক্তির প্রতি বিশ্বাস রাখতেন। সংগ্রাম ও আত্মদানের মধ্য দিয়েই সব কিছু অর্জন করা সম্ভবপর বলে তিনি মনে করেন। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আমরা দুঃখ ভোগ করিতে পারি কিন্তু মরিব না। টিকিয়া থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করিতে জনগণের দৃঢ়তাই চরম শক্তি। আমাদের লক্ষ্য স্বনির্ভরতা। আমাদের পথ হইতেছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও যৌথ প্রচেষ্টা।’ বঙ্গবন্ধু সে সময়ই বলেছিলেন যে নতুনকালের উদয় হচ্ছে। যে ‘নতুন বিশ্বের অভ্যুদয়ে’র কথা বঙ্গবন্ধু আগাম বলেছিলেন, আজ তা বর্তমান। এই ‘নতুন বিশ্বে’র চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সত্যি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জনতার ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। এই ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু মূলত বাংলা ভাষায় বাঙালির অধিকারই ঘোষণা করেন বিশ্বসভায়।

 লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা