kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

শিশুদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক

রাসেল ভিনার

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যুক্তরাজ্যে টিকাদানের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মূল ভূমিকা রাখে সরকারের ‘জয়েন্ট কমিটি অন ভ্যাক্সিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন’ (জেসিভিআই)। কমিটি পরামর্শ দিয়েছিল, অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা না থাকলে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী সুস্থ শিশুদের কভিড-১৯ টিকা দেওয়ার কোনো মেডিক্যাল গ্রাউন্ড নেই। তাদের মতে, শিশুদের কভিড টিকা দেওয়ার প্রান্তিক উপকার এত কম যে এতে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যুক্তরাজ্যের চার প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তাই (সিএমও) এই বয়সী সব শিশুকে কভিড টিকা দেওয়ার পক্ষে সুপারিশ করেছেন। মূলত জেসিভিআই নাকচ করে দেওয়ার পর শিশুদের পড়াশোনা ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিক বিবেচনা করে তাদের টিকা দেওয়ার সুবিধা-অসুবিধাগুলো খতিয়ে দেখতেই চার সিএমওর পরামর্শ চেয়েছিলেন ব্রিটিশ স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা মন্ত্রী।

উঠতি তরুণদের টিকাদানের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই ঝুঁকি ও উপকারের ভারসাম্য রাখতে হবে। এর নৈতিক বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে। কারণ শিশুরা সমাজের এমন একটি অংশ, যারা নিজেদের শরীরে গুরুতর কভিড উপসর্গ খুব কমই অনুভব করে।

শিশুদের জন্য উপযোগী কভিড টিকা হচ্ছে শুধু ফাইজার ও মডার্নার এমআরএনএ টিকা। এ দুটি টিকাই এই বয়সীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে হয়। শিশুদের জন্য এদের একটি করে ডোজ দেওয়ার সুপারিশ করেছেন সিএমওরা। ইংল্যান্ডে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশু রয়েছে প্রায় ২৬ লাখ। তাদের মধ্যে তিন লাখ ৫০ হাজার শিশুকে দুই ডোজ টিকা দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে বলা হয়েছে। কারণ তাদের উল্লেখযোগ্য কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা (ক্যান্সার বা অটিজমসংক্রান্ত জটিলতা) রয়েছে, যা তাদের কভিড-১৯ জটিলতার উচ্চ ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

তথ্য-উপাত্ত বলছে, একটি ভ্যাকসিন শট সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রায় ৫৫ শতাংশ কার্যকর। এর ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্য বিভাগ হিসাব করে দেখেছে, যুক্তরাজ্যে টিকাবিহীন ২২ লাখ কিশোরের মধ্যে যদি ৬০ শতাংশকে একটি করে ডোজ টিকা দেওয়া হয়, তাহলে তা আগামী ছয় মাসে এই বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার সংক্রমণ প্রতিরোধ করবে।

শিশুদের টিকা দেওয়ার পেছনে প্রধান দুশ্চিন্তা হচ্ছে জানা-অজানা উভয় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। মূল উদ্বেগটি হলো বিরল হৃদযন্ত্রের প্রদাহ (মায়োকার্ডাইটিস বা পেরিকার্ডাইটিস)। এ ক্ষেত্রে মার্কিন উপাত্ত বলছে, ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছেলেদের মধ্যে প্রতি ১০ লাখে ১৬০টি এবং মেয়েদের মধ্যে প্রতি ১০ লাখে ১৩টি বিরল হৃদযন্ত্রের প্রদাহের ঘটনা ঘটে। তা-ও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় শট নেওয়ার পরে এবং খুব সামান্য পরিমাণে দেখা দেয়। কয়েকজনের ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের ছন্দের (হার্ট রিদম) সমস্যা দেখা গেলেও খুব কম ক্ষেত্রেই গুরুতর কিছু হয়েছে। আর অজানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই দুর্লভ।

আমি ও আমার সহকর্মীরা মহামারির প্রথম বছর থেকে পুরো ইংল্যান্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করেছি। তাতে দেখা গেছে, কভিডে আক্রান্ত হয়ে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে একই সময়ে এক লাখের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক কভিডে মারা যায়। যদিও একটি শিশুর মৃত্যুও অনেক বেশি কিছু, তার পরও বলতে হয় যে এই ৯ জনের মধ্যে সাতজনের মৃত্যুর সঙ্গে তাদের অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যারও সম্পর্ক ছিল এবং তাদের টিকা নেওয়ার দরকার ছিল। এ ছাড়া একই বছরে যে ১৫০ জন উঠতি কিশোর-কিশোরীকে কভিডসংক্রান্ত জটিলতায় আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল, তাদের বেশির ভাগেরও অন্যান্য জটিলতা ছিল।

এই সংখ্যাগুলো একত্র করলে এটা স্পষ্ট যে ইংল্যান্ডে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের এক ডোজ টিকা দেওয়া সম্ভব হলে আগামী এক বছরে অন্তত দুটি মৃত্যু এবং ৩০-৪০ জনকে আইসিইউতে ভর্তি প্রতিরোধ করবে। তবে উপকারটা পাওয়া যাবে ১৭০ থেকে ১৮০টি মায়োকার্ডাইটিস কেসের বিনিময়ে, যদিও এর সবই হালকা পরিমাণে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য টিকা দেওয়ার বৃহত্তর উপকারের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, যেটি সিএমওদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। টিকাদান শিশুদের সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা হ্রাস করবে এবং স্কুল থেকে দূরে থাকার আশঙ্কাও হ্রাস করবে। আরেকটি প্রত্যাশা হলো শিশুদের টিকাদান ডেল্টা ভেরিয়েন্টের মতো ভয়াবহ সংক্রমণ আটকাতে পারবে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, টিকা দেওয়ার ব্যাপারে শিশুদের ব্যক্তিগত সুবিধা কম। কিন্তু বৃহত্তর উপকারটা সুনির্দিষ্টভাবে শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি এই সিদ্ধান্তকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি। কারণ এ সিদ্ধান্ত এমন সময় নেওয়া হয়েছে, যখন চূড়ান্তভাবে আমাদের কাছে উঠতি কিশোর-কিশোরীদের টিকা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা তথ্য রয়েছে। জরিপ বলছে, দরিদ্র পরিবারগুলোতে টিকা-দ্বিধাগ্রস্ততা বেশি। এখন শিশুদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক হলেও আমাদের অবশ্যই দ্বিধাগ্রস্ত পরিবারগুলোতে পৌঁছানোর নতুন উপায় উদ্ভাবন করতে হবে।

লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের চাইল্ড হেলথ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা