kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

প্রতারণার নানা কৌশল

ড. মো. সিরাজুল ইসলাম

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রতারণার নানা কৌশল

ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর যেকোনো একটিতে মাত্র আধাঘণ্টা অপেক্ষা করলেই আপনি অন্তত একটি সতর্কতামূলক বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন, যার মর্মার্থ হচ্ছে অতি মুনাফার লোভে কোনো ধরনের সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করবেন না। এই বিজ্ঞাপনটি প্রচারিত হয় ‘আরবিআই’ বা ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার’ পক্ষ থেকে। আর তাতে যাঁরা মডেল হয়ে আসেন, তাঁরা বেশির ভাগই ভারতীয় বাঘা বাঘা ক্রিকেটার অথবা অন্য কোনো স্বনামধন্য খেলোয়াড় বা অভিনেতা-অভিনেত্রী।

এখন এর বিপরীতে বাংলাদেশে কী হচ্ছে একবার দেখে নেওয়া যাক। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ‘স্পন্সর’ হয়ে একাধিকবার টিভিতে বিজ্ঞাপন দিয়েছে এমন কিছু কম্পানি পরবর্তী সময়ে ‘হায় হায়’ কম্পানি হয়ে সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছে। আবার এক স্বনামধন্য ক্রিকেটার মডেল হয়েছেন আরেক প্রতারক কম্পানির। এসব প্রতিষ্ঠান যদি কখনো বাংলাদেশের জাতীয় কোনো দল বা প্রতিষ্ঠানের ‘স্পন্সর’ হয়ে থাকে—আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

সামাজিক দায়বদ্ধতার বোধ বিবেচনায় আমরা ভারতের থেকে পিছিয়ে। যদিও এ ব্যাপারে আমার স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। তার পরও ইন্টারনেট ঘেঁটে যা বুঝলাম, প্রতিবছর বাংলাদেশে যেখানে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে, ভারতে সেই তুলনায় তা বিরল। তার পরও ভারতীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সজাগ। সম্ভবত বাংলাদেশের ঘটনা থেকেই তারা সতর্ক হয়েছে। আর সেখানেই পার্থক্যটি দৃশ্যমান।

কাজ না করে লাভের আশায় বাঙালি হুমড়ি খেয়ে পড়ে—এটা অবশ্যই সত্য। তারপর সেই প্রতারক সংস্থাগুলো বেশ কৌশলে মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে। আর তার একটি উপায় হচ্ছে, গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব কিংবা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে তাদের প্রচার চালানো। আমার এক পরিচিত তাঁর পেনশন ও পরবর্তী সময়ে পৈতৃক জমি বিক্রি করে সব টাকা প্রথমে ‘যুবক’ এবং পরে আরেকটি কম্পানিতে খাটিয়ে নিঃস্ব। বলা বাহুল্য, নিম্নবিত্ত লোকজন অতি লোভ আর তাড়াতাড়ি সহজে বড়লোক হওয়ার মোহে এটি করে থাকে। কিন্তু তার পরও লোকটির যুক্তি ছিল এই যে তিনি টাকা দিয়েছেন এই বিশ্বাসে যে প্রতিষ্ঠানটির বেশ কিছু অনুষ্ঠানে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের অতিথি হিসেবে দেখেছেন। তা ছাড়া মিডিয়ায় তাঁদের বিজ্ঞাপনও হামেশাই প্রচারিত হতো।    

নানা উপায়ে প্রতারণার খবর শোনা যায়। দেশের সর্বোচ্চ মসজিদের ইমামকে দিয়ে সুদের অপকারিতা আর হালাল উপার্জনের প্রয়োজনীয়তার ওয়াজও করায় তারা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। অথচ খোঁজ নিলে দেখবেন তাদের চৌদ্দগুষ্টিতে কেউ ‘হালাল’ উপার্জন করে ‘এক লোকমা’ ভাতও খায়নি। সম্প্রতি এক ইসলামী এমএলএম কম্পানি এভাবে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ধর্মভীরু মানুষের কাছ থেকে। 

নিম্নবিত্তের কথা না হয় বাদই দিলাম, অনেক বিজ্ঞজনও ধোঁকা খেয়েছেন তাদের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকরা জোট বেঁধে জমি কিনেছেন ‘পাহাড়ি শহরে’। টিলার ঢালে ভিলা বানিয়ে আয়েশ করে দখিনা বাতাস খাবেন ভেবে। টাকা দেওয়া শেষ কিন্তু অপেক্ষার আর শেষ হয় না। এত দিনেও সে সিটিতে এক বিঘা জমি নেই কিংবা এক কোদাল মাটিও ফেলা হয়নি।

এসব দেখার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের কি কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই? এই বিজ্ঞাপন, অর্থ আত্মসাৎ—এ সব কিছুই তো হচ্ছে চোখের সামনে। ‘রাষ্ট্রের হাত সবচেয়ে বড়’ আর সেই বিবেচনায় তাদের ধরে অর্থ উদ্ধার করা তো তেমন কঠিন নয়।  কিন্তু একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। দু-একজন ধরা পড়ছে কিন্তু তাদের টাকার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এটা কী করে সম্ভব! ইভ্যালির সব টাকা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যেই ধরে ফেলা হয়েছে প্রতারকচক্রকে। টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। তার পরও কি ভুক্তভোগীরা ফিরে পাবে সেই টাকা?

ভারতে ‘আরবিআই’ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জনগণকে সতর্ক করছে এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পা না ফেলতে। বাংলাদেশে এই দায়িত্বটি কার? এর একটা সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন জনগণকে শিক্ষিত করা, নজরদারি জোরদার করা। প্রতারকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাসহ জনগণের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করাও জরুরি। 

 

লেখক : অধ্যাপক, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও পরিচালক, সেন্টার ফর ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভিসেস নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা