kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

শান্তির পৃথিবী হোক আগামী প্রজন্মের ঠিকানা

এ কে এম আতিকুর রহমান   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শান্তির পৃথিবী হোক আগামী প্রজন্মের ঠিকানা

আজ আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। গত বছর থেকে শুরু হওয়া কভিড-১৯ মহামারির কারণে বিশ্বের সব দেশেই দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে। আমরা জানি, ১৯৮১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরের বছর থেকে সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু ২০০১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২১ সেপ্টেম্বর ওই দিবসটি পালনের জন্য আবার এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা পরের বছর থেকে কার্যকর করা হয়। সেই থেকে বিশ্বের সব রাষ্ট্র ২১ সেপ্টেম্বরে দিবসটি পালন করে আসছে।

দিবসটি উদযাপনের জন্য প্রতিবছরের মতো এ বছরও একটি প্রতিপাদ্য বিষয় (থিম) নির্ধারণ করা হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘একটি ন্যায়সংগত এবং টেকসই বিশ্বকে পুনরুদ্ধার করা’ (‘রিকভারিং বেটার ফর অ্যান ইকুইটেবল অ্যান্ড সাসটেইনেবল ওয়ার্ল্ড’)। কভিড-১৯ মহামারিতে বিপর্যস্ত বিশ্ববাসীর জন্য এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। তবে এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে যদি বিশ্বনেতারা তাঁদের উদার মনমানসিকতা নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তবেই এ বিষয়ে সাফল্য আসতে পারে, করোনা মহামারিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠীকে বিদ্যমান বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। আর বিশ্বশান্তির জন্য যে তা অপরিহার্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কভিড-১৯ মহামারি শুধু মানুষের জীবনই কেড়ে নেয়নি, জীবিকাকে এক কঠিন অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে। যদিও এ বছর আমরা এই মহামারির হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে অনেকটাই সফল হয়ে উঠছি, তবে অর্থনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে যে ধাক্কা এরই মধ্যে লেগেছে তা থেকে পুনরুদ্ধার অবশ্যই খুব সহজ হবে না। এ জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রয়াস, যাতে জীবন ও জীবিকার গতি ফিরিয়ে আনা যায়। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ে লক্ষ্য অর্জনে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে হবে এবং সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে অবশ্যই একটি ন্যায়সংগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই মানবিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দিতে হবে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক গোষ্ঠীকে করোনা মহামারি যেভাবে আঘাত করেছে তা থেকে তাদের উদ্ধার করে যথাযথ পুনর্বাসনের জন্য যত দ্রুত সম্ভব পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

জানা মতে, কভিড-১৯ মহামারির টিকা এখনো পৃথিবীর অনেক দেশের, বিশেষ করে দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশের মানুষের কাছে প্রয়োজন অনুযায়ী পৌঁছেনি। ধনী বা উন্নত বিশ্বের জনগণ টিকার সম্পূর্ণ সুবিধা লাভ করে এই মহামারির হাত থেকে রেহাই পেলেও বিশ্বের টিকা না পাওয়া মানুষের জন্য তাদের করণীয় কি যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে? মানবিকতার আহ্বান কি তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না? নাকি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার উপার্জনের জন্য তারা ওত পেতে বসে আছে? জাতিসংঘের আহ্বানে তারা কতটুকুই বা সাড়া দিচ্ছে? উন্নত দেশগুলো কি তাদের সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে পারে না? ওই সব দেশের মানবতায় বিশ্বাসী জনগণ কি তাদের সরকারের ওপর এ ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে না? তারা একটু এগিয়ে এলেই যে দরিদ্র দেশগুলোর মানুষ এই মহামারি থেকে তাদের রক্ষা করতে পারে।

সন্দেহ নেই, মানবজাতির এই সাধারণ শত্রুর মুখোমুখি আমাদের সবাইকেই হতে হচ্ছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এ সংগ্রামে আমরা একে অপরের শত্রু নই। বিদ্যমান মহামারির হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার দায়িত্ব সবাইকেই সম্মিলিতভাবে নিতে হবে। মহামারিতে এরই মধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে বিশ্ববাসীকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। আর এ জন্য সব বিভেদ, দ্বেষ, হিংসা, যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি ভুলে গিয়ে শান্তির পতাকাতলে সমবেত হতে হবে। আর তাহলেই আমরা কভিড-১৯ মহামারিকে পরাজিত করতে সক্ষম হব। তবে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ সে পথে আমাদের কতটুকু এগোতে দেবে—সে প্রশ্নটি রয়েই যায়।

যতই বলা হোক না কেন, পৃথিবীতে যুদ্ধবিগ্রহ কি থামছে? ক্ষমতার লিপ্সা, আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা যত দিন শক্তিশালী দেশগুলোর মননে সক্রিয় থাকবে, তত দিন বিশ্ব থেকে অস্ত্রের ঝনঝনানি থামবে না। এই যে বিশ্বে এত অশান্তি বিরাজ করছে, সবাই জানে এসব কারা করছে। শান্তিকামী কোনো মানুষ কখনো এসব সমর্থন করতে পারে না। বিশ্বজুড়ে যারা মোড়লগিরি করছে তারাই তো অশান্তির বীজ বপন করে চলছে। তারা ভালো করেই জানে যে তাদের থামাতে কেউ এগিয়ে আসবে না। যদি কেউ এগিয়ে আসে সে ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই অন্য কোনো অভিসন্ধি রয়েছে। শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে অবশ্যই নয়। সবই স্বার্থ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারের স্বার্থ। যদি শান্তিই তাদের কাম্য, তাহলে তো পৃথিবীতে এত সংঘাত আর হানাহানি কবেই দূর হয়ে যেত। শান্তির সুশীতল বাতাসে পৃথিবীর তাবৎ মানুষের মনে এক অপার আনন্দ ঢেউ খেলে যেত।

কভিড-১৯ মহামারি ছাড়াও বিশ্বে, বিশেষ করে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, দক্ষিণ সুদান, ইরাক, লিবিয়া, ইউক্রেন, লেবানন, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে যে অশান্তির উত্তাল তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে তা নিশ্চয়ই বিশ্বে শান্তি স্থাপনে অনেক বড় অন্তরায় হয়ে আছে।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর এ দিবসটি উদযাপনে প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়ে থাকে, সীমিত পরিসরে হলেও এ বছরও এ আয়োজনের ব্যত্যয় ঘটেনি। জনগণকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করাই মূলত এসবের লক্ষ্য। অন্যদিকে যাঁদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই বিশ্বনেতাদেরও আহ্বান জানানো হয় এগিয়ে আসার জন্য। মূলত এসব আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে যায় এ দিবসটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরের বছর ওই দিবসটি আবার উদযাপন না করা অবধি। বাস্তবিক অর্থে কতটুকু অর্জন আসে এসব থেকে তা বলাই বাহুল্য।

তবে আমাদের হতাশ হলে চলবে না। এগিয়ে যেতে হবে সম্মিলিতভাবে বিশ্বের সব মানুষকে। আমাদের লক্ষ্য একটাই, বিশ্বে স্থায়ীভাবে শান্তি স্থাপন। ক্ষমতাশালী মানুষকে শান্তির পথে আনয়নের জন্য আমাদের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। হয়তো একদিন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ কৃতকার্য হবে, তাদের আজকের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

করোনা মহামারির প্রভাব সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে দরিদ্র দেশগুলোকে। এর ফলে অনেক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে এসেছে। তাই আমাদের তাকাতে হবে দরিদ্র দেশগুলোর দিকে, হতদরিদ্র জনগণের দিকে। বিশ্বে শান্তির আবহ সৃষ্টি করতে হলে দারিদ্র্যের ভয়াবহ অবস্থা থেকে তাদের পুনরুদ্ধার করতে হবে, অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে হবে। দরিদ্র মানুষকে অভুক্ত রেখে পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কোনো দিন সম্ভব হবে না। এর চেয়ে দ্বিতীয় কোনো সত্য আমার জানা নেই।

আমাদের প্রয়োজন প্রকৃতির দিকে ফিরে তাকানো, একটি সবুজ-সতেজ ধরণি সৃষ্টি করা এবং তাকে সুরক্ষা দেওয়া। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে গেলে করোনা মহামারির চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে এই বিশ্বকে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব এরই মধ্যে আমাদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। যাদের কর্মফলে পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীকে মাসুল দিতে হচ্ছে, তারা এ ব্যাপারে কী করছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।

এ ছাড়া টেকসই বিশ্ব অর্থনীতির নিশ্চয়তা ছাড়া শান্তির আলো কখনো প্রজ্বলিত হবে না। শান্তি যে মানুষের জন্য, ধরিত্রীর প্রত্যেক সদস্যের জন্য। এখনো কোটি কোটি মানুষ সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। জীবন বাঁচানোর জন্য ন্যূনতম পথও যখন তাদের সামনে খোলা নেই, তখন শান্তি নামের স্বপ্নটির কথা তারা চিন্তাও করতে পারে না। অথচ তারাও এ বিশ্বেরই একজন বাসিন্দা; হোক সে সাদা বা কালো, মুসলমান বা খ্রিস্টান, উন্নত বা অনুন্নত কোনো এক দেশের। তাদের ঠাঁই যেন কোথাও নেই। তাদের একই পরিচয়, বিশ্ব সমাজব্যবস্থায় তারা অবহেলিত। তাদের বাদ দিয়ে বিশ্বে শান্তি স্থাপন করা যাবে না। তাদের সমাজের অন্যদের মতোই নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, একটি সাম্যতার সামাজিক আবহ সৃষ্টির মাধ্যমেই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ অনেকটা সুগম হতে পারে।

মানবজাতির উন্নতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে বিশ্বে শান্তি স্থাপন ছাড়া আর কোনো পথ নেই। জাতি-বর্ণ-ধর্ম-গোত্র-নির্বিশেষে শান্তির আলোকবর্তিকা সব দিকে ছড়িয়ে দিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে শান্তির প্রতি গভীর বিশ্বাস আর আস্থা স্থাপনের মাধ্যমে। আমরা বাংলাদেশের জনগণ সব সময়ই শান্তিতে বিশ্বাস করি, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি আমাদের প্রত্যেকের চলার পথকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে। আমরা বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিটি পদক্ষেপ ও প্রচেষ্টায় আমাদের সর্বস্ব নিয়ে সবার পাশে দাঁড়াতে চাই। আসুন, আমরা সমগ্র বিশ্বকে যুদ্ধবিগ্রহ আর হানাহানি থেকে মুক্ত করে শান্তির ধারায় সিক্ত করি। একটি শান্তির পৃথিবী হোক আগামী প্রজন্মের ঠিকানা—আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসে এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব



সাতদিনের সেরা