kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং রিটেইল শিল্পের ডিজিটাইজেশন

কামরুল হাসান   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং রিটেইল শিল্পের ডিজিটাইজেশন

২০২১ সালে এসে ডিজিটালের ধারণার সঙ্গে পরিচয় ঘটেনি এমন মানুষ বোধ হয় আর পাওয়া যাবে না। বিশ্বজুড়েই চলছে ডিজিটাল প্রযুক্তির দোর্দণ্ড প্রতাপ। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই এই দৌড়ে। ২০০৮ সালে সরকার ঘোষণা দেয় স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে দেশকে তথ্য-প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এ রূপান্তরিত করার। যার ভিত্তিতে নাগরিকদের জীবনমান আধুনিকায়নসহ শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, কর্মপদ্ধতি, শিল্প-বাণিজ্য, উৎপাদন, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রকে ডিজিটালের আওতায় নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতিতে শুরু হয় পথচলা।

গত কয়েক বছরে দেশের তথ্য-প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথডের মূল্য হ্রাস, ইন্টারনেট সহজলভ্যকরণ, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সর্বোপরি বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটেছে। ইট-পাথরের শহর থেকে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে ইন্টারনেট পৌঁছে যাওয়ায় ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প এখন আর কোনো অলীক স্বপ্ন নয়। চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মোট ১২.০৯৫ কোটি।

গত বছর কভিড-১৯ মহামারি বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন স্থবিরতা সৃষ্টি করে, তখন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যেসব দেশ প্রযুক্তিগত বা ডিজিটালভাবে যত এগিয়ে, সেসব দেশ তত দ্রুত করোনা মহামারিসৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পেরেছে। করোনা মহামারির এই সংকটকালে দেশের মানুষ ডিজিটাইজেশনের সুফল সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে ও ডিজিটাইজেশন ত্বরান্বিত হওয়ার ফলে লকডাউন চলার সময় মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়িয়ে ঘরে বসে বেশির ভাগ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পেরেছে। আর এ জন্য বৈশ্বিক মহামারির ভেতরেও সব নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরে দেশে ৭.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ দিয়েছে।

অন্যান্য খাতের মতো দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে করোনাভাইরাসের প্রভাব লক্ষণীয়। বৈশ্বিক মহামারি সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসার ধরনেও এনেছে পরিবর্তন। লকডাউনে গ্রাহকরা ঘরবন্দি থাকলেও অনলাইনে তাদের চলাচল বেড়েছে। দৈনন্দিন বাজার-সদাই থেকে শুরু করে শৌখিন পণ্য এ সময় তারা অনলাইনে অর্ডার করছে। দেশের বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী লকডাউনের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দিয়ে অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। বৈশ্বিক মহামারির আগে অনলাইনে পণ্য কেনার প্রবণতা থাকলেও আলু-পটোলের মতো পণ্যও যে অনলাইনে কেনা যেতে পারে এই ধারণা অনেকেরই ছিল না। গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর অনলাইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কেনাবেচা বেড়েছিল ৩০০ শতাংশ।

দীর্ঘ সময় লকডাউন থাকায় ব্যবসায়ীদের দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী অর্থকষ্টে পতিত হয়েছেন এবং দেশের রিটেইল শিল্প যথেষ্ট ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নিজস্ব হিসাবে, গত বছরের লকডাউনে সারা দেশে ৫৩ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের দৈনিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় এক হাজার ৭৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে মানুষ কেনাকাটায় অনলাইননির্ভর হয়ে পড়ায় দেশের ই-কমার্স খাতে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। মোবাইল ব্যাংকিং থাকার ফলে দেশের যেকোনো প্রান্তে অর্থনৈতিক লেনদেনের সুবিধা সাধারণ মানুষের জীবনে এনে দিয়েছে স্বস্তি। প্রতিদিন বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে আসা অর্ডারের সংখ্যা লাখের কোটা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে যাওয়ায় এবং অনলাইনে অর্ডার করে রংপুরে তৈরি শতরঞ্জি কয়েক দিনেই চট্টগ্রামে বসে হাতে পেয়ে যাচ্ছেন ক্রেতারা। এভাবে প্রান্তিক অঞ্চলের পণ্য উৎপাদনকারীরা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। ব্যবসার ধরন ও ভোক্তা সংস্কৃতির পরিবর্তনের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, রিটেইল খাতের ব্যবসায়ীরা ডিজিটাইজেশনের ভিত্তিতে ব্যবসার নতুন মডেল দাঁড় করানোর পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে তাঁদের ব্যাবসায়িক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন।

একটি ডিজিটালভাবে কানেক্টেড সিস্টেম রিটেইল ব্যবসার ক্ষেত্রে ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা থেকে কর্মীদের সব কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। রিটেইল ব্যবসায় ডিজিটাইজেশনের সুবিধা ভোগ করতে হলে দেশের রিটেইল ব্যবসায়ীদের ক্রেতা ও তাদের ভিন্নধর্মী চাহিদার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। আরো সহজ ভাষায় বললে, একজন ক্রেতার কেনাকাটার সম্পূর্ণ যাত্রা তার চাহিদা ও সুবিধার কথা মাথায় রেখে তৈরি করতে হবে। যেমন—কেউ যদি অনলাইনে অর্ডার করার পর দোকানে এসে পণ্য নিতে চায়, তার জন্য সেই মোতাবেক অনলাইন প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে; আর কেউ যদি কেনাকাটার পুরো প্রক্রিয়াই অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে চায়, তার জন্য সেই বিকল্পব্যবস্থা রাখতে হবে।

অনলাইনে ক্রেতাদের চাহিদা, কেনাকাটার ধরন, পছন্দ ইত্যাদি বুঝতে ‘বিগ ডাটা’সহ এরূপ অন্যান্য সাহায্য গ্রহণ করা যেতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে কেনার নির্দিষ্ট বাটন ও কেনাকাটার অটোমেটিক রিমাইন্ডার বেশ কাজে লাগতে পারে। তবে ডিজিটাইজেশনের ক্ষেত্রে রিটেইল ব্যবসায়ীদের প্রযুক্তির মাধ্যমে কী কী করা যেতে পারে এই চিন্তার পাশাপাশি, ব্যবসায় তা কতটুকু সুফল বয়ে আনবে তা নিয়ে ভাবাও অত্যন্ত জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, ওয়েবসাইটে স্বয়ংক্রিয় চেক-আউট প্রক্রিয়া ও স্মার্ট মিরর চালু করার প্রযুক্তি থাকলেও এগুলো বেশ ব্যয়বহুল। এসব ক্ষেত্রে অন্য ব্যবসায়ীদের অনুকরণ করে স্রোতে গা ভাসিয়ে নিজের ক্ষতি করা যাবে না।

অনলাইনে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আগ্রহের প্রধান কারণ এর সহজতর প্রক্রিয়া এবং কম সময়ে ডেলিভারি পাওয়ার সুবিধা। অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে তাই সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশ চীন, ভারত বা ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশে লজিস্টিক সিস্টেম এখনো তেমন বিকশিত হয়নি। দেশের রিটেইল খাতকে ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনতে হলে এ ক্ষেত্রে এখনো কাজ করার যথেষ্ট জায়গা রয়েছে।

এ ছাড়া এই সংকটকালে ওয়েবসাইট তৈরির ঝামেলা এড়াতে রিটেইল ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অংশীদারির মাধ্যমে অনলাইনে ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটাতে পারেন।

একটি দেশকে তখনই ডিজিটাল বলা যাবে, যখন দেশটি ই-স্টেটে পরিণত হবে। এর অর্থ হচ্ছে সেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা থেকে শুরু করে সরকার, শাসনব্যবস্থাসহ যাবতীয় কাজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, পুরো দেশ থাকবে সম্পূর্ণরূপে কানেক্টেড। স্ট্যাটিস্টার প্রকাশিত গত বছরের তালিকা অনুযায়ী, ডিজিটাল দেশের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশও ডিজিটাইজেশনের দিকে সুদৃঢ় গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং রিটেইল খাতের ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা আরো

ত্বরান্বিত হবে।

 

লেখক : কমার্শিয়াল ডিরেক্টর, সেলার মার্কেটপ্লেস ও বিজনেস ইন্টেলিজেন্স, দারাজ বাংলাদেশ লিমিটেড

 



সাতদিনের সেরা