kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বিশ্বকে বদলাতে গিয়ে কোন পথে আমেরিকা

অনলাইন থেকে

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



২০ বছর আগে ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর যাত্রা শুরু করেছিল আমেরিকা। আজ এমনটা বলাই যায় যে কাবুল বিমানবন্দরের রানওয়েতে এর পররাষ্ট্রনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। আফগানিস্তান থেকে প্রস্থান মার্কিন মিত্রদের বিচলিত করেছে এবং শত্রুদের উত্ফুল্ল করেছে। বেশির ভাগ আমেরিকানও এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই বলছে যুদ্ধটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এখন পর্যন্ত এই ক্লান্তি ও উদাসীনতার যে জাতীয় মেজাজ দেখা যাচ্ছে, তা বিশ্বে আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভূমিকার জন্য এক দুর্বল নিদর্শন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা এখনো দুর্ধর্ষ এবং এর কৌশলগুলো একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে আবার সাজানো সম্ভব; কিন্তু তা নির্ভর করছে ৯/১১-পরবর্তী সময় থেকে সঠিক শিক্ষা নেওয়ার ওপর।

আমেরিকার মাটিতে তিন হাজার মানুষকে হত্যা একটি মারাত্মক বিষয়। এমন একটি ঘটনায় পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আগুনে ঘি ঢেলেছে আমেরিকার ‘ইউনিপোলার মোমেন্ট’ বা বিশ্বব্যবস্থায় এককেন্দ্রিক প্রাধান্য। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ সেটিরই প্রতিধ্বনিত করেছিলেন, বিশ্ব হয় আমেরিকার সঙ্গে অথবা এর বিরুদ্ধে। ন্যাটো বলেছিল, টুইন টাওয়ারে হামলা মানে তার সব সদস্যের ওপর হামলা। ভ্লাদিমির পুতিনও রাশিয়ার পক্ষ থেকে সামরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছিলেন। এ কারণেই হয়তো আমেরিকার তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কন্ডোলিৎসা রাইস এটিকে শীতল যুদ্ধের ‘আসল সমাপ্তি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ১১ সেপ্টেম্বরের পর মাত্র ৬৩ দিনে কাবুলের পতন ঘটায় সেটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তবে বিপরীত দিকটিও দেখতে হবে। আল-কায়েদাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মিশনটি শাসক পরিবর্তন ও জাতি গঠনের আকাঙ্ক্ষায় মোড় নিয়েছিল এবং তা আফগানিস্তান ও ইরাকে অবিশ্বাস্য ফল বয়ে এনেছিল। কিন্তু এই ফল লাভ করতে হয়েছে বিপুল পরিমাণ জীবন ও অর্থের বিনিময়ে। ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছিল একটি মরীচিকা। আমেরিকা তার নির্যাতন বিষয়ে ট্যাবু ভঙ্গ দেয় এবং তার উঁচু নৈতিকতার পরাজয় ঘটে। বিদেশে হস্তক্ষেপ বিষয়ে তার স্বচ্ছতার জ্ঞান সিদ্ধান্তহীনতায় ম্লান হয়ে যায়। দেশের ভেতরে ঐক্যের চেতনা দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং নিজেদের বিষাক্ত বিভাজনগুলো আমেরিকান সরকারের মহিমাকে উপহাস করে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের পঙ্কিলতা তাকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের বাস্তবতা চীনের উত্থানের বিষয়ে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়।

এখন কাবুলে বাইডেনের বিপর্যয় একটি ভয়ানক উপসংহার তৈরি করেছে। কেউ কেউ এতে শুধু আমেরিকান অদক্ষতার প্রমাণই দেখতে পাবেন না, নিঃশেষিত হওয়ার প্রমাণও খোঁজেন। মনে রাখতে হবে, আমেরিকার স্বার্থ ১৯৩০-এর দশকের বিচ্ছিন্নতাবাদী পর্যায় থেকে এখন আরো অনেক বেশি বৈশ্বিক। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ লাখ নাগরিক বিদেশে বসবাস করে, এর তিন কোটি ৯০ লাখ কর্মসংস্থান বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল এবং তার ৩৩ ট্রিলিয়ন বৈদেশিক সম্পদ রয়েছে। ফলে একটি উন্মুক্ত বিশ্বের জন্য তার গভীর আগ্রহ রয়েছে।

আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনটা ঘটে বারাক ওবামার অধীনে, যা ট্রাম্পের আমলেও ঘটতে থাকে। এখন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি তার ত্রুটিগুলো সারিয়ে তোলার যোগ্যতা রাখে। এরই মধ্যে তার পরামর্শদাতারা ‘বাইডেন ডকট্রিন’ তৈরি করছেন, যার লক্ষ্য হলো অন্তহীন যুদ্ধ শেষ করা, এশিয়ায় ‘অক্ষ’ সম্পন্ন করা, সাইবার নিরাপত্তার মতো নতুন ক্ষেত্রগুলো মোকাবেলা করা এবং বৈশ্বিক জোট পুনর্গঠন করা।

তবে সমস্যাটা হলো, এই মতবাদে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে আমেরিকার মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা বাইডেন স্পষ্ট করেই বলেছেন। তাই আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয় মূলত দেশের ভেতরে ভোটারদের খুশি করার জন্য এবং তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের মতো বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হয়। এর মধ্যে কভিড-১৯-এর বৈশ্বিক টিকা অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগও হারায় আমেরিকা, তার পরাক্রমকে ওপরে তুলে ধরতে পারত।

ঝুঁকিটা হলো বাইডেনের অভ্যন্তরীণ পক্ষপাতিত্ব তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে কম কার্যকর করতে পারে। এখন আমেরিকাকে চীনের সঙ্গে সহাবস্থানের একটি নতুন উপায় খুঁজে বের করতে হবে এবং সেটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। বাইডেন জানেন যে কংগ্রেস ও মার্কিন জনগণকে একত্র করে এমন কয়েকটি বিষয়ের একটি হচ্ছে চীনের প্রতি শত্রুতা প্রদর্শন। কারণ ৪৫ শতাংশ আমেরিকানই চীনকে আমেরিকার সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে দেখে, যা ২০০১ সালেও ছিল ১৪ শতাংশ।

বিদেশে মানবাধিকার রক্ষার জন্য আমেরিকাকে এখনো সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অথচ বাইডেন তা বাতিল করার বিষয়ে খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন। বিশ্বের স্বৈরশাসকরাও হয়তো তা লক্ষ করেছেন। বাইডেন সঠিকভাবে আমেরিকার জোটকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়েছেন, যা এর প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু তাঁর সুরক্ষাবাদ মিত্রদের আঘাত করছে। সুতরাং তাঁর এমনটি কল্পনা করাও উচিত হবে না যে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভারে আক্রান্ত একটি পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার আমেরিকার দাবিকে পুনরুজ্জীবিত করবে।

 

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ

 



সাতদিনের সেরা