kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ওজোনস্তর রক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তনও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ওজোনস্তর রক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তনও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন

ওজোনস্তর সম্পর্কে আবার দুঃসংবাদ পাওয়া গেল। ২৩ জুন ২০২১ তারিখে প্রভাবশালী ‘নেচার গ্রুপ’-এর জার্নাল, ‘নেচার কমিউনিকেশন’-এ এই দুঃসংবাদভরা প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আর্কটিক অঞ্চলের (উত্তরমেরু) বায়ুমণ্ডল চরম আকার ধারণ করায় সেখানকার ওজোনস্তর আশঙ্কাজনকভাবে ক্ষয় হচ্ছে। প্রবন্ধটি প্রকাশের পর অনেক দেশের সংবাদপত্র বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ছেপেছে। কারণ ওজোনস্তর ক্ষয়কারী ক্লোরোফ্লোরো-কার্বন (সিএফসি) ও হ্যালোনস উৎপাদন বন্ধের পর ধারণা করা হচ্ছিল, ২০১০-এর পর কয়েক দশকের মধ্যে ক্ষয়কৃত ওজোনস্তর পূরণ হয়ে তা স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে। কিন্তু এই প্রবন্ধ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট মহলের কপালে ভাঁজ পড়েছে।

ভূপৃষ্ঠের ১০-১৫ কিলোমিটার (ট্রপোস্ফিয়ার) ওপর থেকে শুরু করে প্রায় ৫০ কিলোমিটার ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার বা ওজোনস্তর বলা হয়। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে সূর্যালোক ও অক্সিজেন অণুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ওজোন সৃষ্টি হয়। বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত পুরো ওজোনের ৯০ শতাংশ ওজোন পাওয়া যায় স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে। বাকি ১০ শতাংশ ওজোন থাকে ট্রপোস্ফিয়ারে। মানুষসহ জীবজগতের বেঁচে থাকার জন্য ওজোনস্তর স্বাভাবিক থাকা প্রয়োজন। সাধারণত ৩০০ ডিইউ (ডবসন ইউনিট) বা ৩ মিলিমিটার পুরু ওজোনস্তরকে স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। কারণ এ ধরনের ওজোনস্তর ভেদ করে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি—টাইপ ‘ইউভি-সি’ (১০০—২৮০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য) ও ‘ইউভি-বি’ (২৮০—৩১৫ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য) পৃথিবীতে চলে আসতে পারে না। ফলে রক্ষা পায় মানুষসহ সামুদ্রিক জীব, গাছপালা ও ফসল। কোনো জায়গায় ওজোনস্তর ক্ষয় হয়ে ১০০ ডিইউয়ের নিচে নেমে এলে বিজ্ঞানীরা সেখানে গহ্বর তৈরি হয়েছে বলে ঘোষণা করেন। ওজোনস্তরে গহ্বর তৈরি হলে সেখান থেকে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে এসে মানুষসহ জীবজগতের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ওজোনস্তর ক্ষয়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে ক্লোরিন ও ব্রোমিনযুক্ত নানা ধরনের গ্যাস (সিএফসি, হ্যালোন, মিথাইল ক্লোরাইড, এইচসিএফসি ইত্যাদি)। পৃথিবীতে একসময় এগুলো ব্যাপকভাবে রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনার, অ্যারোসল, ফোম, অগ্নিনির্বাপকযন্ত্র, ইনহেলার ইত্যাদি তৈরির কারখানাসহ ড্রাই ক্লিনিং করার সময় ব্যবহার হতো। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি মাত্র ক্লোরিন পরমাণু এক লাখেরও বেশি ওজোন অণুকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। আর ওজোনস্তরের জন্য ব্রোমিন হচ্ছে ক্লোরিন থেকে ৪৫ গুণ বেশি ক্ষতিকর।

গত শতকের আশির দশকে ব্রিটিশ জরিপ দল সর্বপ্রথম অ্যান্টার্কটিকার ওজোনস্তর ক্ষয়জনিত গহ্বর তৈরির বিষয়টি লক্ষ করেন। এই দলের জোসেফ চার্লস ফারম্যান, বিজি গার্ডেনার ও জেডি সাংকলিন ১৯৮৫ সালে এ সম্পর্কে তাঁদের যুগান্তকারী প্রবন্ধ ‘নেচার’-এ প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট মহলে হৈচৈ পড়ে যায়। তারও আগে ১৯৭৪ সালে কালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ফ্রাংক সেরউড রোল্যান্ড ও ড. মারিও জে. মলিনা ক্লোরোফ্লোরো-কার্বনের মতো দীর্ঘস্থায়ী হ্যালোকার্বন যৌগকে ওজোনস্তর ধ্বংসের জন্য দায়ী করেন। তখন অনেকে এটি বিশ্বাস করেননি। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বলে গবেষকদ্বয়কে অনেকে তখন উপহাস করেছিলেন। ফারম্যানদের প্রবন্ধ প্রকাশের পর ওজোনস্তর ক্ষয়কারী পদার্থগুলোর (ওজোন ডিপ্লেটিং সাবসট্যান্স-ওডিএস) উৎপাদন বন্ধের জন্য বিশ্বনেতৃত্ব প্রচেষ্টা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ভিয়েনা কনভেনশন (১৯৮৫, কার্যকর ১৯৮৮), মন্ট্রিয়ল চুক্তি (১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭, কার্যকর ১৯৮৯), লন্ডন সংশোধনী (১৯৯১, কার্যকর ১৯৯২), জাতিসংঘ কর্তৃক ১৬ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস ঘোষণা (১৯৯৩, কার্যকর ১৯৯৫), বেইজিং সংশোধনী (১৯৯৯, কার্যকর ২০০২) ও কিগালি সংশোধনী (২০১৬, কার্যকর ২০১৯) সম্পন্ন হয়। ফলে ওডিএস উৎপাদন লক্ষণীয়ভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। অ্যান্টার্কটিকা—যার ওপরে সব থেকে বড় গহ্বর তৈরি হয়েছিল, সেখানকার ওজোনস্তর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে চলেছে।

আসলে বিজ্ঞান ও রাজনীতির যুগলবন্দির মাধ্যমেই এটি করা সম্ভব হয়েছে। পরিবেশবিষয়ক প্রভাবশালী জার্নাল ‘অ্যামবিও’ তার সম্পাদকীয়তে (নভেম্বর ২০২০) বিজ্ঞান ও রাজনীতির মেলবন্ধনের ফলে ওজোনস্তর ক্ষয় পুনরুদ্ধার সম্ভব হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে। তার আগে অ্যান্টার্কটিকায় ওজোন পুনরুদ্ধার সফলভাবে এগিয়ে যাওয়ায় নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল (১৭ ডিসেম্বর ২০১৯), ‘বিশ্ব ওজোন সমস্যার সমাধান করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যারও সমাধান করতে পারবে।’ সত্য কথা বলতে কী, মন্ট্রিয়ল চুক্তির ধারাবাহিকতায় ওডিএসের বিকল্প দ্রব্যগুলো ব্যবহারে বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে সাহায্য করছে। সে জন্য এবারের আন্তর্জাতিক ওজোনস্তর রক্ষা দিবসের (১৬ সেপ্টেম্বর) প্রতিপাদ্য করা হয়েছে, ‘মন্ট্রিয়ল প্রটোকল—খাদ্য, ভ্যাকসিন ও আমাদেরকে ঠাণ্ডা রাখছে।’

তবে ‘নেচার কমিউনিকেশন’-এ প্রকাশিত প্রবন্ধ অনুযায়ী অ্যান্টার্কটিকায় ওজোন পুনরুদ্ধার সফলভাবে এগিয়ে চললেও আর্কটিক অঞ্চলে ওজোন পুনরুদ্ধার হচ্ছে না। তার জন্য অবশ্য বিজ্ঞানীরা একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, কিছু ওডিএস (যেমন সিএফসি) বায়ুমণ্ডলে ৫০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত থেকে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের পোলার ভর্টেক্স (ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘোরা ঝড়) তাপমাত্রা চরম আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে শীতের সময় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এটি ঠাণ্ডা হওয়ার ফলে এখানকার (আর্কটিক অঞ্চল) সিএফসি— ওজোনকে যে গতিতে ধ্বংস করছে, সেই গতিতে সে নিজে অদৃশ্য হচ্ছে না কিংবা নতুন ওজোন তৈরি হচ্ছে না। এর জন্যই আর্কটিক অঞ্চলে ওজোনস্তরের উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন রুখে দিতে পারলে আর্কটিক পোলার ভর্টেক্স তাপমাত্রা স্বাভাবিক হবে। ফলে ওডিএস নতুনভাবে বায়ুমণ্ডলে আর নির্গমন না হলে সেখানকার ওজোনস্তর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে। কাজেই ওজোনস্তর স্বাভাবিক রাখাসহ পরিবেশ বিপর্যয় বন্ধ করতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনকেই রুখে দিতে হবে।

স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে অবস্থিত ওজোন আমাদের উপকার করলেও ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি (ট্রপোস্ফিয়ার) বায়ুমণ্ডলে ওজনের পরিমাণ বেশি (প্রতি ঘনমিটারে ৬০-১০০ মাইক্রোগ্রামের অধিক) হলে বায়ুমণ্ডলে ওজোনদূষণ তৈরি হয়। এটি মানুষ তথা জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। সাধারণত গাড়ি ও শিল্প-কারখানা থেকেই ট্রপোস্ফিয়ারে ওজোন জমা হয়ে দূষণ ঘটায়।

ওজোনস্তর রক্ষায় বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ভিয়েনা কনভেনশন, মন্ট্রিয়ল প্রটোকল ও পাঁচটি সংশোধনী (লন্ডন, কোপেনহেগেন, মন্টিয়ল, বেইজিং ও কিগালি)-তে স্বাক্ষর করেছে। ২০১৪ সালে ওডিএস (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৪ সংশোধন করা হয়েছে। মন্টিয়ল প্রটোকল মাল্টিল্যাটারাল ফান্ড ও ইউএনডিপির অর্থ সাহায্যে দেশে ওডিএস বন্ধ করার জন্য দুই ডজনেরও ওপর প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কয়েকটি ওডিএস (সিএফসি, সিটিসি, হ্যালোনস ইত্যাদি) ব্যবহার শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের পরিবেশ বিভাগ থেকে প্রশংসা সনদ পেয়েছে।

ওজোনস্তর রক্ষায় বাংলাদেশের অর্জনগুলো ধরে রাখা ও এগিয়ে নিতে হলে অবিলম্বে ‘ওজোন সেল প্রকল্প’কে প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবলসহ একটি শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে গঠন করা প্রয়োজন। ওজোনদূষণ পর্যবেক্ষণের জন্যও এই ইউনিট কাজ করতে পারে। এ ছাড়া ওজোনস্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ কাস্টমস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগকেও এ সম্পর্কিত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা দরকার।

 

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

 



সাতদিনের সেরা