kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

বুলিংয়ে আক্রান্ত মনোজগৎ

হায়দার মোহাম্মদ জিতু   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিজে নিজেকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়া আর অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়া—এই দুই প্রক্রিয়ার বর্তমান সময়ের আরেক নাম বা সমার্থক শ্রুতিধ্বনিত শব্দ বুলিং; যার অর্থ অন্যকে মানসিক বা শারীরিকভাবে হেনস্তা করা। মূলত অপমান, অপদস্থ বা কারো সামনে কাউকে হেয় করা—এ রকম ব্যাপারগুলোকে বুলিং বলা হয়। অনেক সময় কাউকে অপদস্থ করাটাকে একটা মজা হিসেবে নেওয়া হয়, এটাও এক ধরনের বুলিং।

বুলিংয়ের সংজ্ঞাগত দিক হিসেবে প্রাইমারি স্কুল থেকে কর্মস্থল—প্রতিটি স্তরের কোথাও না কোথাও আমাদের বুলিংয়ের শিকার হতে হয়, যা কখনো কখনো আমরা বুঝে উঠি আবার কখনো হয়তো বুঝেই উঠি না। তবে নির্মম বাস্তবতা হলো, প্রতিটি সভ্যতায়ই কিছু চক্র থাকে, যারা অন্যের নিন্দায় দিন যাপন করে। সাধারণত নিরীহ, ভদ্র এবং ভালো মনের মানুষরা এ ধরনের বুলিংয়ের শিকার হয়ে থাকেন। বুলিংয়ের চরম মাত্রায় অনেক সময় দলবদ্ধভাবেও চড়াও হওয়ার ঘটনাও ঘটে, যেটিকে বলে মোবিন (Mobbin)|

বুলিংয়ের নির্মম শিকার হয়ে সামিন নামের একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। মূলত এর মাধ্যমে বুলিংয়ের বিষয়টি আবারও সবার নজরে এসেছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি হলো, যেসব মানুষের সামিনকে আগলে রাখার কথা ছিল, সেই তাদের দ্বারাই তাকে বুলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে। খেলাধুলায় অংশ নিতে চাইলেও নিগৃহীত হতে হয়েছে। এ ধরনের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণেই ধীরে ধীরে সে দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং ওজন কমানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে শুরুতে তার মা-বাবা খুশি হলেও আসলে বুঝতেই পারেননি যে তাঁদের সন্তান কিভাবে মানসিক  ও শারীরিকভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে!

সামিনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা নামের এক নতুন রোগ সম্পর্কেও জানা গেছে; যেখানে এই রোগের কারণে ব্যক্তির মনোজগতে খাওয়াদাওয়া নিয়ে ভয়াবহ ভীতি ও নানা ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি করে। আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় না খেয়ে কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খেয়ে ওজন কমাতে চায় এবং নিজের ওজন নিয়ে সব সময় মানসিক অস্বস্তিতে থাকে। ওজন বেড়ে যাওয়া নিয়ে সব সময় এক ধরনের ভয়ে থাকে, যা সামিনকে ঘিরে রেখেছিল।

বুলিংয়ে গায়ের রং নিয়েও আক্রমণ করতে দেখা যায়। বিশেষ করে গায়ের রং কালো হলে তো কথাই নেই। গায়ের রং কালো এবং তথাকথিত স্মার্ট না হওয়ায় দুই বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থী বুলিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। এর বাইরে বডি শেমিংয়ের বিষয়টিও আছে। বডি শেমিং হলো কোনো ব্যক্তির শরীর নিয়ে মন্তব্য করে তাকে হেনস্তা করা। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে কারো শরীর নিয়ে যেকোনো মন্তব্য করাকে যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ এখানটায় এখনো বডি শেমিংকে ঠাট্টা-মসকরার বিষয় দেখা হয়।

মূলত বিলবোর্ডের স্লিম অঙ্গভঙ্গি এবং পাশ্চাত্যের মার্কেটিং কৌশল এই স্লিম বা না খেয়ে সুন্দর হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণ। অথচ সবটাই আপন আপন কালচার অনুভবে গড়ে ওঠার কথা। যেমন—ইথিওপিয়ার এক আদিবাসী অঞ্চলে সবচেয়ে মোটা ভুঁড়ির ব্যক্তিকে সম্মান করা হয় এবং সেখানে এর প্রতিযোগিতা করা চলে। এই অঞ্চলেও ‘নাদুসনুদুস’ পুতুল কিংবা শিশুবাচ্চা—দুয়েরই কদর ছিল। আর এখন কথিত স্লিম শরীর সর্বস্ব প্রতিযোগিতা। তবে শুরুটা নারীকে নিয়ে হলেও এখন বাদ যাচ্ছে না পুরুষও।

তবে সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটিকে এখন কেউ কেউ কথিত ফ্যাশন বা ট্রেন্ড হিসেবে জাহির করে থাকে। কারো স্বকীয়তাকে বিচ্যুতি হিসেবে মন্তব্য করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, কারো কথা বলায় সামান্য জড়তা থাকলে, উচ্চতায় কম হলে তাদের বিভিন্ন নামে বা পদবি ধরে কটূক্তি করা হয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। কাজেই এই বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে ডিসিপ্লিনারি কমিটিগুলো ও পারিবারিক শিক্ষাকে আরো জোরদার করা প্রয়োজন। আর এতেই আসবে মুক্তি, ফিরবে ভারসাম্য।

লেখক : প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ

[email protected]



সাতদিনের সেরা