kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

মানবকেন্দ্রিক মুক্তি প্রয়োজন

ড. মো. আনিসুজ্জামান

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মানবকেন্দ্রিক মুক্তি প্রয়োজন

আমার গৃহসহকর্মীর মেয়ের বিয়ে হয় নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৫ বছর বয়সে। বিয়ের তিন বছর পর পিথাগোরিয়ান সিদ্ধান্ত অনুসারে শ্বশুরবাড়ি থেকে এখন দাবি উঠেছে মেয়ের সন্তান কেন হচ্ছে না। এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছে। বাল্যবিয়ে আইনত নিষিদ্ধ হলেও গ্রামে-বস্তিতে এখনো নবম-দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বহু কিশোরীর বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। স্বামী-সংসার-সন্তান নিয়ে থেমে যায় তাদের সোনালি জীবন। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলেও সাক্ষরজ্ঞানহীন বলার উপায় নেই। সে পড়তে এবং লিখতে পারে। কিন্তু পারিবারিক, সামাজিক এবং নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সে অর্জন করেনি। শুধু নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নয়, অনেক উচ্চ শিক্ষিত নারী পারিবারিক ক্ষমতায়ন থেকে বঞ্চিত।

জন স্টুয়ার্ট মিলের বিখ্যাত উক্তি হলো, একটি সুখী শূকরের চেয়ে একজন অসুখী মানুষ ভালো। একজন সুখী মানুষের চেয়ে সক্রেটিস উত্তম। সক্রেটিস সুখী ছিলেন বলার উপায় নেই। আর্থিক কষ্টের সঙ্গে পারিবারিক অশান্তি ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। সক্রেটিস নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছেন। সক্রেটিসকে বিষপানে হত্যা করা হয়েছে, এই মৃত্যু তাঁর সিদ্ধান্ত অনুসারে হয়েছে। তিনি পালিয়ে যেতে পারতেন, জীবন ভিক্ষা চাইতে পারতেন। অর্থদণ্ড দিয়ে শাস্তি মওকুফের ব্যবস্থা ছিল। কোনো কিছুই তিনি গ্রহণ করেননি। মানুষ হিসেবে আত্মমর্যাদাকে তিনি বড় করে দেখেছেন। আত্মমর্যাদাহীন মানুষের সঙ্গে ইতর প্রাণীর পার্থক্য খুব সামান্যই। প্রকৃত মানবিক শিক্ষা মানুষকে প্রাণী থেকে পৃথক করে। শিক্ষার সাহায্যে মানুষ নিজের স্বরূপ উপলব্ধি করে আত্মমর্যাদায় উন্নীত হয়। আত্মমর্যাশীল মানুষই সমাজে-রাষ্ট্রে সম্মানিত, মাহিমান্বিত এবং শ্রদ্ধেয়।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দেশাত্মবোধের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত আত্মমর্যাদায় উন্নীত মানুষ পাওয়া দুষ্কর। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক মানসিকতা দূর হয়নি। সাধারণ, ইংরেজি মাধ্যম এবং মাদরাসা—তিন ধারায় শিক্ষাব্যবস্থায় তিন রকমের মানুষ তৈরি হচ্ছে। তিন রকমের শিক্ষাব্যবস্থায়ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দারুণভাবে অনুপস্থিত। শহরকেন্দ্রিক স্কুলগুলোতে ভর্তির প্রতিযোগিতা উল্লেখ করার মতো। বিপরীতে গ্রাম এবং বস্তির স্কুলগুলো শিক্ষার্থী শূন্য না হলেও ক্লাসরুমে উপস্থিতি কম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই গৃহশিক্ষক দিয়ে শিক্ষাজীবনের শুরু। গৃহশিক্ষক থেকে শিক্ষার্থীর মুক্তি মেলে না। সম্মান শ্রেণি থেকে এমএ শ্রেণি, এমনকি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর জন্য কোচিং সেন্টার নির্ভর। ভর্তি কোচিং মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং, বিসিএস কোচিং। কোচিং সেন্টারের নির্ভরশীলতা দেখে রসিকতা করে কেউ যদি বলেন, সবই যদি কোচিংনির্ভর হয়, তাহলে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাখার দরকার কী। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী দিয়ে কোচিং সেন্টার বন্ধ করা যাবে না। প্রযুক্তি নির্ভরতার সাহায্যে কোচিং সেন্টারের বিকল্প উদ্ভাবন করা উচিত। একবার এক আড্ডায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিকস বিভাগের একজন সিনিয়র শিক্ষক দাবি করেছেন, প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে তাঁরা কোচিং সেন্টারের বিকল্প উদ্ভাবন করতে সক্ষম। প্রয়োজন সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির এবং সিদ্ধান্তের। ঘোড়ার বিকল্প যান্ত্রিক যানবাহন আইন করে চালু করার প্রয়োজন হয়নি। কোচিং সেন্টারকে বিকল্প কর্মস্থান হিসেবে দেখা হলে সিদ্ধান্ত ভিন্ন রকমের। বহু বেকার শিক্ষকতা পেশায় থেকে কোচিং সেন্টারে বাড়তি কিছু আয় করেন।

সর্বগ্রাসী বৈশ্বয়িক করোনায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দারিদ্র্য বেড়েছে। সীমিত এবং অনির্ধারিত আয়ের মানুষের দৈনন্দিন অবস্থা সংকীর্ণ। হতদরিদ্র পরিবারের নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অনেকেই রিকশাভ্যান চালাচ্ছে। কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনেকে। স্কুল ছেড়ে অনেক শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। চরাঞ্চল এবং বস্তি এলাকায় এই দৃশ্য দৃষ্টিসীমার আড়ালে নয়। শ্রমের সঙ্গে যুক্ত শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে নেওয়া সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। চরাঞ্চল, বস্তি এবং গ্রামের হতদরিদ্র শিশু শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনে তালিকা করে খাদ্য সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। অতিদরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীর জন্য উপবৃত্তি যথেষ্ট নয়। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের তথ্য-প্রযুক্তির জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগ সময়ের দাবি। গ্রামের স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশের কোনায় কোনায় মোবাইল ফোনের ফোরজি নেটওয়ার্ক পৌঁছলেও গ্রামে আমার বাড়িতেই ইন্টারনেট সেবা কাজ করে না। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুবিধা গ্রহণের জন্য গ্রাম এবং শহরের মধ্যে ডিজিটাল বিভক্তি কমিয়ে আনা প্রয়োজন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য শুধু সাক্ষরতার জ্ঞান যথেষ্ট নয়। সাক্ষরতার হার দিয়েও স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন সম্ভব নয়। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে তথ্য-প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে বিশাল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে মানবিকরূপে স্থায়ী করা যায়। মানুষের জন্যই উন্নয়ন। এই মানুষ কোনো রঙের মানুষ নয়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা