kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

স্মরণ

তাঁর সমৃদ্ধ কর্মময় জীবন অনুসরণীয়

বাপ্পু সিদ্দিকী

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তাঁর সমৃদ্ধ কর্মময় জীবন অনুসরণীয়

একজন ব্যক্তি তাঁর ব্যক্তিজীবনে একাধারে বিচারপতি, উপাচার্য, রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে জাতিসংঘের বিশেষ দূতসহ বিদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন রাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তাঁর চিন্তা-চেতনা ও কর্মের মধ্যে রেখে গেছেন সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি আর কেউ নন—তিনি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আইনের শাসনের কথা, মানবাধিকারের কথা বলে গেছেন। সত্য, সুন্দর ও ন্যায় প্রতিষ্ঠাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। শোকের মাস আগস্টের ২ তারিখ ১৯৮৭ সালে আমরা দেশবরেণ্য আলোকিত স্বজন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে হারাই। তিনি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার নাগবাড়ীতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ৩১ জানুয়ারি ১৯২১ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ডাকনাম ছিল শাহজাহান। পিতা আব্দুল হামিদ চৌধুরী সাবেক পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের স্পিকার ছিলেন। তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ ও আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি লন্ডনের লিংকস ইন হতে বার এট ল ডিগ্রি লাভ করেন।

একজন উপাচার্য বা বিচারপতি অথবা রাষ্ট্রপতি সব ভূমিকায়ই তিনি চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবেন। তবে সম্ভবত আবু সাঈদ চৌধুরীর জীবনে সর্বোত্তম গৌরবদীপ্ত কর্মসম্পাদিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালে। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখন তিনি লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণার পরদিন অর্থাৎ ২৭ মার্চ বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর বিশ্বব্যাপী প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে ভূয়সী সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্বদরবারে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবি করেন। যদিও তিনি যুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার আগেই স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে কাজ শুরু করেছিলেন। বিবিসি আবু সাঈদ চৌধুরীর যুগান্তকারী বক্তব্য প্রচার করলে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি জাতি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে যেমন সমর্থন করেন, তেমনি দেশের মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন।

এতে ভীত হয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা লন্ডনে আবু সাঈদ চৌধুরীকে নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহস ও দেশমাতৃকার প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসার কাছে সব ভয়ভীতি তুচ্ছ হয়ে যায়। তিনি সদম্ভে ঘোষণা করেন, ‘লন্ডনের রাজপথে আমার শবদেহ পড়ে থাকবে, কিন্তু পাকিস্তানের কাছে আপস করে দেশে ফিরব না। জয় আমাদের হবেই।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে তিনি বলতেন, ‘দেশ যে স্বাধীন হবে সে বিষয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই। সন্দেহ থাকতে পারে না। সন্দেহ যদি হয় জীবনে যা কিছু সত্য বলে জেনেছি সব মিথ্যে হয়ে যাবে। সত্যের জয় অবধারিত।’ (প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো) বিশ্বজনমতকে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিয়ে আসতে তিনি উল্কার মতো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। কোনো ক্লান্তি বা হতাশা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমাদের দেশের গণমানুষের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠন করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ন্যায়ের যুদ্ধ এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে এই যুদ্ধের অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই ধারণাটি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ছিল না।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রহসনের বিচারে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাতে উদ্যোগী হলে, তাদের সে হীন উদ্দেশ্য নস্যাৎ করতে আয়ারল্যান্ডের নোবেল বিজয়ী শ্যোন ম্যাকব্রাইডের নেতৃত্বে যে পাঁচ সদস্যের দল পাকিস্তানে গিয়ে নরঘাতক ইয়াহিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করেন, সেই দল প্রেরণের মূল ভূমিকায় ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তাঁর লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যেন কোনো প্রকারে সদ্য ঘোষিত স্বাধীন রাষ্ট্রের পিতাকে হত্যা করতে না পারে। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ ছিল জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন। এর দুই দিন পর ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করান। ১৯৭৩-এর ১০ এপ্রিল আবার আবু সাঈদ চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধান প্রণীত হওয়ার পর তিনিই হন বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি।

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর একনিষ্ঠ দেশপ্রেম, নির্ভেজাল সততা কাল থেকে কালান্তরে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে থাকবে। মৃত্যু তাঁকে কর্মযোগ থেকেই অতর্কিতে যখন ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তখন তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে জেনেভার পথে লন্ডনে ছিলেন। মৃত্যুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি চলে গেলেও এই কর্মবীর মৃত্যুর প্রহর গুনে সময় নষ্ট করেননি। তাঁর সমৃদ্ধ কর্মময় জীবন অনুসরণীয়।

 লেখক : সাবেক প্রধান শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ

[email protected]