kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক জরুরি

জয়ন্ত ঘোষাল

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক জরুরি

আফগান তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক শাখার প্রধান মোল্লা আবদুল গণি বারাদার সম্প্রতি চীন সফরে গেছেন, আর সেখানে পৌঁছেই উত্তরাঞ্চলীয় তিয়ানজিং শহরে তিনি বৈঠক করেছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে। পাকিস্তানের মাধ্যমে বেশ কিছুদিন ধরেই চীন তালেবানের সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ রক্ষা করছে; কিন্তু এই প্রথম এত উঁচু মাপের কোনো তালেবান নেতা চীন সফরে গেলেন। এবং এই সফর এমন সময় হচ্ছে, যখন কিছুদিন আগেই তালেবান চীনের সীমান্তবর্তী আফগান প্রদেশ বাদাকশানের গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলো কবজা করেছে। তালেবান নেতার এই সফরের চার দিন আগে আফগান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমন্ত্রণ করেছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরায়েশিকে। চেংডু শহরে দুই মন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয় যে আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে কাজ করবে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আফগানিস্তানে যেকোনো অস্থিতিশীলতার প্রভাব প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানে সরাসরি গিয়ে পড়বে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা অত্যন্ত প্রয়োজন।’

বিবিসি বাংলা সার্ভিসের এই খবরটি এবারের প্রবন্ধের প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণকারী বিষয়। এবার আসুন, আরেকটি খবর আপনাদের পরিবেশন করি। করোনাভাইরাসের উৎস নিয়ে রাজনীতির বিরুদ্ধে ঢাকা ও বেইজিং। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্টেট কাউন্সেলর ওয়াং ইর বৈঠকে এ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

এই দ্বিতীয় সংবাদটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বেশ কিছুদিন আগের খবর, তাসখন্দে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের যে বৈঠক, সেই বৈঠকে বাংলাদেশ করোনার উৎস সন্ধান নিয়ে গবেষণার আগ্রহ প্রকাশ করেনি। কেননা বাংলাদেশের কাছে স্বভাবতই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গরিব মানুষ, সাধারণ মানুষ, মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে প্রতিষেধক পৌঁছে দেওয়া। কোথা থেকে এলো সে তত্ত্বতালাশ করে লাভ কী! সেসব তো পরের বিষয়। সবচেয়ে আগে তো দিতে হবে প্রতিষেধক। সেটা তো হলো বাংলাদেশের ব্যাপার। কিন্তু চীন হঠাৎ কেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এত উৎসাহী হয়ে পড়ল?

এবারে একটু জট ছাড়ানোর চেষ্টা করি। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দিন যত এগিয়ে আসছে ততই কিন্তু এই উপমহাদেশে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। একদিকে চীন, পাকিস্তান, রাশিয়া এই অক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আবার অন্যদিকে এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করছেন। ভারত আমেরিকাকে বলছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার করার প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। কেননা বহুদিন ধরে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। বারবার সেনা প্রত্যাহারের দিনক্ষণের ঘোষণা হয়েছে। বাইডেন এবারে একটা দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং যেটা মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব ভারতকে বলছেন, এর প্রধান কারণ কিন্তু চীনের সঙ্গে, বিশেষ করে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে আমেরিকা এবারে আরো বড় ধরনের আক্রমণাত্মক রণকৌশল নিচ্ছে। সেখানে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করা হবে। অহেতুক আফগানিস্তানে এত কোটি কোটি ডলার খরচ করার কোনো মানে হয় না। এ কারণেই কিন্তু আফগানিস্তান থেকে অগ্রাধিকারটা সরিয়ে চীনের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। অর্থাৎ এখানে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট করা দরকার, সেটা হলো বাইডেন সম্পর্কে যেটা ভাবা হয়েছিল, ওবামা যে রকম ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে চীন সম্পর্কে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের রণকৌশল থেকে ভিন্ন রণকৌশল নিয়েছিলেন এবং বাইডেনও তাই করবেন এবং হয়তো চীনের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার পথে যাবেন। কিন্তু দেখা গেল বাইডেন সে পথে যাননি। উল্টো বলা হচ্ছে, বাইডেনের নয়া চীন নীতি। যেটা নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। সেখানে বলা হচ্ছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন কিন্তু চীনের সঙ্গে, বিশেষ করে বাণিজ্য এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে একটা সংঘাতের পথে যেতে চাইছেন। তার জন্য তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ অবস্থায় স্বভাবতই চীনও কিন্তু তাদের গুটি সাজাচ্ছে, ভুটান-নেপাল এরই মধ্যে অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছে। এবার বাংলাদেশের দিকেও তাদের নজর।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের যখন বোঝাপড়া তখন চীন কিন্তু বাংলাদেশের দিকে এই জন্য তাকাচ্ছে যে বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ তার জিওস্ট্র্যাটেজিক পজিশন। সেটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে চীন কথা বলছে এই জন্য যে তারা বাংলাদেশকে এই অভয়বাণী দিতে চাইছে যে তালেবানি সরকার যদি আফগানিস্তানে হয়েও যায় এবং চীন-পাকিস্তান যদি সেই সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে এবং তারা যদি ভারতকে টাইট দিতে চায় এবং সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেন ভারতের ছাতার তলায় না এসে নিরপেক্ষ সার্বভৌম অবস্থান নেয় এবং সে ক্ষেত্রে চীন সব রকমভাবে বাংলাদেশকে প্রটেক্ট করবে, সাহায্য দেবে, আর্থিক সাহায্য তো বটেই। কূটনৈতিকভাবেও সাহায্য দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ যেন ভারতের মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকে। চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রটেকশনের দায়িত্ব নেবে। এবং সেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে চীন এত বেশি চিন্তিত। অর্থাৎ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের কথা বলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পারস্পরিক বোঝাপড়াটাকে ভেস্তে দেওয়াটাই হচ্ছে চীনের মূল উদ্দেশ্য।

সন্দেহ নেই, পরিস্থিতিটা বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ তো বলছেন যে আবার একটা নতুন ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগ শুরু হচ্ছে। একটা সময়ে যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধ ছিল এবং ভারত ‘ন্যাটো’ নামক সংগঠনের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্লকের মধ্যে ছিল। ‘ন্যাটো’র সদস্য হয়নি। পাকিস্তান ছিল ‘ন্যাটো’র মধ্যে। আজ কিন্তু আবার চীন বনাম আমেরিকার একটা নতুন ঠাণ্ডা যুদ্ধ শুরু হতে চলেছে বলে আশঙ্কা করছেন বহু কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ। এই পরিস্থিতিতে ভারত এবং বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে মধুর রাখা, ভালো রাখা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। চীন ও ভারতের সম্পর্ক যেমন একটা দিক। ভারত চায় না সেই সম্পর্কটাও যাতে এমন কোনো ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’-এ যেন চলে না যায়। আবার অন্যদিকে চীন যেন আমেরিকার বিরোধিতা করতে গিয়ে ভারত বিরোধিতায় চলে না আসে। আবার সেটা যেমন একটা দিক আবার অন্য দিকটা হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক ঠিক রাখাটা জরুরি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের চেয়েও ভারতের দায়িত্ব বেশি। ভারত বড় দেশ এবং ভারত প্রতিষেধক কূটনীতি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের একটা ছায়া দেখা দিয়েছে। কেননা যে কমিটমেন্ট ভারত করেছিল সেই কমিটমেন্টটা তারা রাখতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ভারতের অনেক বেশি দায়িত্ব রয়েছে বড় দেশ হিসেবে। বাংলাদেশকে কিন্তু পাশে রাখতে হবে।

ভারত ও চীন সীমান্ত নিয়েও কিন্তু সমস্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। এখন ‘লাইন অব কন্ট্রোল’কে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলছে যে ‘লাইন অব নো কন্ট্রোল’। দুটি দেশের মধ্যেই সেনা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। সশস্ত্র স্ট্রাইক করার ব্যাপারে দুই পক্ষই তৈরি হচ্ছে এবং সেনাবাহিনীর এক্সক্যালেশন নজরে পড়ছে। সুতরাং এই পরিস্থিতিটা কিন্তু কাম্য নয়। এবারের ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ পত্রিকায় একটা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে ‘চায়নিজ ভার্সেস আমেরিকান অ্যান্টিট্রাস্ট’। এই লেখায় আমেরিকার সঙ্গে চীনের সম্পর্কের যে অনাস্থা এবং সেই অনাস্থা কিভাবে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং বাইডেনের নয়া কূটনীতিকে অনেকে সমর্থন করছে না। ভারতের কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞের একটা বড় অংশ তাঁরা বলছেন যে চীন সম্পর্কে বাইডেনের নয়া নীতিকে যেন ভারত সমর্থন না করে। কেননা ভারত যদি পুরোপুরি আমেরিকার নীতিকে সমর্থন করে কার্যত ‘ন্যাটো’র সদস্য হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু আগামী দিনে চীনের সঙ্গে বিরোধ বাড়বে। এবং সেই কারণে জয়শঙ্কর রাশিয়া, চীন এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গেও একটা নতুন ধরনের এনগেজমেন্টের ব্যাপারে একটা নয়া দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এখানে ভারতের জন্য পাকিস্তানের চেয়েও বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে চীন। সেই পরিস্থিতিটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখাটা খুব জরুরি। আর এই সার্বিক পরিস্থিতিতে একটা ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও কূটনৈতিকভাবে ভারতের কাছে বিরাট একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। এবং সেই কারণে খুব শিগগির বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটা বৈঠক জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি