kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

কভিড মৌসুমি ভাইরাস হলে গ্রীষ্মে কেন?

ফ্রাঁসোয়া বালো

১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সার্স-কভ-২ ভাইরাসটি ছড়ানোর মূলে এমন একটি প্যারাডক্স (আপাত বিরোধী হলেও সত্য) রয়েছে, যা এখনো সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পায়নি। এটা বেশ ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের অন্য ভাইরাসগুলোর মতো এটাও শীতকালেই বেশি ছড়ায়। তবে বর্তমানে যুক্তরাজ্যে এর গ্রীষ্মকালীন উত্থান অনুভূত হচ্ছে। শীতকাল ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকা ও ভারতের মতো অঞ্চলেও কভিড-১৯ মহামারির বড় ঢেউও দেখা যাচ্ছে। এটা কেন ঘটছে?

মহামারির শুরু থেকেই একটি প্রধান প্রশ্ন ছিল, শীতকালে সংক্রমণের উচ্চ হার হলে ঋতুভেদে এর আচরণ কতটা ব্যাপক হবে। ফ্লু ও চারটি এনডেমিক (স্থানীয় প্রকোপ) করোনাভাইরাসসহ বেশির ভাগ শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস ‘সাধারণ সর্দি ঘটায় এবং তার শক্তিশালী মৌসুমি শক্তি প্রদর্শন করে। বিশ্বের সব অঞ্চলে শীতকালেই এর বেশির ভাগ সংক্রমণ ঘটে।

একটি ভাইরাস মৌসুমি হওয়ার অর্থ এই নয় যে এটা বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে সংক্রমণ ঘটাতে অক্ষম। বিষয়টিকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝার জন্য আমাদের অবশ্যই ভাইরাস বিস্তারের প্রধান চারটি কারণের একটি হিসেবে মৌসুমি বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিতে হবে। অন্য তিনটি কারণ হলো—আমন্ত্রণমূলক আচরণ (হোস্ট বিহেভিয়ার), ভাইরাল বিবর্তন এবং আক্রান্ত হয়ে বা টিকাদানের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীর অর্জিত সংক্রমণ সুরক্ষার (ইমিউনাইজেশন) হার।

এই চারটি কারণ সম্পূর্ণভাবে মহামারির গতি ত্বরান্বিত করে। সংক্রামক ব্যাধিবিষয়ক এপিডেমিওলজিস্টরা মহামারির আচরণ বর্ণনা করতে ‘আর’ নম্বর (একজন গড়ে কতজনকে সংক্রমিত করে) নামে একটি গাণিতিক ধারণা ব্যবহার করেন। এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমিত ব্যক্তিদের দ্বারা নতুন সংক্রমণের গড় সংখ্যা তুলে ধরে। কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে যখন ‘আর’ সংখ্যাটি ১-এর চেয়ে বেশি হয়, তখন প্রতিটি ব্যক্তি গড়ে একাধিক নতুন হোস্টকে (আমন্ত্রণকারী) সংক্রমিত করে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণ সংখ্যা বেড়ে যায়। যখন ‘আর’ নম্বরটি ১-এর কম হয়, সংক্রমণ সংখ্যা হ্রাস পায়।।

ভাইরাসগুলো সব সময়ই আরো বেশি পরিমাণে রূপান্তরযোগ্য হওয়ার জন্য নির্বাচনী নিয়মের অধীনে থাকে। আজ ভাইরাসের যে প্রতিলিপি তৈরি হচ্ছে তার যেমন পূর্বসূরি ছিল, তেমনি বংশধরও রেখে যাবে। ২০২০ সালের শেষের দিকে আবির্ভূত করোনাভাইরাসের আলফা ভেরিয়েন্টটি সহজাত নিয়মেই তার পূর্বসূরির চেয়ে বেশি সংক্রামক ছিল। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে উত্থানের জন্য দায়ী ডেল্টা ভেরিয়েন্টও তাই আলফার চেয়ে বেশি সংক্রামক।

টিকা নেওয়া বা সংক্রমিত মানুষের অনুপাত জনগোষ্ঠীর দলবদ্ধ প্রতিরোধক্ষমতার (হার্ড ইমিউনিটি) প্রান্তের দিকে এগিয়ে যায়, যে প্রান্তে (ট্রেশহোল্ড) প্রতিটি সংক্রমিত হোস্ট গড়ে একজনেরও কম ব্যক্তিকে আক্রান্ত করে। এই মান (‘আর’ সংখ্যার) ডেল্টা ভেরিয়েন্টের জন্য প্রায় ৮৫ শতাংশ, যদিও কভিডের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল দলবদ্ধ প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা নেই। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস পায়। যদিও বর্তমান ভ্যাকসিনগুলো সংক্রমণ, অসুস্থতা এবং মৃত্যুর হার হ্রাস করতে উল্লেখযোগ্যভাবে কার্যকর, তবু শতভাগ সংক্রমণ বন্ধ করতে পারে না।

এরই মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ কভিডের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি অর্জন করায় যুক্তরাজ্য সম্ভবত এই মানের কাছাকাছি চলে আসছে। তবে সংক্রমণ সুরক্ষিত (ইমিনাইজড) মানুষের অনুপাত অব্যাহতভাবে কমতে থাকবে। কারণ ইমিউনিটিকে বাইপাস করতে সক্ষম নতুন ভেরিয়েন্টগুলোর নতুন জন্ম ও আবির্ভাব ঘটবে। তাতে সংক্রমণ, পুনঃসংক্রমণ এবং একই সঙ্গে টিকাদানের হারও বাড়বে। এভাবে কভিড বিকশিত হতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত তার সর্বাধিক সংক্রমণ সক্ষমতায় পৌঁছবে এবং শীতকালে আরো বেশি কার্যকর থাকবে।

অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের টিকা দেওয়া হয়ে যাবে এবং প্রায় প্রাক-মহামারি সংক্রমণ হারে ফিরে যাবে। ধারণা করা হচ্ছে কভিডও শিগগিরই তার এপিডেমিক ইকুইলিব্রিয়ামে (মহামারি স্থিতি) পৌঁছে যাবে। এই পর্যায়ে ভাইরাস বিস্তারের প্রধান চারটি শক্তির মধ্যে তিনটি সরে যাবে। শুধু মৌসুমি বৈশিষ্ট্যটি থেকে যাবে এবং ধারণা করা হচ্ছে তা এনডেমিক ডায়নামিক (মহামারি গতিশীলতা) পরিচালনার কাজটি শুরু করবে। এতে শীতকালে ‘আর’ সংখ্যাকে ১-এর ওপরে এবং গ্রীষ্মে ১-এর নিচে ঠেলে দেবে। এই পর্যায়ে কভিড বিশ্বব্যাপী প্রচলিত অন্যান্য ২০০টি মৌসুমি এনডেমিক শ্বাসযন্ত্র ভাইরাসের তালিকায় যুক্ত হবে। তবে এর আগে আমাদের মহামারির সবচেয়ে খারাপ পর্বটি শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

শীতকালে ঘটা মহামারির ছোট ছোট ঢেউয়ের সঙ্গে কভিডের এনডিমিসিটির রূপ্তান্তর ধীরে ধীরে ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই মৌসুমি প্রকোপ স্থান ও মৌসুমভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ লাভ করবে। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ জায়গায় ভাইরাসটি এনডেমিসিটির দিকে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে। মহামারির ঢেউগুলো ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ে আসে। এটা আমরা আগে যতটা প্রত্যক্ষ করেছি, ভবিষ্যতে হওয়ার আশঙ্কা নেই।

 

লেখক : ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন জেনেটিকস ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ :  আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা