kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

বিশ্বে কভিডের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ছে

অনলাইন থেকে

৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লরা স্পিনি তাঁর ‘পেইল রাইডার’ বইয়ে লিখেছেন, ‘প্রতিটি মহামারির মূলে রয়েছে একটি রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব ও একটি মানুষের মধ্যকার লড়াই।...এটা যতটা জৈবিক ঘটনা, ততটা সামাজিকও।’ এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘স্প্যানিশ ফ্লু ভারতকে স্বাধীনতা ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে বর্ণবৈষম্যের কাছাকাছি এবং সুইজারল্যান্ডকে গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল।’

কভিডের প্রভাব পুরোপুরি মূল্যায়ন করতে গেলে আমাদের বা আমাদের বংশধরদের দীর্ঘ সময় লাগবে। তবে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক ফলাফল আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি কলম্বিয়া থেকে কিউবা হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত দেশে দেশে দারিদ্র্য ও হতাশা বাড়িয়ে অস্বাভাবিক এক অস্থিরতার ইন্ধন জোগাচ্ছে। অস্থিতিশীলতা দীর্ঘকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে নিহিত থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অস্থিরতা দমনে এই মুহূর্তে ১০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। এটা হচ্ছে বিভেদ সৃষ্টিকারী ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমাকে কারাগারে পাঠানোর একটি তীব্র প্রতিক্রিয়া। কর্তৃপক্ষ এটিকে তাঁর অনুসারীদের সংঘবদ্ধ সহিংসতা বলে সন্দেহ করছে। কিন্তু এর পেছনে কভিডজনিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতি নষ্ট হওয়া এবং নেতাদের ওপর আস্থায় ভাঙন ধরার মতো বিষয়গুলোর ভূমিকা রয়েছে।

একাডেমিক গবেষণাগুলোর ভাষ্যমতে, রোগ-ব্যাধির প্রকোপ মানুষের যোগাযোগ সীমিত করে বলে এটি প্রাথমিকভাবে সামাজিক অশান্তিকে চাপা দিয়ে রাখতে পারে; তবে দীর্ঘ মেয়াদে অশান্তি উসকে দিতে পারে। যেমন ১৯৯০ সালের দিকে আফ্রিকায় হওয়া মহামারির ওপর মনোনিবেশ করলে দেখা যায়, পরবর্তী সময়ে মহাদেশটিতে অস্থিরতার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্য পণ্ডিতরা ব্ল্যাক ডেথ থেকে পরবর্তী বড় মহামারিগুলো বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান—চারটি ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রেই বিদ্রোহের ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁদের মতে, যে কারণগুলো এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে সেগুলো হচ্ছে বৈষম্য বেড়ে যাওয়া, সরকারের মহামারি নিয়ন্ত্রণ নীতির প্রভাব (ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট সংকটজনিত শোষণ) এবং মানসিক ধাক্কার প্রবণতা, যা মানুষকে প্রাদুর্ভাবের উৎস সম্পর্কে অযৌক্তিক বিশ্বাস গ্রহণের দিকে ধাবিত করে, যা সামাজিক বা বর্ণবৈষম্যকে উৎসাহিত করে।

বিশ্বে এখন মহামারি তীব্র হচ্ছে। ফলে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত এপ্রিল পর্যন্ত এই মহামারি ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে ১৫ মাস সময় নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী মাত্র তিন মাসে এটি আরো ১০ লাখ জীবন কেড়ে নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় শুধু গত ১৫ এপ্রিল এক দিনেই ৫৬ হাজার সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। একই দিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে দিয়েছিল, লাতিন আমেরিকায় ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে, মধ্যপ্রাচ্যে ‘বিপর্যয়কর পরিণতি’ বয়ে আনতে পারে এবং আফ্রিকায় এটি দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে, যেখানে এক মাসে ১০ লাখ নতুন সংক্রমণ ঘটেছে এবং মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে ৪৩ শতাংশে উঠেছে।

ইউরোপে সংক্রমণের ঘটনা দ্রুত বাড়ছে। সংক্রমণ বৃদ্ধির মধ্যেই প্রায় সব বিধি-নিষেধ তুলে নেওয়ায় ১২ জুলাই থেকে ব্রিটেন এক বেপরোয়া যাত্রা শুরু করেছে। অথচ পশ্চিমা দেশগুলোর টিকাদানের হার অনেক বেশি রয়েছে। তাদের উন্নত সুবিধাযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং অস্থায়ী প্রকল্পগুলোকে চালিয়ে নেওয়ার মতো ক্ষমতা রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশকে সম্পূর্ণভাবে টিকা দেওয়া হয়েছে এবং আফ্রিকাজুড়ে মাত্র ১ শতাংশ মানুষ টিকা নিয়েছে; যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, হাসপাতালগুলো ভেঙে পড়ার মুখে রয়েছে। সংস্থাটির জরুরি কমিটি ভাইরাসটির আরো বিপজ্জনক ভেরিয়েন্টগুলোর উত্থান ও বিস্তারের ‘সমূহ সম্ভাবনা’ সম্পর্কে সতর্ক করেছিল, যা নিয়ন্ত্রণ করা আরো চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। এসবের পরও বিশ্বের সরকারগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে সংকীর্ণ জাতীয় চাহিদার দিকেই মনোনিবেশ করেছে।

নতুন ভেরিয়েন্ট যেখান থেকেই সৃষ্টি হোক, বিশ্বব্যাপী জীবনের জন্য তা সুস্পষ্ট হুমকি। মহামারির আন্তর্জাতিক প্রভাব আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত করতে থাকবে। যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তাতে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে ভোগাবে। তাই ধনী দেশগুলোকে এখন অন্যত্র ভ্যাকসিন ও চিকিৎসার জন্য তহবিল বাড়াতে হবে। এরই মধ্যে যে টিকাগুলো আবিষ্কার করা গেছে তার ডোজগুলো ভাগ করে নিতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকার (পেটেন্ট) মওকুফ করতে হবে। অন্যদের রক্ষা করা সঠিক কাজ। এটি নিজেদের রক্ষা করারও সর্বোত্তম উপায়।

 সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা