kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

গণতন্ত্রের স্বার্থেই পেগাসাস স্পাইওয়্যার নিয়ন্ত্রণ জরুরি

অনলাইন থেকে

২৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১৯৮৮ সালের পর গত বছর বিশ্বের সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয় দেখতে হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর অর্ধেকেরও বেশি ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা হচ্ছে একান্ত সুরক্ষিত জাতীয় সম্পদ। অস্ত্র রপ্তানি ও এর ব্যবহারকে ঘিরে বিধি-নিষেধের জাল গড়ে উঠেছে। কারণ কোনো দেশই চায় না তার সবচেয়ে প্রাণঘাতী অস্ত্রগুলো নিজের ওপর তাক করা হবে।

আজ পর্যন্ত অন্তত ৫০০টি বেসরকারি কম্পানি একেবারে নিয়ম-কানুনের বাইরে গিয়ে কাজ করছে। তারা অত্যাচারী শাসকদের কাছে অনুপ্রবেশে সক্ষম সফটওয়্যার বিক্রি করছে, যার মাধ্যমে শাসকরা তাদের সমালোচকদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি ও হয়রানি করে। এ ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। কারণ গণতন্ত্রবিরোধী এসব তৎপরতা যথেষ্ট হয়েছে বলেই গণ্য করা উচিত। যদিও এটি অব্যাহত আছে; কিন্তু মূল উদ্যোগটা ছিল এই অস্ত্রটি যেন অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। এর পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের সরকার যখন এই অস্ত্রগুলো শুধু নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে নয়, গণতান্ত্রিক পশ্চিমের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করার সুযোগ নেবে, তখন কী ঘটবে?

আমরা হয়তো এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করতে যাচ্ছি। ইসরায়েলি হাইটেক ফার্ম এনএসওর গোপনে নজরদারি করা সফটওয়্যার পেগাসাস স্পাইওয়্যারটির ক্রেতা হচ্ছে বিভিন্ন দেশের সরকার। যেসব সরকার স্পাইওয়্যারটির মাধ্যমে এই নজরদারি করেছে, তাদের ফাঁস হওয়া ফোন নম্বরের তালিকা ঘেঁটে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গার্ডিয়ান, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও প্যারিসভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফরবিডেন স্টোরিজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংস্থার একটি কনসোর্টিয়াম। ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এনএসওর ক্রেতারা সাংবাদিক, ভিন্নমতাবলম্বী ও কর্মীদের স্মার্টফোন হ্যাক করার জন্য পেগাসাস স্পাইওয়্যারটির ব্যবহার করেছিল। এর মধ্যে একজন কর্মরত ফরাসি মন্ত্রীর মোবাইল ফোনও ছিল, যাতে এনএসওর স্পাইওয়্যারসংশ্লিষ্ট ডিজিটাল চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্যারিস এরই মধ্যে এর তদন্ত শুরু করেছে। ফাঁস হওয়া ৫০ হাজারের বেশি মোবাইল ফোনের তালিকায় এই নম্বরগুলো ছিল।

ফাঁস হওয়া তালিকায় বিভিন্ন দেশের ১০ জন প্রধানমন্ত্রী, ফ্রান্সের ইমানুয়েল ম্যাখোঁসহ তিনজন প্রেসিডেন্ট ও মরক্কোর রাজা রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের সরকারও এনএসওর ক্রেতা, যারা দালাই লামার নির্বাসিত তিব্বতি সরকারের কিছু নির্বাচিত ফোন নম্বর আয়ত্তে নিয়েছে। ব্রিটিশ নাগরিকদের শত শত ফোন নম্বরও এই তালিকায় দেখা গেছে, যাদের বেছে নেওয়ার জন্য ব্রিটেনের উপসাগরীয় মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের অংশীদার ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এখন এই ধরনের বন্ধুত্ব নিয়ে কেউ জিজ্ঞেস করতেই পারে যে আমাদের শত্রুদের আর কী প্রয়োজন? এই সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের ক্যাবিনেট দপ্তরবিষয়ক মন্ত্রী লর্ড ট্রু জানিয়েছেন যে যুক্তরাজ্য এনএসওর কার্যক্রম সম্পর্কে ইসরায়েল সরকারের কাছে বেশ কয়েকবার তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এনএসও বলছে যে যেহেতু তাদের বিক্রি করা স্পাইওয়্যার সিস্টেমটি তারা পরিচালনা করে না এবং এর গ্রাহকদের টার্গেট ডাটায় তাদের কোনো প্রবেশাধিকারও নেই, তাই সফটওয়্যারটির ব্যবহারের ওপর সংস্থাটি কোনো তদারকি করতে পারে না। এটা একটা স্বার্থপর যুক্তি, যা করপোরেট গোপনীয়তার ওপর নির্ভর করে আছে। তবে এটা সত্য যে এনএসওর তৈরি এ ধরনের স্পাইওয়্যার মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘনকে সহজ করে তুলছে। এখন পশ্চিমা গণতন্ত্রের পক্ষে চীন বা রাশিয়ার ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ রপ্তানির অভিযোগ করাটা ভণ্ডামি হবে, যদি পশ্চিমের মিত্ররাও একই ক্রেতার কাছে ডিজিটাল অস্ত্রগুলো বিক্রি করে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এখন সফটওয়্যার সম্পর্কিত। ইসরায়েলের উচিত তার স্পাইওয়্যার খাতকে দমন করা, যা বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের সেলফ সেন্সরশিপ রপ্তানি করার সুযোগ দিচ্ছে। নিপীড়নমূলক এই অস্ত্রের প্রসার নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক বিধি-নিষেধও জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ধরনের প্রযুক্তির বিস্তার সীমিত করা গণতন্ত্রের স্বার্থের জন্যই জরুরি। বর্তমানে আইনি লড়াইয়ের বাইরে গিয়ে কোনো সরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থায়ই এনএসওর মতো গোপন অস্ত্রগুলো দিয়ে করা স্বাধীন বাকশক্তি, সংগঠন ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার গুরুতর লঙ্ঘন প্রতিরোধ বা প্রতিকার করা সম্ভব নয়। এই ব্যবস্থার অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা