kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

আল-কায়েদাও দ্রুত প্রত্যাবর্তনে প্রস্তুত

গ্রেগ বার্টন

২৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আফগানিস্তানের আসন্ন পতন একটি জাতীয় বিপর্যয়ের চেয়েও বেশি। শুধু তা-ই নয়, গত দুই দশকে হাজার হাজার জীবন এবং শতকোটি ডলারের বিনিময়ে যে সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল তা তালেবানদের অগ্রগামিতার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে। আর তালেবানের বিজয় মানে আল-কায়েদারও বিজয় এবং এর বৈশ্বিক কুফল রয়েছে।

অবাক হয়ে দেখতে হচ্ছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত পদক্ষেপের আগেই তালেবানের উত্থান ঘটছে। তারা এরই মধ্যে আফগানিস্তানের ২১২টি জেলার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে জানা গেছে, যা দেশটির ৪০৭টি জেলার অর্ধেকেরও বেশি এবং তা গত ১ মে পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তালেবানরা শুধু জুলাইয়ের ১৬ তারিখ পর্যন্ত ৫১টি জেলা দখল করে নিয়েছে। তারা বর্তমানে আরো ১১৯টি জেলার নিয়ন্ত্রণ নিতে লড়াই করছে এবং সরকারকে মাত্র ৭৬টি জেলায় বা ২০ শতাংশের কিছু বেশি এলাকায় কোণঠাসা করে ফেলেছে। সরকার নিয়ন্ত্রিত এই অঞ্চলগুলো ঘিরে ফেলা হয়েছে। বৃত্তাকার জাতীয় মহাসড়কের প্রায় পুরোটাই তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর অর্থ হচ্ছে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা শহরগুলোতে শুধু বিমানেই নিরাপদে পৌঁছানো সম্ভব।

প্রকৃত অর্থে পতন ঘটেছে : মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও কাবুলের রাজনৈতিক নেতারা আশাবাদের জায়গা থেকে তালেবানের এই উত্থান রুখে দেওয়া নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জাতীয় নিরাপত্তাকাঠামোর পাশাপাশি আফগানদের মনোবলও ভেঙে পড়েছে। গত ২ জুলাই ভোরে যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী নিঃশব্দে বাগরাম বিমান ঘাঁটি থেকে চুপিসারে চলে যায়, তখন সেখানকার লাইটগুলোই শুধু নিভিয়ে দেওয়া হয়নি, এর সঙ্গে অবশিষ্ট আশার প্রদীপটাও নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আফগান সামরিক বাহিনী এখন ক্যাচ-২২ (উভয়সংকট) পরিস্থিতিতে আটকে আছে। বিমান ছাড়া দেশটির পার্বত্য অঞ্চলজুড়ে তাদের সেনাদের জন্য লজিস্টিক সরবরাহ লাইন এবং চিকিৎসা সহায়তা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

আফগান বিমানবাহিনীর কাছে যুদ্ধ মিশনের জন্য মাত্র ১৩৬টি বিমান ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রয়েছে। বিমানগুলোকে উড্ডয়ন সক্ষমতা ধরে রাখতে তাদের আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু মার্কিন সেনাদের বাগরাম ঘাঁটি ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঠিকাদাররাও আফগানিস্তান ত্যাগ করেছেন। ফলে আফগান হেলিকপ্টার ও সি-১৩০ ট্রান্সপোর্টের বেশির ভাগই গ্রাউন্ডেড হয়ে পড়েছে। আর আফগানিস্তানের মার্কিন প্রশিক্ষিত রিজার্ভ পাইলটরাও তালেবানের ডেথ স্কোয়াডের হুমকির মুখে রয়েছেন। এরই মধ্যে সাতজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে আফগানিস্তানের পতন হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে অব্যাহত থাকবে : ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক টাইমস সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে ‘তালেবানের উপনেতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে, যাতে হাক্কানি আফগানিস্তানে ইসলামী ব্যবস্থায় সব আফগানের অধিকারের কথা বলেছেন। কিন্তু তাতে যা প্রকাশ করা হয়নি তা হলো এই হাক্কানি কুখ্যাত আল-কায়েদা মিত্র হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা জালালউদ্দিন হাক্কানির ছেলে, যাকে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ওয়াশিংটন। অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তারা সিরাজউদ্দিন হাক্কানির বক্তব্যকে ‘নির্লজ্জ প্রচারণা’ বলে অভিহিত করেছেন।

গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তানে সিএনএনের সাংবাদিক সালিম মেহসুদ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আল-কায়েদার দুই নেতার একটি সাক্ষাৎকার নেন। তাতেও আল-কায়েদা ও তালেবানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং আফগান তালেবান ও পাকিস্তানি তালেবানের (টিটিপি) মধ্যে সম্পর্ক রক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকারে আল-কায়েদার মুখপাত্ররা সতর্ক করে দিয়েছেন, ‘অবশিষ্ট ইসলামী বিশ্ব থেকে বিতাড়িত করা না হলে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ অন্য সব জায়গায় অব্যাহত থাকবে।’

সন্ত্রাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল : বাইডেন যুক্তি দেখিয়েছেন যে মার্কিন সামরিক বাহিনী আফগানিস্তানে আল-কায়েদাকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল থেকে উত্খাত করার লক্ষ্য অর্জন করেছে। কিন্তু সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ‘আমরা ঐতিহাসিকভাবে খুবই বিকেন্দ্রীকৃত একটি দেশের প্রাচীন সংস্কৃতি ও জাতি গঠনের চ্যালেঞ্জকে মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করেছি। আমরা কখনোই বুঝতে পারিনি যে পাকিস্তানে তালেবানদের নিরাপদ আশ্রয় সম্পর্কে কী করা যায়। ...তালেবানরা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চায় এবং তারা এখনো আল-কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।’

গেটসের এই মন্তব্য জুন মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনকেই প্রতিধ্বনিত করেছে। তাতে দাবি করা হয় যে আল-কায়েদা এরই মধ্যে আফগানিস্তানজুড়ে, বিশেষ করে পাকিস্তানের সীমান্ত বরাবর অবস্থান নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আল-কায়েদার আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ৪০০ থেকে ৬০০ যোদ্ধা এবং তালেবানরাও দীর্ঘ খেলা খেলছে। তাদের ধৈর্য আফগান জনগণের জন্য মর্মান্তিক প্রভাব ফেলবে।

আফগানিস্তান ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-কায়েদার জন্মস্থান ছিল। এই গোষ্ঠী সারা বিশ্বে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের জন্ম দেয়। এর মধ্যে ১৯৯৩ সালে আফগানিস্তানে গঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জেমা ইসলামিয়া এবং ২০০৬ সালে ইরাকে ইসলামিক স্টেটে রূপান্তরিত হওয়া আল-কায়েদা ইন ইরাক রয়েছে। সুতরাং তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান এবং আফগানিস্তানের ইসলামিক আমিরাতের প্রত্যাবর্তন হবে সিরিয়া ও ইরাকের আইএসআইএস খিলাফতের চেয়ে অনেক বড় এবং অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী। এটি হবে সর্বত্র জিহাদি সন্ত্রাসবাদীদের জন্য এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা।

লেখক : অস্ট্রেলিয়ার আলফ্রেড ডিকিন ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল ইসলামিক পলিটিকসের অধ্যাপক

সূত্র : এশিয়া টাইমস

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা