kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

সন্ত্রাসের বলি হয় সাধারণ মানুষ

জয়ন্ত ঘোষাল

১৯ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সন্ত্রাসের বলি হয় সাধারণ মানুষ

ওরা ফেরিওয়ালা। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় হরেক জিনিস ওরা ফেরি করে বেড়াত। কিন্তু তলে তলে ওরা চালিয়ে যেত ‘রেকি’। মানেটা কী? মানে হলো ওরা সমস্ত এলাকার বিভিন্ন অন্ধিসন্ধি জেনে নিত। সেই সঙ্গে সমানে চালিয়ে যেত তহবিল সংগ্রহ। নিজেদের জঙ্গি সংগঠনের জন্য সদস্য সংগ্রহ। কিছুদিন আগে কলকাতা শহর থেকে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবির তিন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করার পর এমনটাই দাবি করেছে কলকাতা পুলিশ। পুলিশ কী জানাচ্ছে? দুপুর ২টা নাগাদ হরিদেবপুর থানার এমজি রোড সংলগ্ন এলাকা থেকে তিন জেএমবি জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স বা এসটিএফ জানতে পেরেছে যে ধৃতদের নাম হচ্ছে নাজিউল রহমান ওরফে জয়রাম বেপারি, রবিউল ইসলাম ও মিকাইল খান। তিনজনেরই বাড়ি ঘটনাচক্রে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলায়। ধৃতদের থেকে একটা হাতে লেখা ডায়েরি, একটা মোবাইল ফোন, বেশ কিছু জিহাদি নথিপত্র উদ্ধার হয়েছে। জানা যাচ্ছে যে এই লোকেরা জঙ্গিদের সাহায্য করত। মূলত তহবিল এবং সদস্য সংগ্রহ করত। কিন্তু এই ক্ষুদ্র ঘটনা তার বৃহৎ প্রেক্ষাপট নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করতে চাইছি। প্রেক্ষাপট হলো, আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার। সেখানে তালেবানি জঙ্গিদের নবকলেবরে বিকাশ। আফগানিস্তানে সরকার গঠনের চেষ্টা। পাকিস্তান তলে তলে সেই মৌলবাদী তালেবানি শক্তির উত্থানের সহায়ক। পাকিস্তান ভাবছে অতীতে যেমন একটা সময় ছিল যখন তালেবান সরকার আফগানিস্তানে পাকিস্তানই কার্যত নিয়ন্ত্রণ করত। এমনকি পাকিস্তানের বাজেটে তালেবানদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হতো। তালেবান সরকারের উন্নয়নের জন্য বাজেটে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই টাকার অঙ্কটাও দেখানো হতো। আজ এত দিন পর যখন আবার এই উপমহাদেশে জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে, সেই তৎপরতা বৃদ্ধির বিষয়টা নিয়ে দুই সপ্তাহ আগেই আমি লিখেছিলাম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সেই জঙ্গি তৎপরতা আগে যেভাবে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান মদদপুষ্ট, সেই তালেবানি জঙ্গিরা জইশ-ই-মোহাম্মদ, লস্কর-ই-তৈয়বা থেকে শুরু করে তালেবানের বিভিন্ন গোষ্ঠীর জঙ্গিরা প্রথমে পাকিস্তান হয়ে, বাংলাদেশে হয়ে, পূর্ব উপকূলবর্তী এলাকা দিয়ে কলকাতায় ঢুকত এবং কলকাতা থেকে দিল্লি হয়ে ক্রমেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ত। এখন আবার নতুন করে তারা রুট বদলাচ্ছে। এবারে জঙ্গিরা বাংলাদেশে না গিয়ে প্রথমে ভারতে ঢুকছে। বাংলাদেশে যেহেতু নজরদারি অনেক বেড়ে গেছে, শেখ হাসিনার সরকারের তৎপরতা অনেক বেড়ে গেছে। সুতরাং এখন অনেক সহজ হচ্ছে পাঞ্জাব সীমান্ত দিয়ে, এমনকি গুজরাটের কচ্ছ সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানি জঙ্গিরা ঢুকছে। সেখানে থেকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। জঙ্গিদের কেন এই রুট বদল প্রথমে সেটা বোঝা প্রয়োজন।

মনে করা যেতে পারে যে যখন নব্বইয়ের দশকে মুম্বাই বিস্ফোরণ হয়েছিল। তারপর দাউদ ইবরাহিম পাকিস্তানে পালিয়ে গেল, তখন ভারতীয় গোয়েন্দারা পশ্চিম উপকূলবর্তী এলাকায় বিরাটভাবে সন্ত্রাস দমন, জঙ্গি দমনের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। জঙ্গি ধরার জন্য জাল বিছিয়ে ফেলে সেই সময় আইএসআই, পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনী রণকৌশল বদলায়। পশ্চিম উপকূলবর্তী এলাকা দিয়ে জঙ্গি অনুপ্রবেশ না করে তারা পূর্ব উপকূলবর্তী এলাকায় রুটটা পরিবর্তন করেছিল। এটা এই জন্য করেছিল যে যেহেতু ভারতীয় গোয়েন্দারা পশ্চিম উপকূলে তৎপর, পূর্ব উপকূলে তৎপর নয়। সুতরাং পূর্ব উপকূল দিয়ে তাদের ঢোকাটা সহজ হবে। এটা ভেবে তারা তখন পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে, বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যে রাজ্য সেই রাজ্যগুলোতে তৎপর হয়ে ওঠে। এমনকি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে আলফা বা অন্য যেসব জঙ্গি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ছিল সেগুলোকে অর্থকরী মদদ দিয়ে পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনী একটা ছাতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে তৈরি করতে সচেষ্ট হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চল এলাকায়, পূর্ব ভারতে এবং বাংলাদেশে যৌথভাবে একটা গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কোনোভাবেই জঙ্গি তৎপরতাকে প্রশ্রয় দেননি, গ্রেপ্তার করেছেন, ভারতের হাতে বেশ কিছু জঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। তিনি সুনিপুণভাবে ইসলাম এবং জঙ্গিবাদকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন।

কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা জারি করার পর প্রশাসনের তৎপরতা ছিল। ভয়াবহ সেনা তৎপরতা ছিল। তার ফলে দীর্ঘদিন জঙ্গিরা কিছু করতে পারেনি। কিন্তু ক্রমেই দেখা যাচ্ছে সেখানেও কিন্তু আবার নতুন করে আইএসআইএস মডিউল তৈরি হচ্ছে। আইএসের নতুন মডিউলের সন্ধান পাওয়া গেছে শ্রীনগরের অনন্তনাগ, অবন্তিপোড়া, বারামুলাসহ বিভিন্ন জায়গায়। সেখানে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো এনআইএ এবং গুপ্তচর সংস্থা একযোগে কাজ করছে। সেখানে আইএসএর খোরাসান শাখার দায়িত্বে থাকা পাকিস্তানি জঙ্গি হুজাইফা আল বাকিস্তানি একটি ডিজিটাল পত্রিকা প্রকাশ করতেন। তার মাধ্যমে অনলাইনে মৌলবাদের প্রচারও চালাত আইএস। গোয়েন্দাদের দাবি যে হুজাইফার স্ত্রী কাশ্মীরি। তিনি শ্রীনগরের বাসিন্দা আইজাজ আহমেদ আহেঙ্গারের মেয়ে। ২০১৯ সালে আফগানিস্তানের নানগড়হর প্রদেশে আমেরিকার ড্রোন হামলায় নিহত হয় হুজাইফ। সম্প্রতি আইএসের সদস্য হওয়ার অভিযোগে আইজাজকেও গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা বাহিনী। হুজাইফার মৃত্যুর পর ডিজিটাল ম্যাগাজিনটা বন্ধ ছিল। সেটা আবার চালু হয়েছে। গত বছরের মার্চ মাসে দিল্লি থেকে জাহানজেব সামিওয়ানি ও তার স্ত্রী হিনা বসিরবেককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের অভিযোগ জাহানজেব এবং হিনা আইএসের খোরাসান শাখার সদস্য। নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় তারা মৌলবাদের প্রচার চালিয়ে ছিল। জাহানজেব এবং হিনা একসময় মালয়েশিয়ায় থাকত। তাদের সঙ্গে ভারত তথা বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আইএস সদস্যদের যোগাযোগ ছিল এবং তারাই ওই ডিজিটাল ম্যাগাজিনটা চালাচ্ছিল।

আমেরিকান গোয়েন্দারাও এখন এই ব্যাপারে ভারতকে সাহায্য করছে। এবং এই কাশিম খোরাসানির ব্যাপারে আমেরিকান গোয়েন্দারা বলছেন, ওই ব্যক্তি ডাবল ভিপিএন ব্যবহার করতেন। তাই তাঁর অবস্থান কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত জানা যাচ্ছে যে দক্ষিণ কাশ্মীরের আছাওয়াল থেকে ম্যাগাজিনটা চালাচ্ছে উমর বাট ওরফে হাবিব উমর নিসার। কাশ্মীরের এই ঘটনাটির মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে ভারতের কাশ্মীর থেকে এমনকি দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত আবার জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয়েছে। এবং তারা বাংলাদেশের বদলে ভারতে ঢুকে ভারত থেকে আবার বাংলাদেশে গিয়ে সেখানেও নানা ধরনের বিস্ফোরণ এবং আইএসআই কার্যকলাপ করার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশেও বিচ্ছিন্নভাবে জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে যে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে জঙ্গি সন্ত্রাস করার উদ্দেশ্যটা কী?

বাংলাদেশের যে জিওস্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব যেটা আমি বারবার বিভিন্ন লেখায় লিখেছি। যখন চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তান অক্ষ তৈরি হয়েছে, ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে তখন বাংলাদেশ নানা সমস্যার মধ্যে পীড়িত থাকা সত্ত্বেও ভারতের বন্ধু হিসেবে থেকেছে। সুতরাং সেই বাংলাদেশকে যদি ভারতের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হয়, সেই বাংলাদেশকে যদি প্রবল চাপের মধ্যে রাখতে হয়, সেই বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে, যেটা পাকিস্তানের কাছে একটা ঈর্ষার বিষয়, সেই অর্থনীতিকে যদি বিপর্যস্ত করতে হয়, বাংলাদেশের বিকাশকে প্রতিহত করতে হয়। আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশকে নানাভাবে সন্ত্রাসের শিকার করাটা এই মুহূর্তে পাকিস্তানি তালেবানি জঙ্গিগোষ্ঠীর উদ্দেশ্য। চাপের মধ্যে পড়ে যাতে বাংলাদেশ সরকার ফোঁস করতে বাধ্য হয়। সেটাই হচ্ছে সব থেকে বড় লক্ষ্য। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকার এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে অবগত। কিন্তু শুধু সরকার বা প্রধানমন্ত্রী নন—এই ব্যাপারে মানুষকে সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশ এবং ভারতের এই দুই দেশের মানুষকে এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে ভাবতে হবে যে ‘সন্ত্রাস’ ভারতের সন্ত্রাস, বাংলাদেশের সন্ত্রাস, আমেরিকার সন্ত্রাস বলে কিছু হয় না। বিন লাদেন যখন আমেরিকায় সন্ত্রাস করেন তখন আমেরিকা এ ব্যাপারে তৎপর হয়ে যায়। পাকিস্তানের পশ্চিম প্রান্তে মার্কিন সেনাবাহিনীর তৎপরতা তখন লক্ষ করা যায়। কিন্তু সেই পাকিস্তানই যখন কাশ্মীরে জঙ্গি তৎপরতা চালায় তখন আমেরিকার টনক নড়ে না। এই দ্বৈতনীতি কখনোই কাম্য নয়। ভারতকেও বাংলাদেশের ব্যাপারে একই রকম মনোভাব নিয়ে এগোতে হবে যে সেখানে ‘আমার সন্ত্রাস’, ‘তোমার সন্ত্রাস’ বলে কিছু হয় না। সন্ত্রাসের বলি হচ্ছি আমরা সবাই। সবচেয়ে বেশি বলি হয় সাধারণ মানুষ। সেই সন্ত্রাসের আবহ থেকে আমরা কিভাবে মুক্ত হব জানি না! কিন্তু চেষ্টা চালানো ছাড়া সভ্য মনুষ্য জাতির আর কী করার থাকতে পারে!

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা