kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩০ জুলাই ২০২১। ১৯ জিলহজ ১৪৪২

ইউজিসির গাইডলাইনের পথে হাঁটা যেতে পারে

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ইউজিসির গাইডলাইনের পথে হাঁটা যেতে পারে

কভিড শুধু দেহে নয়, মস্তিষ্কেও আঘাত হেনেছে। অন্তত শিক্ষাঞ্চলের নিয়ন্ত্রক, পরিচালক ও নীতিনির্ধারক প্রত্যেকের চিন্তায় এক ধরনের করোনা আক্রান্ত দশা দেশবাসী লক্ষ করছে। অবশ্য এটিও ঠিক, করোনার ভয়ংকর আচরণের সঙ্গে কারই বা পরিচয় ছিল! তাই নীতিনির্ধারণে বিভ্রান্ত দশা থাকতেই পারে। আমরা মনে করি, প্রথম ঝাঁকির পর দায়িত্বশীলদের আত্মস্থ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংবিৎ ফিরে পেতে অনেক বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে খেলাই হচ্ছে বেশি। এ দেশের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাই বুঝে গেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একের পর এক ছুটির নোটিশ আসতে থাকবে। প্রথম দিকে এটি ছিল এক ধরনের সান্ত্বনা। পরে তা একঘেয়ে হয়ে যায়। হতাশা কমাতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত থাকলেও তা একসময় হতাশা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে নেমে এসেছে দারুণ হতাশা। কিন্তু কী করা যাবে, মহামারিকে অস্বীকার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিরাট ঝুঁকি হয়তো কোনো দেশের সরকারই নিতে চাইবে না। তার পরও সাধারণ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে। সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, বাংলাদেশে মৃত্যু ও সংক্রমণের হার কম বলে অনেক দেশ বাংলাদেশকে টিকা অনুদান দিচ্ছে না। আবার শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত, শপিং মল—সব কিছু স্বাভাবিকভাবে সচল থাকার পর শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরুদ্ধ কেন! কেউ কেউ এমন বেপরোয়া প্রশ্নও তোলেন যে মাদরাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে সরকারের মাথার ওপর থেকে একটি বড় চাপ কমে যায়।

দিন দিন শিক্ষার্থীরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। তাদের বক্তব্য শিল্পমালিক, বাসমালিক, লঞ্চমালিক প্রত্যেকের চাপকে সরকার আমলে আনছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের স্বস্তি পাওয়ার মতো কোনো কার্যক্রম নেই। ঝুলে আছে এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষা। সেশনজট বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে যাঁরা পেশা খোঁজার যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তাঁরা চারদিকে অন্ধকার দেখছেন। প্রত্যেকেই এ অবস্থায় সরকারের কাছ থেকে বিকল্প কিছু প্রত্যাশা করছিলেন। তেমন কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সচল করার জন্য একটি গাইডলাইন উপস্থাপন করেছে। আমাদের কাছে মনে হলো, বর্তমান বাস্তবতায় এটি মন্দের ভালো। প্রস্তাবনার কোনো কোনো বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত হবে গাইডলাইনের আলোকে নিজস্ব কার্যক্রম প্রস্তুত করা। তবে আমার জানা মতে, প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় এই গাইডলাইনের আলোকে এরই মধ্যে পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

গাইডলাইনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান একাডেমিক ক্যালেন্ডারের সময়কাল গ্রহণযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হবে। এই বক্তব্যে খুব স্পষ্টতা নেই। বক্তব্যের সারকথা সব ধরনের পরীক্ষা নেওয়ার সময়সীমা কমাতে হবে। তবে আমাদের মনে হয় নানা ধরনের পরীক্ষা বাস্তবতার বিচারে গ্রহণযোগ্যভাবে কমিয়ে আনাটা কঠিন হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীনভাবে পরীক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে পারলে এবং সব ধরনের ছুটি-ভ্যাকেশন বাতিল করলে যথাযথভাবে পরীক্ষা কার্যক্রম চালানো কঠিন হবে না। আমার তো মনে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গতিশীল থাকলে এবং শুরু থেকেই নানা রকম খবরদারি ও বিধি-নিষেধের বেড়াজাল না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ও শিক্ষা কার্যক্রম অনেকটা এগিয়ে যেতে পারত। গাইডলাইনের প্রয়োজনও এত বেশি হতো না।

অতীতেও বিভিন্ন সংকটে, যেমন—হরতাল, আন্দোলন, সংঘর্ষ ইত্যাদি কারণে দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থেকেছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ক্ষতি পোষাতে ভ্যাকেশন ও ছুটি বাতিল করে বা কমিয়ে ক্লাস পরীক্ষা নিয়েছেন। তাই এসব বিষয় নতুন কিছু নয়।

তবে আমার কাছে একটু জটিল মনে হয়েছে গাইডলাইনের একটি অংশ। বলা হয়েছে, প্রতিটি ক্লাসের (তত্ত্বীয় ও ব্যাবহারিক) সময় বর্তমানের মতোই থাকবে, এর অর্থ লেকচারের সময় কমানো যাবে না। লেকচারের সংখ্যা কমানোর সুযোগ থাকলেও একই সময়ে পুরো সিলেবাসের পাঠদান সম্পন্ন করতে হবে। বিষয়টি খুব সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে আমার কাছে। একদিকে লেকচারের সংখ্যা কমানোর পক্ষে সায় রয়েছে, আবার বলা হচ্ছে পুরো সিলেবাসের পাঠদান সম্পন্ন করতে হবে। সিলেবাসের আলোকেই তো লেকচার নির্দিষ্ট করা হয়। তাই লেকচার কমলে সিলেবাসকেও ছোট করতে হবে। নাকি পরামর্শ এমন যে জোড়াতালি দিয়ে পুরো সিলেবাস শেষ হয়েছে বলতে হবে। সুচিন্তিত না হলে কোনো কোনো সিদ্ধান্ত ক্ষতির কারণও হতে পারে। গত সেমিস্টারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ইউজিসির হঠাৎ আদেশ আসে কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট, ভাইভা—সব পরীক্ষা নেওয়া যাবে কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। তাহলে তো ফলাফল শূন্য হয়ে যায়। ফাইনাল না হলে তো সেমিস্টারই ঝুলে গেল। অথচ কভিডকালে এর আগের সেমিস্টার নিজস্ব পদ্ধতিতে সঠিকভাবে সম্পন্ন হলেও কেন এবার সংকট তৈরি করা হলো তা বোঝা গেল না। ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গোলকধাঁধা থেকে বেরোনোর উপায় বের করে ফেলল। ইউজিসি ফাইনাল পরীক্ষা নেওয়া নিষেধ করেছে কিন্তু ফাইনাল ‘অ্যাসেসমেন্ট’ নিতে তো নিষেধ করেনি। আসলে নতুন নামে পক্ষান্তরে ফাইনাল পরীক্ষাই নেওয়া হয়ে গেল। তাহলে কেন অকারণে এমন লুকোচুরির পথ তৈরি করা হয়েছিল?

লেকচার কমানো যাবে কিন্তু সিলেবাস কমানো যাবে না এমন আদেশের গূঢ়ার্থও আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়নি। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ক্লাসের সময়ের পরিধি ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট। এই সময়ে ভালোভাবে একটি কনসেপ্ট আলোচনার জন্য যথেষ্ট নয়। অনেক লেকচারই পরবর্তী ক্লাস পর্যন্ত টেনে নিতে হয়। সেখানে লেকচার কমাব অথচ সিলেবাস কমবে না তা কী করে হয়! তাহলে জোড়াতালি দিয়ে সিলেবাস শেষ করার কৃতিত্ব নেওয়ার দরকার কী! সব বিশ্ববিদ্যালয়েই কমবেশি কিছুসংখ্যক অসাধু শিক্ষক থাকেন, যাঁরা পাঁচ-সাতটা বা এরও কম ক্লাস নিয়ে বলেন সিলেবাস শেষ করে ফেলেছেন। এ অবস্থায় তাঁদের মেন্টর হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে বিশেষ গাইডলাইন না থাকাই ভালো। সিলেবাস শেষ করে পরীক্ষা নেওয়ার সময় বেঁধে দেওয়াটা জরুরি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরাই ঠিক করে নেবেন কিভাবে সিলেবাস শেষ করবেন। ভার্চুয়াল মাধ্যমে তা সম্ভব। এখনো আমরা অনেকে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে প্রয়োজনে দিনে একবার আবার সন্ধ্যার পর একবার ক্লাস নিচ্ছি। কী কী যৌক্তিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে তার জন্য সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কমিটির সিদ্ধান্তই জরুরি। অথবা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কমিটিই ভাবতে পারে। ইউজিসির গাইডলাইনেও তেমন সুযোগ রাখা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কমিটি স্বাধীনভাবে চলতে পারলে অনেক আগেই কভিড পরিস্থিতিতে পাঠদান ও পরীক্ষায় গতি আনতে পারত। আমি মনে করি, বারবার বাইরের আদেশনামা আর নানা পদ্ধতির কথা বলে গতিকে অনেকটা শ্লথ করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও প্রশাসনের শম্বুক চলা নীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটু মরচে ধরা অবস্থা তৈরি হয়েছে। তাই একটু নড়েচড়ে ওঠার জন্য ইউজিসির গাইডলাইন কাজে লাগবে। এ কারণে আমি গাইডলাইনের শ্রদ্ধেয় প্রণেতাদের সাধুবাদ জানাই। তবে আমি এ ক্ষেত্রে বেশি সক্রিয় হতে অনুরোধ করব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো শিক্ষা কার্যক্রম প্রধানত এগিয়ে নেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। একাডেমিক কাউন্সিল প্রণীত একটি বিধি থাকে। সে বিধি মান্য করে ক্লাস পরীক্ষাগুলো নেওয়া হয়। সেভাবেই অভ্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন। বর্তমানে কঠিন সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়াই যথেষ্ট। এর সীমার মধ্য থেকে ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম চালানোর স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে থাকাই উত্তম।

সব কিছুর পরও একটি মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকটেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় অনলাইন ক্লাস নেওয়াই যথেষ্ট নয়। লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি ছাড়া শিক্ষার্থী নিজেদের প্রস্তুত করবে কী করে! বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি তো এক রকম লকডাউনেই আছে। ল্যাবের তালা খোলার পরিস্থিতিও দেখছি না। শিক্ষার্থীদের যে অংশ হলে থাকেন না তাঁরা একরকম ব্যবস্থা করে নেবেন। কিন্তু হলবাসীর বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই তো দূর-দূরান্ত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছেন। বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। হলে না থেকে তাঁদের অনেকের পক্ষে অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব হলেও লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি ছাড়া একাডেমিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা কঠিন। এই মৌলিক বিষয়ে লাগসই প্রস্তাব গাইডলাইনে লক্ষ করিনি। এই সংকটের সুরাহা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এর জন্য বরং প্রয়োজন ছিল সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন। আশা করব ইউজিসি ও সরকার এই প্রশ্নের সমাধানের জন্য স্পষ্ট বক্তব্য নিয়ে আসবে।

সব কিছুর পরও আমরা কঠিন সময়ের বাস্তবতাকেই প্রথম গুরুত্ব দিতে চাই। ইউজিসির গাইডলাইন আমরা মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক নীতিনির্ধারকদের গতিশীল করবে। আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে অগুনতি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। প্রজন্মের এই উজ্জ্বল অংশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে নির্জীব হয়ে যাক, তা আমাদের জন্য হবে সবচেয়ে ক্ষতির কারণ। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, সংকট মোচনে দায়িত্বশীলরা যৌক্তিকভাবে এগিয়ে আসবেন।

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]