kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

দূরদৃষ্টিতেও তিনি অনন্য

সৌমিত্র শেখর

২২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দূরদৃষ্টিতেও তিনি অনন্য

যৌবনের প্রারম্ভে পাল্টাতে কে না চায়, কে না মনে করে অন্যায় দূর হোক সর্বক্ষেত্র থেকে? আমিও চেয়েছিলাম। আর চেয়েছিলাম বলেই সে সময় খুঁজেছি এই চেতনাগ্নিতে ইন্ধনের উপাদান। পেয়েছিলাম। সময়টা ছিল এরশাদবিরোধিতার। ফলে প্রায় সবাই রাজনীতির এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাতেই ছিলেন মগ্ন। কিন্তু প্রত্যক্ষ রাজনীতি ছাড়াও সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি ইত্যাদিকে মুখ্য করে যাঁর লেখাগুলো আমাকে তাড়িয়েছিল সে সময়, তাঁর নাম ‘গাছপাথর’। ‘গাছপাথর’ শব্দটিও সেই প্রথম জানা। দৈনিক ‘সংবাদ’ পত্রিকার মঙ্গলবারের ভেতরের পাতাটা তখন খুব টানত আমাকে। সেখানে ‘সময় বহিয়া যায়’ উপসম্পাদকীয় কলাম লিখতেন ‘গাছপাথর’। পরে জেনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছদ্মনামে লিখতেন সেই কলাম। অন্যদের কলামগুলোতে যেখানে প্রত্যক্ষ রাজনীতির কথাই থাকত বেশি, গাছপাথর লিখতেন অপ্রত্যক্ষ রাজনীতির কথা : প্রায়ই উপজীব্য থাকত শিল্প বা সাহিত্য।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আর দশজনের মতো শুধুই ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন না। তিনি ছিলেন অজস্র মুক্ত ছাত্রের শিক্ষক। পড়েছেন ও পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। এ ছাড়া তাঁর পড়া ও গবেষণা ইংল্যান্ডের লিডস ও লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সাহেবি ভাব তাঁকে কোনো দিন পেয়ে বসেনি। বচন, রচন, আচরণ ও জীবনযাপন—সর্বক্ষেত্রেই তিনি আদর্শ বাঙালির অনন্য দৃষ্টান্ত; খুবই সাদামাটা। আলাপ করলে বোঝা যায়, বিনয়ের অবতার তিনি। জীবনাচরণে এতটা বিনয় তিনি কিভাবে প্রকাশ করেন, ভাবলে অবাক হতে হয়। বাংলা ও বাঙালির জন্যই জীবনোৎসর্গ তাঁর। তাই গত শতকের ছয়ের দশকের আমাদের সাংস্কৃতিক সংগ্রামে তিনি অংশগ্রহণ করেন। এই চেতনার প্রতিষ্ঠা চান ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে। তিনি যখন বাংলায় বক্তৃতা দেন, তখন মোটেও বিদেশি শব্দের অনাবশ্যক প্রবেশ ঘটান না; যখন ইংরেজি বলেন তখন তাঁর অনর্গলতায় মুগ্ধতা আসে। তিনি যখন বাংলা লেখেন, তখন সেখানে সৃষ্টি করেন নিজস্ব ও অনন্য এক স্টাইল; যখন তিনি পত্রিকা সম্পাদনা করেন তখন সেটি হয়ে ওঠে চিন্তাশীলতার ক্ষেত্রভূমি।

বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। লিখেছেন বিভিন্ন ধারার লেখা। তার পরও তিনি মূলত চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক হিসেবেই বাঙালি পাঠকদের কাছে পরিচিত। ১৯৬৪ সালে বের হয়েছিল তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘অন্বেষণ’। এরপর বহু প্রবন্ধগ্রন্থ বের হয় ও হচ্ছে। ‘স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি’, ‘বাঙালী কাকে বলি’, ‘বাঙালীকে কে বাঁচাবে’, ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের সত্যমিথ্যা’, ‘ঔপনিবেশের সংস্কৃতি’, ‘বাঙালীর জাতীয়তাবাদ’ ইত্যাদি গ্রন্থে তিনি তুলে ধরেছেন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, সংকট ও পরিত্রাণের পথ। ফলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের নানা বিষয়ের সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোও তাঁর আলোচনায় এনেছেন। আর এ সবকিছুর কেন্দ্রে আছে শোষণহীন সমাজের প্রত্যয় আর মানবীয় সরল বিশ্বাস বিকশিত হওয়ার আশা।

সিক স্যারের কাছে আমি গ্রন্থ সম্পাদনার পাঠও নিয়েছিলাম। ২০০১ সালে ‘সাহিত্যশিল্পদর্শন’ গ্রন্থটি যখন সম্পাদনা করি তখন তিনি ‘সাহিত্যের দর্শনানুসন্ধান’ শিরোনামে একটি চমৎকার লেখাই শুধু দেননি, একজন গ্রন্থ সম্পাদকের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী তা আমাকে বুঝিয়েও দিয়েছিলেন। ২০২১-এ ‘বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা’ গ্রন্থ সম্পাদনাকালেও পেয়েছি তাঁর লেখা : ‘বঙ্গবন্ধু এবং একটি ছোট ঘটনার বড় তাৎপর্য’ শিরোনামে। প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের অল্প কিছুদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পরীক্ষাসংক্রান্ত দাবিদাওয়া নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীর কার্যালয় ঘেরাও করে। এ অবস্থায় তিনিসহ চার শিক্ষক গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে ঘটনার বিবরণ দিলে বঙ্গবন্ধু সেদিন নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষকদের উদ্ধার ও সমস্যার দ্রুত সমাধান করেন। এ প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লেখেন, ‘আমাদের সৌভাগ্য, বাহাত্তর সালে বঙ্গবন্ধু ছিলেন, যে জন্য ওই সংকট থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পেরেছিলাম। কারণ বঙ্গবন্ধু নিজে সক্রিয় ছিলেন।.....এসব ঘটনা ইতিহাসের অংশ। ঘটনাগুলো স্মরণে রাখা দরকার। সামনে এগোনোর আবশ্যকতায়।’ এভাবেই বঙ্গবন্ধুর আপাত ক্ষুদ্র ও অলিখিত পদক্ষেপকেও ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে স্মরণ করান তিনি। বঙ্গবন্ধু সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত না হলে ওই ঘটনাটি যে বড় সংকটের সূচনা করতে পারত, সেই আশঙ্কার কথাই ব্যক্ত করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এভাবেই জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বত্র আপাত ছোট ঘটনার মধ্যেও সমস্যা অথবা সম্ভাবনার বীজ খুঁজে পান তিনি। এই দূরদৃষ্টিতেও তিনি অনন্য। কাল ২৩ জুন তাঁর জন্মদিন। তাঁকে অগ্রিম শুভেচ্ছা।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা