kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

বিশ্ব অলিম্পিক দিবস

ইকরামউজ্জমান

২২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিশ্ব অলিম্পিক দিবস

আগামীকাল ২৩ জুন বিশ্ব অলিম্পিক দিবস। হারিয়ে যাওয়া অলিম্পিক পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক অলিম্পিকের জন্মদিন। ১২৭ বছর আগে ১৮৯৪ সালে ফ্রান্সের সরবোনের গ্র্যান্ড অ্যাম্ফিথিয়েটারে অ্যামেচার স্পোর্টস নীতি নির্ধারণের জন্য আয়োজিত সাধারণ কংগ্রেসে ফ্রান্সের শিক্ষাবিদ, মানবদরদি মনীষী ব্যারন পিয়েরে দ্য কুবারতিন ৪৯টি দেশ থেকে আগত ৭৯ জন বিভিন্ন খেলার প্রতিনিধি এবং দুই হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে অলিম্পিক গেমস পুনরুদ্ধারের বিষয়ে তাঁর প্রস্তাবে বলেন, অপেশাদার এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতা প্রাচীন অলিম্পিক প্রান্তরের আদর্শ ও নীতির অনুকরণে অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রতিযোগিতা কোনো এক জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ঐতিহাসিক ঘোষণায় তিনি আরো বলেছেন, অদ্য অপরাহ্নে বিদ্যুত্শক্তির সাহায্যে বিশ্বে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে কয়েক শ বছর পর গ্রিক অলিম্পিক পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। আপনাদের সবার প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক এই ক্রীড়ার মাধ্যমে বিশ্বের শান্তির আন্দোলন শক্তি লাভ করুক। কুবারতিনের প্রস্তাব বিপুল করতালি ও উল্লাসের মাধ্যমে গৃহীত হয়। কুবারতিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়। ৩৯৩ সালে হারিয়ে যাওয়া অলিম্পিক আবার ফিরে আসে বিশ্ব মানব সমাজে! এরপর ১৮৯৬ সালে গ্রিস থেকে আধুনিক অলিম্পিকের যাত্রা শুরু। অ্যাম্ফিথিয়েটারের সভায় পিয়ের দ্য কুবারতিন নতুন গেমসের ‘মটো’ বা মর্মবাণীরও প্রস্তাব দেন। সেটি হলো সিটিয়াস-অনটিয়াস-ফর্টিয়াস। শব্দ তিনটি লাতিন। বাংলা অর্থ হলো দ্রুততর, উচ্চতর ও শক্তিধর। যা সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। এই তিনটি কথার মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন কুবারতিনের বন্ধু ধর্মযাজক ফাদার ডিডো। কুবারতিন তাঁর কাছ থেকেই কথাগুলো সংগ্রহ করে তাঁর প্রস্তাবে উত্থাপন করেছিলেন। এই মর্মবাণী প্রতিফলনের মাধ্যমে বিশ্ব প্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে খেলাধুলার উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাতে কুবারতিনের চিন্তায় নতুন একটি চিন্তাধারা জন্ম নেয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বিশ্ব যুবসমাজের মধ্যে মৈত্রী-বোঝাপড়ার সম্পর্ক গড়ে তুলতে খেলাধুলা বিশেষ সহায়ক হতে পারে। তাঁর চিন্তায় আরো এসেছে, খেলাধুলার মাধ্যমে পৃথিবীর সব দেশকে একটি মঞ্চে উপস্থিত করা যেতে পারে। তখন থেকে তিনি এমন একটি ক্রীড়া উৎসবের রূপরেখা মাথায় ধরে রাখেন; যেখানে বন্ধুত্ব ও প্রীতির মাধ্যমে পৃথিবীর সব দেশের যুব প্রতিনিধিরা এসে মিলিত হবেন নির্দিষ্ট ক্রীড়া চত্বরে; যেখানে খেলাধুলাই হবে মুখ্য বিষয়। এটি তারুণ্যের উৎসব। জীবনের উৎসব। এখান থেকেই অতীতের অলিম্পিক গেমস পুনরুদ্ধার করে আধুনিক গেমস অনুষ্ঠানের স্বপ্ন দেখেছেন কুবারতিন। আর এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ বিষয় নয়, এটা তিনি বুঝতেন। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্বপ্নের পথ ধরে হেঁটেছেন, বিভিন্ন ধরনের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বপ্ন সফল হয়েছে। মানবকল্যাণে তাঁর আদর্শ ও চিন্তা জয়ী হয়েছে। অলিম্পিক চত্বরে যাঁদের উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছে, অলিম্পিককে কেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ যুব উৎসব বলে অভিহিত করা হয় তা তাঁরা বুঝতে পেরেছেন। বুঝতে পেরেছেন প্রাণের উৎসবের গভীরতা কত বেশি।

বর্তমান বিশ্বে অলিম্পিক গেমস সর্ববৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইভেন্ট হিসেবে পরিচিত। আমরা সব সময় অলিম্পিক আন্দোলনের কথা বলি ও শুনি। এ ক্ষেত্রে ভুল-বোঝাবুঝিও আছে। অলিম্পিইজম কিন্তু স্পোর্টস কম্পিটিশন নয়। এটি একটি স্টাইল ও জীবনদর্শন। অলিম্পিকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য চার্টারে সব কিছু বিস্তারিত ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। একসময় অলিম্পিকের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বলা হয়েছিল—‘সীমাবদ্ধতার সব দরজা খুলে দাও’। এই স্লোগানের পেছনে যুক্তি ছিল। কুবারতিনের আদর্শ, নীতি ও দর্শনেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে সময় ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। এতে কিন্তু উদ্দেশ্য ম্লান হয়নি।

১৮৯৬ সালে গ্রিসে যখন প্রথম আধুনিক অলিম্পিক গেমস যাত্রা শুরু করে তখন থেকেই একটি প্রশ্ন উঠেছে—‘অলিম্পিক কিসের জন্য’। আধুনিক অলিম্পিক গেমস ১২৫ বছর অতিক্রম করতে যাচ্ছে—এই প্রশ্ন কিন্তু এখনো আছে। অলিম্পিক জীবনবোধের সপক্ষে পাল্লা প্রথম থেকে ভারী হলেও আলোচনা থেমে নেই। অলিম্পিক পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে সজাগ ও সচেতন। তাঁরা জানেন, এমন একটি বিশ্বে বাস করেন যেখানে বিচ্ছেদ সমস্যার সমাধান নয়। রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, ধর্ম বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা থাকবেই। এটিকে মোকাবেলা করতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। ইতিহাস বলছে, অলিম্পিক গেমস ও অলিম্পিক মুভমেন্ট শুধু টিকে নেই; সময়ের সঙ্গে অনেক বেশি সমৃদ্ধিশালী ও আবেদনময়ী হয়েছে। অলিম্পিক গেমস ও আন্দোলনের প্রতি মানবসমাজের আস্থা ও বিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্ব মানব সমাজ এখন অলিম্পিক আন্দোলনকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখছে। দেখছে কার্যকরী ভূমিকা বিশ্বজুড়ে।

কিছুদিন আগে অনেক বই ও প্রবন্ধের লেখক ইয়ান বুরুমার  (Ian Buruma) একটি নিবন্ধ পড়েছি; সেখানে তিনি টোকিও অলিম্পিকের বিরোধিতা করে লিখেছেন, ‘অলিম্পিক গেমস প্রকৃতপক্ষে আইওসির জন্য, পৃষ্ঠপোষকদের জন্য, উঠতি ধনীদের জন্য এবং কখনো কখনো দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের জন্য এক বিমান বাণিজ্যের আধার; যাদের জন্যই অলিম্পিক।’ এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই বলে দুঃখিত। অলিম্পিককে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এটা বলা যায়, অলিম্পিকের চলার পথে আধারের চেয়ে আলোই বেশি। জয় হয়েছে বারবার সুস্থ বিবেকের।

১৯৪৮ সালের ২৩ জুন প্রথম বিশ্ব অলিম্পিক দিবস পালন করেছে ৯টি দেশের এনওসি। ১৯৭৮ সালে আইওসি প্রতিটি দেশের এনওসিকে প্রথমবারের মতো সুপারিশ করেছেন অলিম্পিক উদযাপন এবং অলিম্পিক আন্দোলন তুলে ধরার জন্য। ২০০৯ সালের ২৩ জুন থেকে অলিম্পিক দিবসে প্রতিটি দেশের এনওসি অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে ‘ডে’ রানের আয়োজন করছে। বাংলাদেশ এনওসি এর ব্যতিক্রম নয়।

এবারের অলিম্পিক দিবসে বলতে চাচ্ছি, আঞ্চলিক গেমস অলিম্পিক মুভমেন্টে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আইওসির উচিত এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি সমর্থন ও সাহায্য করা। আমাদের মতো দেশগুলোর ন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটির কাছে আঞ্চলিক গেমস খুবই প্রয়োজনীয়। এনওসিগুলোর অর্থসম্পদ কম এবং সীমিত যে বরাদ্দ পায় এতে ক্রীড়া তৎপরতা পরিচালনার জন্য মোটেই সুখকর নয়। সব সময় জোড়াতালি দিয়ে চলা। বেশির ভাগ এনওসির তো অলিম্পিকে অংশগ্রহণ হলো ‘সিম্বলিক’ এবং বিশেষ বিবেচনায়। তারা অংশ নেয় তাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে—এটাই বাস্তবতা।

যদি আইওসি আঞ্চলিক গেমসকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে স্বীকৃতি দেয়, এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে এ ক্ষেত্রে আর্থিক সাহায্যের হাত প্রসারিত করে তাহলে এনওসিগুলো কিন্তু অলিম্পিকে যাওয়ার জন্য হা-পিত্যেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন না হয়।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

 



সাতদিনের সেরা