kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

ভিন্নমত

শেয়ারবাজার নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে

আবু আহমেদ

২২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



শেয়ারবাজার নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে

সাম্প্রতিককালে শেয়ারবাজার যথেষ্ট বেগবান। আমাদের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক বাধা কাজ করে যে সূচক ছয় হাজার মানে সর্বোচ্চ সীমা। ফলে সূচক ছয় হাজারে উঠলেই শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়ে। সম্প্রতি শেয়ারবাজার এই মনস্তাত্ত্বিক বাধাও অতিক্রম করেছে এবং সূচক ছয় হাজার অতিক্রম করেছে। যেহেতু সূচক বাড়ছে, সঙ্গে সঙ্গে টার্নওভারও বাড়ছে। সম্প্রতি দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকার টার্নওভার হয়েছে। পরে তা দুই হাজার ৫০০-তে নেমে আসে। এখন দেখা দরকার এই প্রবৃদ্ধিটা কত দিন থাকে। সেটা দেখতে গেলে আমাদের হয়তো দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। আবার মার্কেট সব সময় চাঙ্গা থাকবে এটা আশা করা ঠিক নয়। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, শেয়ারবাজারের এই সাম্প্রতিক সময়ের উত্থানের পেছনে বাজারে থাকা ভালো কোনো শেয়ারের অবদান নেই, শক্ত মৌল ভিত্তি শেয়ারের কোনো অবদান নেই বললেই চলে। এটা নিয়েই আমি শঙ্কিত। আরো অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এই উত্থানটা ঘটেছে মূলত বীমা খাতকে কেন্দ্র করে। এখানে নানা ধরনের ভুল ধারণা দেওয়া হচ্ছে লোকজনকে। বলা হচ্ছে, বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ-ইদরা এজেন্টদের কমিশন ১৫ শতাংশের নিয়ে এসেছে বলে বীমা কম্পানিগুলোর লাভ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এজেন্টদের কমিশন কমানোয় বীমা কম্পানিগুলোর লাভ হলেও সেটা হবে খুবই প্রান্তিক। শেয়ারবাজারে বীমা খাতে ঝোঁকার পেছনে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে ব্যাংক ট্রানজেকশন, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে বীমার কাভারেজ লাগবে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে বীমা কম্পানি ঘিরে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা। চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এত বীমা কম্পানি সম্ভবত বাংলাদেশের মতো কোনো ছোট অর্থনীতিতে কোথাও নেই। গ্রাহকদের কম বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই দেশের বেশির ভাগ বীমা কম্পানি ব্যবসা করছে। দুই-চারটা কম্পানি বিশ্বাসযোগ্যভাবে কাজ করছে, ভালো করছে। কিন্তু ৫০-৬০টা বীমা কম্পানি সবাই ভালো করবে এবং সবার শেয়ারের দাম ১০ গুণ হয়ে যাবে, এটা অভাবনীয়, অচিন্তনীয়।

কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘জীবন বীমার টাকা পেতে জীবনক্ষয়’ একটি প্রতিবেদনে জানা গিয়েছিল, বিভিন্ন বীমা কম্পানি বীমার মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক দিন পরও গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিচ্ছে না। একেকটা কম্পানির অভিযোগকারী গ্রাহকের সংখ্যা হাজার হাজার। এ ছাড়া সম্প্রতি জানা গেছে, গ্রাহকদের মামলায় বীমা কম্পানির চেয়ারম্যানসহ অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত পরোয়ানা জারি করেছেন। অনেক কম্পানিই গ্রাহকদের ঘুরাচ্ছে বলে অভিযোগ আসছে। এসব খবর গণমাধ্যমে খুব একটা আসে না। এ ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কম্পানিগুলো কত দিন চলতে পারে? আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরও একেকটা বীমা কম্পানির শেয়ারের দাম ৩০ টাকা থেকে হয়ে গেছে ১৩০ টাকা। তা-ও মাত্র অল্প কিছুদিনে। বাজারে যেটা ঘটছে তা হলো, মোট টার্নওভার দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকার ৮০ শতাংশই জুয়া থেকে আসছে। স্রেফ জুয়া। এখানে শেমলেস গ্যাম্বলিং হচ্ছে। অবস্থাটা এমন, জুয়ায় আসক্ত লোকজন শেয়ারবাজার থেকে আয় করতে চায়, কিন্তু দুই-ছয় মাস, এক বছর অপেক্ষা করতে রাজি নয়।

এই উত্থানের পেছনে আরেকটি বড় ভূমিকা রাখছে মার্জিন লোন। ব্রোকার হাউসগুলো, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো উদার হস্তে মার্জিন লোন দিচ্ছে। অবশ্য এটাই তাদের বড় ব্যবসা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যারা শর্ট টার্ম গেইন (অল্প সময়ে অধিক লাভ) করতে চায়, তারাই মার্জিন লোনগুলো নিচ্ছে। অথচ যারা জুয়ায় আসক্ত, তাদের সামান্য কয়েকজনই লাভ করতে পারে। তারা একটা শেয়ার ৫০ টাকায় কিনে ৮০ টাকায় বিক্রি করছে। বিশাল লাভ। পরে আরেকটা কম্পানিতে ঢুকে ৯০ টাকার শেয়ার ১৩০ টাকায় বিক্রি করছে। কিন্তু লাভেরও তো একটা সীমা আছে। সারা পৃথিবীতেই দেখা গেছে, যখন একটা বিগ সার্জ (ঊর্ধ্বগতি) এসেছে, তখনই বড় পতন ঘটেছে। অর্থাৎ শেয়ারবাজারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বড় উত্থান বড় পতন ডেকে আনে। আমি মনে করি, মার্জিন লোন নিয়ে সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের নজর রাখা উচিত ছিল। কারণ পরে এ নিয়ে তাদের সমালোচিত হতে হবে। আমার কাছে মনে হয়েছে, অন্তত বীমা ক্ষেত্রে মার্জিন লোনের ব্যাপারে সিকিউরিজিট এক্সচেঞ্জ কমিশনের একেবারে কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত। না হলে এটা শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাজারকে আবার সেই নো কনফিডেন্সের জায়গায় নিয়ে যাবে। জুয়াড়িরা বীমা খাতের শেয়ার যে দামে নিয়ে গেছে, শেষ পর্যন্ত তারা তা ধরে রাখবে না। যখনই বাজারটা স্থিতিশীল হবে, ডাউনওয়ার্ড বিহেভ বা পেছনের সার্কেলে ফিরবে, তখনই তারা সেলার হয়ে যাবে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারই এমন ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটা বীমা কম্পানির বায়ার পাওয়া যায়নি।

সত্য কথা বলতে আমি শঙ্কিত। শেয়ারবাজার অর্ডারলি বা নিয়মতান্ত্রিকভাবে উঠলে ঠিক আছে। না হলেই মহামুশকিল। হঠাৎ যখন একটি সেক্টর বাড়তে থাকে, তখন অন্য সেক্টর একেবারে ঝিমিয়ে পড়ে। কারণ সব মানুষ ওইখানে ঝুঁকে। যেমন—এই মুহূর্তে বীমা খাতের ক্যাপিটাল টার্নওভার বেশি। কয়েকটা উদাহরণ দিই। জিপির দাম বাড়েনি। জিপি ভালো অবস্থায় থাকার পরও দাম বাড়েনি। ব্রিটিশ আমেরিকা টোব্যাকো কম্পানিরও একই অবস্থা, উল্টো দাম পড়ে গেছে। বার্জার যেখানে আছে সেখানেই। লিন্ডেবিডির দামও উল্টো পড়ে গেছে। কখন পড়ল? যখন মার্কেটের ইনডেক্স পাঁচ হাজার ৬০০ থেকে ছয় হাজার ১০০-তে উঠেছে। এর বিপরীতে বীমা খাতের শেয়ার সামগ্রিকভাবে তিন গুণ দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো কোনো বীমা কম্পানির দাম ১০ থেকে ১৫ গুণ বেড়েছে। সূচক ছয় হাজার ১০০ হওয়া মানে মৌল ভিত্তির কম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি অবশ্যই টেকসই ছিল এবং সূচক বৃদ্ধির পেছনে তাদের অবদানও আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তিন-চার মাস আগে এসব শেয়ারের দাম যেখানে ছিল সেখান থেকেও পিছিয়ে পড়েছে। কারণ এই মৌল ভিত্তির কম্পানিগুলোর শেয়ার বিক্রি করেই লোকজন বীমার দিকে ঝুঁকেছে। আমাদের বিনিয়োগকারীরা এসব বিষয় বিশ্লেষণ করতে চান না। তাঁদের ৮০ শতাংশই ডে ট্রেডার। তাঁরা কম্পানি সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখেন না। কম্পানি কারা চালাচ্ছে, কম্পানির পেছনের পাঁচ বছরের অবস্থা কী ছিল, ভবিষ্যতে কত আয় করতে পারে তার তথ্য বা পূর্বাভাস তাঁরা জানেন না। শুধু ক্যাপিটাল গেম নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু এর তো একটা সীমা আছে। এ জন্য আমার অনুরোধ, যেহেতু এ ক্ষেত্রে আর কোনো টুল কমিশনের হাত নেই, তাই মার্জিন লোনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা জরুরি। এ জন্য কেউ কেউ অভিমান করতে পারেন যে তাঁদের শেয়ারটা পড়ে যাবে। কিন্তু পরে ক্ষতিটা যে আরো বড় হবে? সূচক আরো ৩০০ পয়েন্ট বাড়লে মার্কেট নিজেই তো অটোমেটিক কারেকশনে যাবে, অটোমেটিক পানিশমেন্ট দেবে। ফোর্সড সেল হবে। এটা দুনিয়াজুড়েই পুঁজিবাজারের নিয়ম। পরে এই জুয়াতাড়িত ডে ট্রেডাররা হৈচৈ শুরু করবে, কথা বলবে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বিরুদ্ধে। সুতরাং আমাদের জাজমেন্ট হচ্ছে বাজারে কিছু শেয়ার অতিমূল্যায়িত হয়েছে। বাজার অতি উত্তপ্ত করা হচ্ছে। কমিশনের দায়িত্ব আছে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করা।

আমি সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনকে আরেকটি অনুরোধ করব, এই সময়ে যাতে ইনস্যুরেন্স কম্পানির কোনো উদ্যোক্তা শেয়ার বিক্রি করতে না পারেন। অতীতে দেখা গেছে, উত্তপ্ত হওয়ার সুযোগ নিয়ে অনেক উদ্যোক্তা বের হয়ে গেছেন মার্কেট থেকে। পরে তাঁদের শেয়ার কমে গেছে। তখন তাঁরা বলেন, ‘বাজার তো আমরা দেখি না। বাজার পড়ে গেলে আমরা কী করব? সুতরাং উদ্যোক্তারা যেন সুযোগটা নিতে না পারেন। এখন যে পাগলামি হচ্ছে তার পেছনে অনেক উদ্যোক্তার ভূমিকাও আছে। সামগ্রিকভাবে সম্প্রতি উত্থানের পেছনের কারণগুলো হচ্ছে স্পেকুলেশন, জুয়াবাজি, কিছু উদ্যোক্তার কারসাজি এবং বিরাট মার্জিন লোন। এই মুহূর্তে বাজারে চালু হয়ে গেছে যে শেয়ার, মানে বীমার শেয়ার। এটা বিপজ্জনক। তাই বেশি ক্ষতি হওয়ার আগেই সিকিউরিজি এক্সচেঞ্জ কমিশনের একটু নড়েচড়ে বসা উচিত।

আরেকটা বিষয় লক্ষ করা দরকার। একটা নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আইপিওতে নতুন এসেছে। এর শেয়ারের দাম ছিল মাত্র ১১ বা ১২ টাকা। সেই শেয়ারের দাম ৩৯ টাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ অনেক ভালো ভালো ব্যাংকের দাম পড়ে আছে ২০ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে। এখানে কি কারসাজি হয়নি? নতুন ব্যাংকটি মাত্র সাত মাস আগে এসেছে লিস্টিংয়ে।

এ জন্যই আমাদের মার্কেটে প্রকৃত বিনিয়োগকারী পাওয়া যায় না। কেউ দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করতে চায় না। প্রায় সবাই জুয়া খেলতে চায়। অথচ ওয়ারেন বাফেট বলেছেন, ‘আপনাকে শেয়ার কিনতে হবে তিন থেকে ছয় বছরের জন্য। তাতে শেষ পর্যন্ত আপনি জিতবেন।’ এখানে জুয়ায় আসক্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হয়তো ৫ শতাংশ জিতে যেতে পারে। কিন্তু ৯৫ শতাংশই ধরা খাবে।

এখানে আরেকটা কথা বলা দরকার। আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য নতুন কিছুই করা হয়নি। বরং আগে বাজারে কালো টাকা আসার সুযোগটা উন্মুক্ত ছিল, এখন এটা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে লিস্টেড কম্পানির ক্ষেত্রে। অথচ একই জিনিস করা হয়েছে নন-লিস্টেড কম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও। সুতরাং গুণগত পার্থক্য এখানে হয়নি। লক্ষণীয় বিষয় হলো লিস্টেড কম্পানির করপোরেট কর আগে ছিল ২৫ শতাংশ। এখন কমে ২২.৫ শতাংশ হবে, যা সর্বনিম্ন করপোরেট কর। কিন্তু এগুলো খুবই ছোট ছোট কম্পানি। যেমন—জিপি, ব্রিটিশ আমেরিকা টোব্যাকো কম্পানি, বীমা কম্পানি, ব্যাংকিং কম্পনিগুলো এর বাইরে। এসব কম্পানির কোনো করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স কমানো হয়নি। কমানো হয়েছে শুধু ছোট কিছু কম্পানির করপোরেট কর। ফলে বাজেট ঘোষণার পর এর কোনো প্রতিফলন শেয়ারবাজারে দেখা যায়নি। সম্প্রতি যে প্রাইজ মুভমেন্ট হচ্ছে, সেটা যদি এমন হতো এখানে কর আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে বলে মানুষ এর প্রতি ঝুঁকব—তাহলে ঠিক ছিল। কিন্তু সেটা ঘটেনি।

আমি শেষ কথাটা বলতে চাচ্ছি, শেয়ারবাজারকে উত্তপ্ত করা বা সূচককে ওপরে নেওয়া কারো উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। শেয়ারবাজারে ভালো কম্পানি সাপ্লাই দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর সূচক বাড়বে এবং এটা টেকসই হবে। না হলে চলমান সূচক টেকসই না হয়ে একটি ‘মিনি ২০১০’ ডেকে আনতে পারে। সুতরাং অতি মাতামাতি না করে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে যে বাজারে ভালো কম্পানি না আনলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা বাড়বে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের বড় বড় অবকাঠামোগুলোকে কম্পানি করে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসা উচিত।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা