kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৯ জুলাই ২০২১। ১৮ জিলহজ ১৪৪২

এই সব নৃশংস হত্যাকাণ্ড

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এই সব নৃশংস হত্যাকাণ্ড

কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ঘটনার ভয়াবহতা ও মাত্রা একটি অন্যটিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নৃশংস পারিবারিক হত্যাকাণ্ডগুলো আমাদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক। সমাজ বড় শঙ্কিত, আতঙ্কিত, হতাশাগ্রস্ত ও রীতিমতো উদ্বিগ্ন। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে অসম্ভব মাত্রায় চিড় ধরেছে। আস্থাহীনতা ও সন্দেহ দেখা দেওয়ায় বিকৃত মানসিকতা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কিছু মানুষ যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পারিবারিক সম্পর্ককে আমরা অতীতে যেভাবে দেখতাম এবং যে রীতি-নীতিতে বিশ্বাস করতাম তা যেন আর ধরে রাখতে পারছি না। অন্যান্য সম্পর্কের মতো এ সম্পর্কের মাঝেও উত্থান-পতন থাকবে। সব কিছু মেনে নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এমন নৃশংস আচরণ আমাদের কেন দেখতে হবে?

শুধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে নৃশংসতা থেমে থাকছে না, লাশ টুকরো টুকরো করে পথে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। পুরান ঢাকার কদমতলীতে এক নারী তার মা-বাবা ও বোনকে হত্যা করে নিজেই ৯৯৯ নম্বর এ পুলিশকে ফোন দেয় এই বলে, পুলিশ না এলে স্বামী ও সন্তানকেও হত্যা করবে। পারিবারিক বিরোধের জেরে বাবা, মা ও বোনকে চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার পর শ্বাস রোধ করে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। সৌভাগ্যক্রমে স্বামী ও সন্তান বেঁচে যান। হত্যাকারী নারীর আগে অপরাধের রেকর্ড ছিল বলে আমাদের জানা নেই; কিন্তু অপরাধ করার মতো মনস্তত্ত্ব কিংবা মানসিক বিকারগ্রস্ততা তার মধ্যে ছিল, নইলে একসঙ্গে তিনজনকে হত্যা করল কিভাবে। সিলেটের গোয়াইনঘাটে স্বামী তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে নিজেকে আড়াল করতে চেয়েছিল। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। সিলেট শহরে পরকীয়ার কারণে স্বামীকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে প্রেমিকার সহায়তায় হত্যা করে এক স্ত্রী। হত্যাকাণ্ডের ১০ দিনের মাথায় খালাতো ভাই প্রেমিককে বিয়ে করার ঘটনায় পরিবারে সন্দেহ হলে আসল ঘটনা বের হয়ে আসে। অপেক্ষাকৃত পরিকল্পিত এ ঘটনা আমাদের জানান দেয়, আমরা সম্পর্ককে শুধু একটি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছি। নিকট অতীতে ঢাকার দক্ষিণখানে ইমাম কর্তৃক পরকীয়ার জেরে একজনকে মসজিদে ডেকে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করে ট্যাংকে ভরে রাখা হয়। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরও স্বাভাবিকভাবে মসজিদে নামাজ পড়াতেন হত্যাকারী ইমাম। তাঁর মধ্যে তেমন কোনো শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দেয়নি। স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে হত্যা করে টুকরো টুকরো লাশ বনানীর রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় কেন যেন আজ বেশি মাত্রায় অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। আমাদের মধ্যে সহনশীল মনোভাব কমে আসছে এবং সাবলীল চিন্তা লোপ পাচ্ছে। এমন এক মানসিকতা কাজ করছে, যেখানে প্রচলিত আইন, বিচার ও শাস্তি মনের মধ্যে ভয়ের কোনো সঞ্চার করতে পারছে না।

এ কথা সত্য, নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কষ্ট দূর করার জন্য প্রতিশোধের মনোবৃত্তি নিয়ে অনেকে হয়তো নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তৃপ্তি পাচ্ছে। যিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাঁর মনস্তত্ত্ব এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে অপরাধ করার পরও তাঁর মধ্যে কোনো ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে না। কেননা তাঁর কাছে হয়তো মনে হয়েছে, হত্যা করা ছাড়া কোনো বিকল্প পথ নেই। নিজের মনে স্বস্তি পাওয়ার যেন একটি পথ হত্যা করা। এ ধরনের মানুষের মনোজগতের মধ্যে পরিবর্তন আনা না গেলে, তাদের ভুল ধারণাগুলো পরিবর্তন করতে না পারলে সমাজে নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনোক্রমেই রোধ করা সম্ভব হবে না। আমাদের জন্য এ এক ভয়ংকর সংকেত। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড সমাজের অপরাপর জনগোষ্ঠী এবং নতুন প্রজন্মের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা এমন এক পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে বসবাস করছি, যা অনেকটা অন্তঃসারশূন্য। শুধু এর কাঠামো আছে কিন্তু কাঠামো শক্ত, মজবুত, সাবলীল ও টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো অনুপস্থিত। আমাদের উচিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পারিবারিক সম্পর্ককে সঠিক পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করা, এর নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে পালনে উদ্যোগী হওয়া, পারিবারিক প্রয়োজন ও চাহিদাগুলো ভালোভাবে পূরণে সচেষ্ট থাকা, প্রত্যেকের ভূমিকা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে অনুশীলন করা। প্রতিষ্ঠানকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে রেখে সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কগুলো আগেকার মতো টিকিয়ে রাখতে সচেতন হওয়া। নইলে আমরা কোনোভাবেই নৃশংস আচরণ রোধ করতে পারব না।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]