kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

উদার মানবতাবাদী সুফিয়া কামাল

রেখা সাহা

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



উদার মানবতাবাদী সুফিয়া কামাল

মানবতাবাদী দর্শন আর আদর্শের আন্দোলনে এক অবিস্মরণীয় নাম সুফিয়া কামাল। অন্যায়-অবিচার আর অসাম্যের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী নাম সুফিয়া কামাল। উদার মানবতাবাদী চেতনায় ঋদ্ধ এক অগ্রগামী পথপ্রদর্শকের নাম সুফিয়া কামাল। বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য গড়ার এক সুনিপুণ কারিগর। দেশের বিভিন্ন সংকটকালে তিনি সুনিপুণ কারিগরের মতো নানা মত ও নানা পথের মানুষকে এক অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে একসূত্রে গাঁথতে পেরেছিলেন। এখানেই তাঁর স্বকীয়তা। তিনি তাঁর অনমনীয় ব্যক্তিত্ব আর অতুলনীয় স্বকীয়তার গুণে এ দেশের শান্তি-সম্প্রীতির সংগ্রাম, উগ্র মৌলবাদ আর ফতোয়াবাজির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, নারীকে সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা আর তার ব্যক্তি অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, অমানবিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামসহ সব প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, গণমানুষের সংগ্রামে হয়ে উঠেছিলেন অপরিহার্য দিশারি। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামের সঙ্গে আত্মিক ও আদর্শিক যোগাযোগ তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাকে শাণিত করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এরপর ’৫২, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯-এর পথ ধরে ’৭১-এ এ দেশের মহান স্বাধীনতার যুদ্ধ, ’৭৫-পরবর্তী অগণতান্ত্রিক এক অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক পশ্চাৎপদতার ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন থেকে সব প্রগতিশীল আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলনসহ সব প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি বিভিন্নভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এই সব কিছুর পেছনে ছিল তাঁর গভীর দেশপ্রেম, রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। এ কারণে তিনি সবার কাছে হয়ে ওঠেন পরমনির্ভর আশ্রয়স্থল। সুফিয়া কামাল তারুণ্যের শক্তিতে ছিলেন আস্থাশীল।

সুফিয়া কামালের কবিসত্তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গভীর জীবনবোধ, প্রগাঢ় দেশপ্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবপ্রেম, মানবজীবনের স্বাভাবিক দুঃখ-কষ্টের পরিমিত শৈল্পিক প্রকাশ, প্রকৃতির সৌন্দর্যে অনাবিল আনন্দের আবেশ। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’র ভূমিকায় লেখেন ‘কবি সাফিয়া এন হোসেন বাংলার কাব্যগগনে উদয়তারা।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থটি পড়ে ২৭ বছরের তরুণী কবিকে লিখেছিলেন, ‘তোমার কবিত্ব আমাকে বিস্মিত করে। বাংলা সাহিত্যে তোমার স্থান উচ্চে এবং ধ্রুব তোমার প্রতিষ্ঠা।’

নারী জাগরণ ও নারী মুক্তি ছিল তাঁর আরাধ্য, অভীষ্ট লক্ষ্য। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেই লক্ষ্য অভিমুখে ক্লান্তিহীন যাত্রায় প্রয়োজন সংগঠিত শক্তি। তাই যাদের জন্য কথা বলার কেউ ছিল না, যাদের মানবাধিকার আর মানবিক মর্যাদা নিত্যদিন চরম অবমাননা আর অপমানে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছিল সেই নারীসমাজের জন্য তিনি আশার আলো জ্বেলেছিলেন। কী অসাধারণ রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন স্বচ্ছতায় তিনিই প্রথম বলেছিলেন ‘নারীমুক্তি মানেই মানবমুক্তি, নারীর অধিকার মানবাধিকার।’ তিনি বুঝেছিলেন, সংগঠিত শক্তি ছাড়া নারীমুক্তির দীর্ঘ যাত্রাপথের কণ্টক অপসারণ অসম্ভব। নারীর মানবাধিকার আর নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এ দেশের স্বেচ্ছাসেবী গণনারী সংগঠন মহিলা পরিষদ। নারী ও কন্যাদের প্রতি সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। সমতাপূর্ণ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি রেখেছেন বলিষ্ঠ ভূমিকা।

বনেদি পরিবারের ঐশ্বর্যের মধ্যে বড় হয়ে উঠলেও তাঁর মনের জগৎ প্রসারিত হয়েছিল প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্যে। সাধারণ মানুষের জীবন, ব্রাত্যজনের জীবন, তাদের আনন্দ-বেদনাও তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। তাঁর কল্পনাপ্রবণ মন তাঁকে কবি বানিয়েছে আর মানবজীবন প্রেমিক সংবেদনশীল মন তাঁকে শতভাগ মানবিক মানুষ করে তুলেছে। নিজের জীবনের সব ঘাত-প্রতিঘাত, প্রতিবন্ধকতা অসীম সাহসে অতিক্রম করে, সব পশ্চাৎপদতা আর সংকীর্ণতাকে ঠেলে পেছনে ফেলে রেখে সুফিয়া কামাল মানবতার উদার জমিন তৈরির নিরলস প্রচেষ্টায় ব্রতী হয়েছেন। এ দেশের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অগ্রণী যোদ্ধা কবি সুফিয়া কামালের ১১০তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, সংগ্রামী অভিবাদন।

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পাদক কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ

মহিলা পরিষদ



সাতদিনের সেরা