kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

স্মরণ

আমার বাবা

বিচারপতি বোরহানউদ্দিন

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আমার বাবা

আমার বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সবুর আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন সারা জীবন। আমার জ্ঞান হওয়া অবধি দেখেছি বাবা আমাদের গুর্খা ডা. লেনের বাসার সামনের কামরায় বসে লোকজনের সঙ্গে কথা বলছেন অথবা খুব মনোযোগ দিয়ে আইনের বই ঘাঁটাঘাঁটি করছেন, কাগজপত্র দেখছেন, লিখছেন। এটা চলত ভোর থেকে কোর্টে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। বাবা ভাত খেয়ে সকাল ১০টায় কোর্টে চলে যেতেন। রিকশায় যেতেন। বিকেলে কোর্ট থেকে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় আবার চেম্বারে। ছোটবেলায় দেখতাম বাবার মুহুরি আনোয়ার সাহেব চেম্বারের পাশে লাগোয়া ডান দিকের কামরায় থাকতেন। খাওয়াদাওয়া আমাদের বাসায়। ষাটের দশকের ওই সময় অনেক আইনজীবীর মুহুরিরা আইনজীবীদের বাসায় থাকতেন। আমার নানা অ্যাডভোকেট এস এম মোফখ্খর সাহেবের ঢাকার বাসায়ও দেখেছি। বাবা সিভিল ল ইয়ার ছিলেন। দেওয়ানি আদালতে মামলা করতেন। ফৌজদারি মামলা তেমন একটা করতেন না। আমার দাদা আবদুল লতিফ সাহেব কলেজে পড়ার জন্য বাবাকে কলকাতায় পাঠান। বাবা ছিলেন দাদার প্রথম সন্তান। বাবা কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন। থাকতেন বেকার হোস্টেলে। আইন পেশা শুরু করেন চট্টগ্রাম জেলা বারে। আজীবন চট্টগ্রামেই ছিলেন।

আমার পরে মনে হয়েছিল, বাবার চট্টগ্রাম না ছাড়ার পেছনে আরেকটা কারণ ছিল রাজনীতি। আইন পেশা ছাড়া যে কাজটা বাবা খুব উৎসাহের সঙ্গে করতেন, সেটা রাজনীতি। আওয়ামী লীগ করতেন। বাবা বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ষাটের দশকে যখন আইয়ুব খানের দোর্দণ্ড প্রতাপ, তখনো দেখেছি ছুটির দিনগুলোর সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের সভা হতো। আমার মামারা, একজন সিএসপি অফিসার অন্যজন পাকিস্তান আর্মিতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল, বাসায় এলে গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়ার পর বাবা দুজনের কাছেই দলের জন্য রসিদ কেটে ১০ টাকা চাঁদা চাইতেন। এ নিয়ে খুব হাসাহাসি হতো। পরে অবশ্য মামারা টাকাটা দিতেন। উনসত্তর, সত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে ছুটির দিন ছাড়াও আমাদের বাসায় লোকজনের সমাগম হতো বেশি। রাজনীতির লোকজন। আসতেন আতাউর রহমান খান কায়সার, আমানিয়া হোটেলের জাকের মিয়া, মাহমুদুল হক সাহেব, মোখতার আহমদ, আনোয়ার মিয়া (বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি), মৌলভি সৈয়দ, দানেশ সাহেব (পরে লালবাহিনীর প্রধান), আরো অনেকে। রাজনীতি শুধু বাবার উৎসাহের জায়গা না, আদর্শের জায়গাও ছিল। এমনও দেখেছি সপ্তাহের কাজের দিনগুলোতে বাবা বাঁশখালীতে যাচ্ছেন। জনসভার কাজে। বিশেষ করে উনসত্তর, সত্তরের দিনগুলোতে এটা প্রায়ই ঘটত। বাবা প্রতি মাসে সাত-আট দিন বাঁশখালীতে। মুহুরি আনোয়ার সাহেব প্রায়ই অভিযোগ করতেন পেশার ক্ষতি হবে। বাবা নির্বিকার।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। বাবাসহ আমরা সবাই বাঁশখালীর খানখানবাদে গ্রামের বাড়িতে চলে গেলাম। আমাদের গ্রামের দুজনকে গুর্খা ডা. লেনের বাসার দায়িত্বে রেখে দেওয়া হলো। দুজনই শহরে রিকশা চালাত। বারিক কলোনিতে থাকত। গ্রামের বাড়িতে গেলেও বাবা আমাদের সঙ্গে রাতে থাকতেন না। রাতে তিনি থাকতেন নৌকায়। বাবা ওপারে মুক্তিযুদ্ধে যাননি। কিন্তু এপারে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন। দিনের বেলায় গ্রামের লোকজনদের নিয়ে বসতেন। বিভিন্ন ইউনিয়নে যেতেন। আমরা যে কয় মাস বাড়িতে ছিলাম, বাবাকে খুব কম দেখতে পেতাম। দু-একবার প্রফেসর আসহাবউদ্দিন সাহেবকে আমাদের বাড়িতে দেখেছি বাবার সঙ্গে কথা বলছেন।

দেশ স্বাধীন হলো। বাবা ফিরলেন। তখন আমাদের বাসা আরো জমজমাট। প্রতি সন্ধ্যায় আসতেন আতাউর রহমান খান কায়সার। তিনি তখন সংসদ সদস্য। আসতেন আওয়ামী লীগের দক্ষিণ জেলার সেক্রেটারি আবদুল মান্নান। বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের সম্পাদক আনোয়ার সাহেব তো ছিলেনই। কোষাধ্যক্ষ মাহমুদুল হক সাহেব, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোখতার আহমদ (পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের হয়ে সংসদ সদস্য হন), মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মৌলভি সৈয়দ (যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন, ’৭৫-এর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে অস্ত্রধারণ করেন, শহীদ হন), লালবাহিনী প্রধান দানেশ সাহেব, আরো অনেকে। তাঁদের তত্ত্বাবধানে আমাদের বাসা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হতো, সনদপত্রের ব্যবস্থা হতো।

বাবা সরকারি উকিল ছিলেন ’৭২ থেকে ’৭৫-এর আগস্ট পর্যন্ত। বাবা দক্ষিণ জেলা রেডক্রসের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। চেয়ারম্যান ছিলেন জেলা প্রশাসক। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আশির দশক পর্যন্ত বাবা বাঁশখালী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু আমাদের গুর্খা ডা. লেনের পাকিস্তান আমলের বাসার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেই বেড়ার বাসা। বাবার সেই চেম্বার লাগোয়া মুহুরির থাকার ঘর, আমাদের পড়ার ঘর। বাবার কোর্টে আসা-যাওয়া রিকশায়।

আমরা জানতাম বাবা কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী ছিলেন। তৎকালীন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের অনেকেই জানতেন। একবার চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির ব্যাপারে দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান সাহেব বাবাকে অনুরোধ করলেন তাঁদের সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কমিটির ব্যাপারে দেখা করার জন্য। বাবা নির্বিকার। ’৭৩-এর দিকে বঙ্গবন্ধু একবার চট্টগ্রামে এলেন। রাতে ডিনার ছিল। বাবা ডিনারে আমন্ত্রিত ছিলেন। ডিনার থেকে ফিরে বাবা খুব উত্ফুল্ল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কলকাতার কলেজজীবনের কথা হয়েছে। খানে আলম খান (একসময় ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন), কাজী গোলাম মাহবুবসহ আরো বন্ধুবান্ধবের কথা বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করেছেন। আমার নির্বিকার বাবাকে ওই দিন আমি খুব খুশি দেখেছিলাম। আম্মাকে হেসে হেসে গল্প করছেন। যেন জীবনের পরম চাওয়া পূর্ণ হয়েছে। দুই কন্যা ছাড়া ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হলেন। বাবা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ’৭৫-এর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামের তৎকালীন সরকারি উকিল (জিপি) আনোয়ারুজ্জামান সাহেবের নেতৃত্বে বাবাসহ প্রায় সব সরকারি উকিল একযোগে পদত্যাগ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সারা দেশে এটাই প্রথম সরব প্রতিবাদ। ওই দিন যাঁরা একযোগে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন তাঁরা সবাই নীতির প্রশ্নে সমস্ত ভয়ভীতি উপেক্ষা করেছিলেন। তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছিলেন। আওয়ামী লীগকে ভালোবেসেছিলেন। তাঁদের মতো লোকের কারণেই বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলেন।

আমি হাইকোর্টের বিচারপতি হই। বাবা খুশি হলেন। বিচারপতি হওয়ার পর প্রথম সপরিবারে চট্টগ্রামে যাই। মা-বাবা দুজনেই নাতিদের পেয়ে খুশি। 

বাবা মারা যান ২০০৯ সালে। মে মাসের এক সকালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেন। বুকে সামান্য ব্যথা ছিল। পরদিন সন্ধ্যায় চলে গেলেন। হতভাগ্য আমি রাতে গিয়ে পৌঁছলাম। দেখতে পাইনি। আমার বোন ডালিয়া পাশে ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। সে পরে বলেছিল, “বিকাল থেকেই বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিলেন বাবা।’ হয়তো আমার প্রতীক্ষায় ছিলেন। আমার মনে হয়েছিল ঢাকায় না থাকলে হয়তো শেষ দেখা দেখতাম।

লেখক : বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

* পূর্ণ নিবন্ধটি পড়ুন কালের কণ্ঠ অনলাইনে



সাতদিনের সেরা