kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

আটলান্টিক সনদ ও নতুন হুমকির মুখে নতুন ব্যবস্থা

অনলাইন থেকে

১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বিষয়ে রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করত। কারণ সম্পদ ও শক্তির দিক থেকে তারা সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা মিত্রদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ঠিক আগে এই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ওই বছর নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের উপকূলে একটি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এমন একটি সময়ে আটলান্টিক সনদ ঘোষণা করেছিলেন, যখন নাজি জার্মানি যুদ্ধে নিশ্চিতভাবে বিজয়ী হতে যাচ্ছিল। এর কয়েক মাস পর আমেরিকা, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আরো ২৩টি সরকার ‘জাতিসংঘ’কে সামনে রেখে মুক্ত বাণিজ্য, বিনা আগ্রাসন ও গণতন্ত্র—এই তিনটি বৈপ্লবিক নীতির ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধোত্তর বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করে।

সেই ঘটনার ৮০ বছর পর বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সম্প্রতি একটি নতুন আটলান্টিক সনদ স্বাক্ষর করেছেন, যা ভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে থাকা এক বিশ্ব পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটেছে এবং যেখানে যুক্তরাজ্য অনেক ক্ষয়প্রাপ্ত এক শক্তি। জনাব বাইডেন তাই ক্রমবর্ধমান এক বিপজ্জনক বিশ্বকে দেখতে পান। আজ বিশ্বজুড়ে যেভাবে জনতুষ্টিবাদী, জাতীয়তাবাদী ও বক্তৃৃতাবাজদের উত্থান ঘটেছে, ইউরোপীয় শক্তি বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন দেশে বিদেশি প্রভাবে গণতন্ত্রের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে—এই চিত্রটি কোনো কোনোভাবে ১৯৩০-এর দশকের পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যায়। ৬০৪ শব্দের নতুন সনদটিতে চীনের কথা কোথাও উল্লেখ নেই; কিন্তু এটা বৈশ্বিক ঋণের স্বচ্ছতা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও পশ্চিমাদের ‘উদ্ভাবনী সাফল্যের’ সুরক্ষা সম্পর্কিত নীতিগুলোর বিষয়ে একটি অঘোষিত লক্ষ্য।

চুক্তিপত্রটিতে অনেক কিছুতেই একমত হওয়ার আছে, বিশেষ করে জলবায়ু সংকট এবং টেকসই বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগিতায় গুরুত্বারোপ করার মতো বিষয়গুলো রয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় দেশ একটি বিধিবদ্ধ ‘বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ মেনে চলবে, যা আমেরিকার শক্তির জন্য হুমকি হয়ে থাকা ট্রাম্পীয় মতবাদের বিরুদ্ধে একটি গ্রহণযোগ্য তিরস্কারও বটে। তার পরও ২০২১ সালের সনদটি ১৯৪১ সালের সনদটির একটি দুর্বল অনুকরণ। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার মতো একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে এতে সাহসী কিছু নেই।

মূল সনদটির (১৯৪১) প্রজ্ঞার দিকটি হচ্ছে, এই বিষয়টি উপলব্ধি করা যে চিন্তা ও পরিকল্পনা করার কাজটি কোনো সংকটের শেষে নয়, বরং দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই করতে হয়। গত ১৫ মাস ধরে কভিড-১৯ বিশ্বের বিশাল অংশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে ‘আমি সবার আগে’—এমন একটি বিশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এটা ঘটেছে। মহামারি এরই মধ্যে বিদ্যমান বৈশ্বিক প্রবণতাগুলোকে ত্বরান্বিত ও নতুন ভূ-রাজনৈতিক যুগের সূচনা করছে। জীবাণুটির থাবা যখন দুর্বল হচ্ছে, তখন বিশ্বের দরকার হবে বিদ্যমান গভীর সংকটগুলো সমাধান করার জন্য নতুন একটি নীতিমালার। কারণ ওই সংকটগুলোই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা হ্রাস, অনুদারতাবাদের বিস্তার এবং গণতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

জনাব বাইডেন তাঁর মিশনে মিত্রদের খোঁজে বেড়াচ্ছেন এটা নিশ্চিত করতে যে বিশ্ব এখনো একটি উদার, গণতান্ত্রিক জীবনযাত্রার অনুকূলে রয়েছে। জনাব জনসন ইইউয়ের বাইরে ব্রিটেন ভূমিকা চান, যদিও লন্ডন প্রায় সব সময় ওয়াশিংটনের তালে নাচে। তার পরও ব্রেক্সিট চুক্তির উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রটোকল নিয়ে আলোচনায় জনসন অটল থাকতে না পারায় গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র লন্ডনকে তিরস্কার করেছে। ওয়াশিংটন সরাসরি জনসনকে ব্রাসেলসের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করতে এবং প্রয়োজন হলে ‘অজনপ্রিয় সমঝোতা’ গ্রহণ করতে বলেছে—যদিও এর অর্থ হচ্ছে লন্ডন সাময়িকভাবে হলেও কৃষি বিষয়ে ইইউ বিধি-বিধানের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতিকে ধীর করছে। মূলত বাইডেন মনে করেন, মিত্ররা একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করলে উন্নত ভবিষ্যৎ তৈরির কাজটি শুরু করতে পারবে না।

সব দেশের জন্যই নিজস্ব স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া ও সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার জন্য দরকার বিধি-বিধান। নতুন সনদে এমন কিছু নেই, যাতে জি৭-এর অন্য সদস্যরা বা ইইউ যুক্ত হতে পারত না। লক্ষ রাখতে হবে বিশ্ব নিজেকে শাসন করে না এবং শীর্ষ শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠন এবং অন্যদের রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুসংহত করার বেলায় নিজেদের ভূমিকা ভুলে যেতে পারে না। যদি বিশ্বের গণতন্ত্রগুলো মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে হয় অন্যরা ঢুকে পড়বে অথবা বিশ্ব ১৯৩০-এর দশকের মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দিকে ঝুঁকে পড়বে।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা