kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

শুধু কার্বন নয়, নাইট্রোজেন নিয়েও ভাবতে হবে

ড. কানন পুরকায়স্থ

১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শুধু কার্বন নয়, নাইট্রোজেন নিয়েও ভাবতে হবে

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেনের পরিমাণ শতকরা ৭৮ ভাগ, অক্সিজেন ২১ ভাগ এবং অন্যান্য গ্যাসীয় পদার্থ ১ ভাগ। বাতাসে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেশি থাকায় এই বর্ণহীন গ্যাসীয় পদার্থ আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়ায়। দুটি নাইট্রোজেন পরমাণু তিনটি বন্ধনীর মাধ্যমে যুক্ত হয়ে গঠিত হয় একটি নাইট্রোজেনের অণু। তুলনামূলকভাবে এটি স্থায়ী অণু। প্রাকৃতিকভাবে বাতাস ও মাটির মধ্যে নাইট্রোজেন বৃত্তাবদ্ধ বা আবর্তনশীল, যাকে বলা হয় নাইট্রোজেন চক্র। এই নাইট্রোজেন চক্র ক্রমাগত দূষিত হয়ে উঠছে।

পৃথিবীর সব প্রাণী নাইট্রোজেনের ওপর নির্ভরশীল। প্রোটিন থেকে ডিএনএ—সর্বত্র নাইট্রোজেন মৌলের ছড়াছড়ি। কিন্তু বাতাসে যে নাইট্রোজেন বিদ্যমান তাকে ক্রিয়াশীল করে ব্যাকটেরিয়া। ব্যাকটেরিয়া বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাইট্রোজেন অণুকে ভেঙে তৈরি করে নাইট্রোজেন পরমাণু। এর সঙ্গে হাইড্রোজেন পরমাণুযুক্ত করে প্রকৃতিতে তৈরি হয় অ্যামোনিয়া, যেখানে থাকে নাইট্রোজেনের একটি পরমাণু ও হাইড্রোজেনের তিনটি পরমাণু। প্রাকৃতিক এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নাইট্রোজেন সংবন্ধন (Nitrogen fixation)| কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে, যারা এই অ্যামোনিয়াকে আবার ভেঙে নাইট্রেট আয়ন তৈরি করে, যা উদ্ভিদ শোষণ করে। আর একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা নাইট্রোজেন সংবন্ধনে ক্রিয়াশীল, তা হলো বজ্রপাত (lightning)| তা ছাড়া নাইট্রোজেন চক্রের আরেকটি স্বরূপ আমরা লক্ষ করি মৃত উদ্ভিদ বা প্রাণীর মধ্যে। সেখানে ব্যাকটেরিয়া নাইট্রোজেন ঘটিত যৌগ ভেঙে নাইট্রোজেন গ্যাস তৈরি করে এবং বায়ুমণ্ডলে তা ফিরিয়ে দেয়। প্রাকৃতিকভাবে বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেনের ভারসাম্যতা এভাবেই রক্ষা পায়।

নাইট্রোজেনের দূষণ সমস্যার শুরু কিন্তু ঊনবিংশ শতকে জার্মান বিজ্ঞানী হেবার ও বসের সময় থেকে। হেবার ও বস সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে তৈরি করেন অ্যামোনিয়া। এভাবেই তৈরি হয় কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য সার। এই সার ব্যবহার করে যেখানে মাটির উৎপাদনক্ষমতা কম, সেখানে অধিক খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্য জায়গায়। প্রাকৃতিকভাবে ও কৃত্রিম উপায়ে পরিবেশে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন টন নাইট্রোজেন সংবন্ধন করা যায়। অন্যদিকে বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন নানা প্রক্রিয়া অপসারিত হয় আনুমানিক ৪১৩ বিলিয়ন টন। সুতরাং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের ফলে অধিক মাত্রায় নাইট্রোজেন বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারিত হয়। এর ফলে প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রোজেনের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে না।

এই অতিরিক্ত নাইট্রোজেন যেভাবে পরিবেশকে ধ্বংস করছে তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক—প্রথমত, বৃষ্টির মাধ্যমে মাটিতে বিদ্যমান নাইট্রেট পানিবাহিত হয়ে সাগরে চলে যায়। এর ফলে পানিতে শৈবালের বৃদ্ধি ও অক্সিজেন শোষণের কারণে অন্যান্য জলজ প্রাণী অক্সিজেন স্বল্পতায় ধ্বংস হয়। সাগরের এ ধরনের অঞ্চলকে বলা হয় মৃত অঞ্চল (dead zone)। দ্বিতীয়ত, যানবাহন ও বিভিন্ন শিল্প-কারখানা থেকে নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গত হয়, যা বায়ুকে দূষিত করে। এটি স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। তৃতীয়ত, নাইট্রেট অতিমাত্রায় মাটিতে থাকলে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম মাটি থেকে শোষিত হয়ে মাটির অম্লতা বেড়ে যায়। এ অবস্থায় গাছপালা ঠিকভাবে পুষ্টিকর পদার্থ মাটি থেকে শোষণ করতে পারে না। চতুর্থত, মাটিতে অতিমাত্রায় নাইট্রেট থাকলে ব্যাকটেরিয়া এই নাইট্রেটকে নাইট্রাস অক্সাইডে রূপান্তরিত করে। এই নাইট্রাস অক্সাইড একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। গ্রিনহাউস গ্যাস ওজোন স্তরকে ধ্বংস করতে পারে। ওজোন স্তর অতিবেগুনি রশ্মির হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। বস্তুত কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় নাইট্রাস অক্সাইড প্রায় ৩০০ গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। পঞ্চমত, মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেড়ে গেলে বাতাসে অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে বাতাস ক্ষারধর্মী হয়। মাটিতে উদ্ভিজ্জ পদার্থ কার্বন ডাই-অক্সাইডকে ধারণ করে রাখে। বাতাসে কিছুটা অম্লতা থাকলে মাটিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের সংরক্ষণ ভালো হয়, অন্যথায় মাটিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড সংরক্ষণের ক্ষমতা কমে যায়।

আইপিসিসি বৈশ্বিক উষ্ণতাকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ কমানোর জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কিন্তু নাইট্রোজেন দূষণ অন্যতম বিষয়। তাই ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সভায় সর্বসম্মতভাবে মত প্রকাশ করা হয় যে ‘If we don’t deal with nitrogen, then dealing with any other environmental challenges gets a lot harder.’ মাটিতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করলে নাইট্রোজেন দূষণ কমানো যাবে না। আর এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ না করলে বৈশ্বিক উষ্ণতার ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়।

সাম্প্রতিককালে এক ধরনের নাইট্রোজেন সার তৈরি করা হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট্রোজেনকে মাটির মধ্যে অবমুক্ত করে। এভাবে নাইট্রোজেন মাটিতে সরবরাহ করলে নাইট্রোজেন সারের অপচয় কম হয়। সমস্যা হচ্ছে এই সারের দাম অনেক বেশি, তাই কৃষকদের কাছে সহজলভ্য নয়। ইউরিয়া নাইট্রোজেন সার হিসেবে বহুল ব্যবহৃত; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই সার অ্যামোনিয়ায় রূপান্তরিত হয় এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। আন্তর্জাতিক সার উন্নয়ন কেন্দ্র (আইএফডিসি) জানিয়েছে যে ইউরিয়া ব্যবহারের পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেনের অবমুক্তি কমানো যেতে পারে। আইএফডিসি জানিয়েছে, ‘the single most important thing that can enhance nutrient efficiency is controlling nitrogen.’ আরেকটি পদ্ধতি—যেখানে প্রযুক্তি সহজলভ্য, সেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে precision farming. এই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুযায়ী ড্রোন বা রিমোট সেন্সর ব্যবহার করে চিহ্নিত করা হয় কোথায় নাইট্রোজেন সারের প্রয়োজন এবং সে অনুযায়ী নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করা হয়। আরেকটি প্রস্তাব হলো—হেবার ও বস যে প্রক্রিয়ায় বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করেছিলেন সেই প্রক্রিয়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা।

নাইট্রোজেন দূষণ রোধকল্পে জেনেটিক প্রকৌশলের কথা ভাবা হচ্ছে। নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়া নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদের সঙ্গে মিথোজীবী সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই ব্যাকটেরিয়াকে জেনেটিক প্রকৌশলের মাধ্যমে পরিবর্তন করে দেখা যায়, ওই একই ব্যাকটেরিয়া অন্যান্য উদ্ভিদের সঙ্গেও মিথোজীবী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় বেশি শস্য উৎপাদন সম্ভব বলে জানা যায়।

প্রতিবছর গড়ে ৫১ বিলিয়ন টন গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হয়। তন্মধ্যে শতকরা ১৯ ভাগ আসে কৃষিক্ষেত্র ও ভূমি ব্যবহার থেকে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে বলা যায়, কোনো শস্যের চাহিদা অনুযায়ী নাইট্রোজেন সরবরাহ যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে নাইট্রোজেনের অপচয় রোধ করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন নাইট্রোজেন পর্যবেক্ষণ করার যন্ত্র এবং তার ভিত্তিতে চাহিদা অনুযায়ী নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার না করে নাইট্রোজেন অপচয় রোধ করা দরকার। বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেনের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য এটি জরুরি। আপাতত লক্ষ্য হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে নাইট্রোজেনের অপচয় বর্তমানের চেয়ে অর্ধেক কমিয়ে আনা। নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারে।

লেখক : যুক্তরাজ্যে কর্মরত বিজ্ঞান ও  পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা

 



সাতদিনের সেরা