kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

কালান্তরের কড়চা

বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে হাজার বছরের বাস্তবতাই হচ্ছে ভিত্তি

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

১৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে হাজার বছরের বাস্তবতাই হচ্ছে ভিত্তি

ইতিহাস একটি বহতা নদীর মতো। যুগে যুগে নদীর মতোই সে বাঁক নেয়। কখনো তাতে নদীর মতোই ভাঙন ধরে। তাতে আবার কখনো নদীর মতো পলি পড়ে এবং নতুন ভূখণ্ড গড়ে ওঠে। সম্প্রতি ঢাকায় ছয় দফা নিয়ে আলোচনায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেছেন, ‘জাতি একটি আবেগী ধারণা, রাষ্ট্র হচ্ছে কঠিন বাস্তব। ছয় দফায় জাতি হিসেবে আমাদের আবেগ-অনুভূতির সূচনা হয়েছিল, ভাষা আন্দোলন থেকে পরবর্তী সময়ে ছয় দফা একটি কংক্রিট ধারণা বাংলাদেশ রাষ্ট্র কেমন হতে পারে।’ শান্তনু মজুমদার সঠিক কথাই বলেছেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার একটু মতভেদ আছে। জাতি কখনো আবেগ দিয়ে তৈরি হয় না। জাতি গঠনের জন্য নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা কাজ করে। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের মূলে এই বাস্তবতা ছিল না। ধর্মীয় জাতীয়তা সম্পর্কে অবাস্তব আবেগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানি ধনী গোষ্ঠীর স্বার্থবুদ্ধি থেকে পাকিস্তানের জন্ম। পাকিস্তান তাই ২৫ বছরও টেকেনি। কিন্তু বাঙালি জাতিসত্তা একটি হাজার বছরের বাস্তবতা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সে একটি রাষ্ট্র হতে চেয়েছে। পাল রাজাদের আমলেও বাংলা একটি রাষ্ট্র ছিল। হোসেন শাহী আমলেও আলাদা সুবেবাংলার অস্তিত্ব ছিল। বারো ভূঁইয়াদের আমলে বাংলার স্বাধীনতার জন্য ঈশা খাঁ ও প্রতাপাদিত্য যুদ্ধ করেছিলেন। মোগল আমলে আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বারবার আক্রমণ করেও সুবেবাংলা দখল করতে পারেননি। তাঁকে ঈশা খাঁর সঙ্গে সন্ধি করতে হয়েছিল। প্রতাপাদিত্য বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। নবাব আলীবর্দী দিল্লিকে কর দেওয়া বন্ধ করে সুবেবাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সিরাজউদ্দৌলা এই বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন।

ইংরেজরা বাংলাদেশ দখল করেও তার অস্তিত্ব ভারতের সঙ্গে একেবারে মিশিয়ে ফেলতে পারেনি। বাংলাদেশের সীমান্ত তখন ছিল ব্রহ্মদেশ (মিয়ানমার) পর্যন্ত। বাংলাদেশের সরকারকে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট আলাদা স্ট্যাটাস দিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে চিফ মিনিস্টার বলা হতো না। বলা হতো প্রাইম মিনিস্টার। মনে হতো ভারত স্বাধীন হলে বাঙালিরাই সেই রাষ্ট্রে কর্তৃত্ব পাবে। সেই ভয়ে উত্তর ভারতের হিন্দু ও মুসলমান উভয় নেতারাই বাংলাদেশের নেতৃত্বকে ধ্বংস করতে চাইতেন। গান্ধী কখনো নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ প্রমুখের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেননি। তাঁদের ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন। ফলে দেশবন্ধু নিজস্ব স্বরাজ্য পার্টি এবং সুভাষচন্দ্র ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। উত্তর ভারতের মুসলমান নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও বাংলাদেশের ফজলুল হক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন। ফজলুল হকের নেতৃত্ব মুসলিম লীগ ভিত্তিক ছিল না। ছিল তাঁর নিজস্ব কৃষক প্রজা পার্টি ভিত্তিক। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের সময় বাংলাদেশের সচেতন নেতারা পাকিস্তানে যোগ দিতে চাননি। তাঁরা পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম মিলিয়ে একটি স্বাধীন অখণ্ড বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। গান্ধী ও জিন্নাহ নেতৃত্বের ষড়যন্ত্রে তা ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশকে ভাগ করে পশ্চিম অংশকে ভারতের হাতে এবং পূর্ব অংশকে পাকিস্তানের হাতে দেওয়া হয়। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তখন বাঙালি মুসলমানের নেতা। তাঁকেও চক্রান্ত করে ওই নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে সেখানে খাজা নাজিমুদ্দীনের মতো এক উর্দুভাষী নেতাকে বসিয়ে দেওয়া হয়।

এই কৃত্রিম দেশভাগ টেকেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছরের ভেতর পূর্ব বাংলার বাঙালি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠে এবং নিজেদের দাবি আদায়ে সোচ্চার হয়। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ছিলেন পণ্ডিত নেহরুর বন্ধু। তিনি ছিলেন ভারতের শেষ বড়লাট। তিনি নেহরুকে এক চিঠিতে জানান, ‘আপনি দেশভাগ হওয়ার জন্য দুঃখ করবেন না। পাকিস্তান ২৫ বছরও টেকে কি না আমার সন্দেহ আছে।’ পাকিস্তান সত্যিই ২৫ বছরও টেকেনি। বাঙালিরা তাদের জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। বাঙালির হাজার বছরের জাতীয়তাবোধ, যা তার অসাম্প্রদায়িক ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত হয়েছিল তা ছিল বাস্তবতা, কোনো আবেগ নয়। আবেগ ছিল ধর্মীয় জাতীয়তার ভিত্তিতে পাকিস্তানে যোগদান। সেই আবেগ কেটে যেতেই বাঙালি তার জাতিসত্তা ফিরে পেয়েছে। তা নতুন কিছু নয়। হাজার বছর ধরে চর্যাপদ থেকে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ থেকে শামসুর রাহমান পর্যন্ত প্রবাহিত সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক জাতীয়তা কোনো আবেগের বিষয় ছিল না। ছিল বাস্তব জাতীয়তাবোধ। সেই বোধ থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। পশ্চিম অংশ ভারতে রয়ে গেছে। কিন্তু তারাও দিল্লির আধিপত্য মেনে নেয়নি। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসি শাসন প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যে সুভাষ বসুর ভ্রাতা শরৎ বসু নির্বাচনে কংগ্রেসকে হারিয়ে দেন। একই সময় পূর্ব পাকিস্তানের টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক মুসলিম লীগের প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন। দুই বাংলাতেই একটা মিলনের সুর বাজছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা তাতে ভীত হয়। তারা দুই বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। বলা চলে একটি বার্লিন ওয়াল তৈরি করে।

কিন্তু এই ওয়াল টেকেনি। তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িকতার আওয়াজ তোলেন। আওয়ামী লীগের আগে তারা নাম থেকে মুসলিম শব্দটিও বাদ দেয়। আওয়ামী লীগও মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয় এবং ভাষা ও ভৌগোলিক জাতীয়তার ভিত্তিতে বাঙালির অধিকার দাবি করেন। এই দাবি কোনো আবেগপ্রসূত ছিল না। ছিল বাস্তবতার ভিত্তিতে তোলা। লক্ষণীয় বিষয়, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার বাঙালি স্বাধীনতা লাভ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও দিল্লির শাসনের অবসান হয়। দিল্লির অনুগত সিপিআই (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া) পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঠাঁই পায়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে সিপিএম (মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টি) অন্যান্য বাম দলের সহযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গের সরকার গঠন করে এবং দিল্লিকে অগ্রাহ্য করে ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গে শাসন চালায়। বামফ্রন্টের পর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবারের নির্বাচনেও তাঁকে ক্ষমতা থেকে হটানোর জন্য দিল্লির মোদি সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। পারেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিপুল ভোটে ক্ষমতায় এসেছেন জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে। এই জয় বাংলা স্লোগান বাংলাদেশের এবং শেখ মুজিবের। বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গেও বাঙালি জাতীয়তাবাদ ক্রমেই মাথা তুলছে। দিল্লির শাসন তারা বরদাশত করতে চায় না। ভৌগোলিকভাবে ভিন্ন থাকলেও বাঙালি জাতীয়তা এতই বাস্তব যে যা ধীরে ধীরে হলেও সব বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করছে। সারা পৃথিবীতে যত বাঙালি আছে তারা সবাই মিলে একটি সাংস্কৃতিক বাঙালি জাতি গঠনের দিকে চলেছে। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে তারা ভাগ হতে পারে; কিন্তু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবোধ অখণ্ড।

তথাকথিত পাকিস্তানি জাতীয়তা ও ভারতীয় জাতীয়তার আবেগ ক্রমেই দূর হচ্ছে এবং বাঙালির মনে তার আসল জাতীয়তার বাস্তবতা প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র কেমন হতে পারে ভাষা আন্দোলন তা নির্ধারণ করেনি। ভাষা আন্দোলন সব বাঙালির মনে তাদের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবোধকে জাগিয়ে দিয়েছিল। যার ফলে তা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামসহ সারা বিশ্বের বাঙালিকে আন্দোলিত করছে, প্রণোদিত করেছে। এর একটা ঐতিহাসিক বাস্তবতাও আছে। অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার তা লক্ষ করেছেন কি না জানি না। ভারত বিভাগের সময় বাঙালির আলাদা জাতিরাষ্ট্র গঠনের দাবি উঠেছিল। এই দাবিটি তৈরি করেছিলেন তখনকার মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি আবুল হাশেম এবং পশ্চিমবঙ্গের নেতা শরত্চন্দ্র বসু। এটাকে বলা হয় বসু-হাশেম পরিকল্পনা। আবুল হাশেম ছিলেন মুসলিম লীগের অসাম্প্রদায়িক নেতা, যাঁর তরুণ শিষ্য শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের প্রগতিশীল নেতা ছিলেন শরত্চন্দ্র বসু। তাঁরা দুজনে মিলে স্বাধীন যুক্ত বাংলা গঠনের পরিকল্পনা করেন। সোহরাওয়ার্দী তখন অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী। তিনিও এই পরিকল্পনায় যোগ দেন। কিন্তু লীগ এবং কংগ্রেস দুই দলেরই ডানপন্থীরা এই পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। তারা তা পারত না যদি শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই পরিকল্পনা থেকে বিচ্ছিন্ন না হতেন। লাহোর প্রস্তাবে ছিল ভারতের দুই প্রান্তে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো (ঝঃধঃবং) গঠিত হবে। জিন্নাহ সুকৌশলে দিল্লিতে লীগের এক কনভেনশন ডেকে এই ঝঃধঃবং শব্দ থেকে ঝ অক্ষরটি বাদ দেন। অর্থাৎ পাকিস্তানে ইউনিটারি বা এককেন্দ্রিক সরকার হবে। জিন্নাহ এভাবে পাকিস্তান ভাঙার বীজ নিজের হাতেই পুঁতেছিলেন। আবুল হাশেম তাঁর কাজের প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, কনভেনশন ডেকে কাউন্সিলে গৃহীত কোনো প্রস্তাব বদল করা যায় না। সোহরাওয়ার্দী আবুল হাশেমের প্রতিবাদে যোগ দেননি। তিনি জিন্নাহর কাছে মাথা নত করেছিলেন। ফলে যুক্তবাংলা গঠনের পরিকল্পনাটি নস্যাৎ হয়ে যায়।

শেখ মুজিব ছিলেন রাজনীতিতে আবুল হাশেমের শিষ্য। ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী। তিনি সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও গণতান্ত্রিক মনোভাবকে শ্রদ্ধা করতেন কিন্তু তাঁর মনে রাজনীতির বীজ বুনেছিল বসু-হাশেম পরিকল্পনা। কলকাতা থেকে ঢাকা আসার পরও শেখ মুজিব যে বিরোধী সংগঠনটি গড়ে তোলেন তার নাম দিয়েছিলেন গণতান্ত্রিক কর্মী শিবির। এই প্রতিষ্ঠানে হিন্দু-মুসলমান সবাই যোগ দিতে পারত। ১৯৪৯ সালে ঢাকার রোজ গার্ডেনে বিরোধী দল গঠনের জন্য যে সভা হয় তাতে দলের নাম অসাম্প্রদায়িক রাখার জন্য শেখ মুজিব প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু মওলানা ভাসানী বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি জনগণের মুসলিম লীগ গঠন করতে চাই। খাজা-গজাদের হাত থেকে মুসলিম লীগকে উদ্ধার করতে চাই। মুসলিম লীগ আমাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান। তাকে কবর দিব কেন?’ সবাই মওলানা ভাসানীর যুক্তি মেনে নেন। নতুন বিরোধী দলের নাম করা হয় পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। এই বিরোধী দল গঠনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কোনো ভূমিকা নেই। তিনি লাহোরে বসে পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে গঠন করেছিলেন জিন্নাহ মুসলিম লীগ। জিন্নাহ তখন মারা গেছেন। শেখ মুজিব লাহোরে গিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। শহীদ সোহরাওয়ার্দী জিন্নাহ মুসলিম লীগ ভেঙে দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং আওয়ামী লীগের নিখিল পাকিস্তান কমিটির আহ্বায়ক হন।

শেখ মুজিব ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী। কিন্তু তাঁর রাজনীতির নয়। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্মতি দিতে চাননি। শেখ মুজিব করাচিতে গিয়ে তাঁকে বুঝিয়েসুজিয়ে এই সম্মতি আদায় করেন। ১৯৫৫ সালে যখন দেশে যুক্ত নির্বাচনের দাবি ওঠে, তাতেও সোহরাওয়ার্দী রাজি ছিলেন না। মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবের চাপে তিনি শেষ পর্যন্ত তাতে রাজি হন। আওয়ামী নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়ার ব্যাপারেও শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঘোর আপত্তি জানিয়েছিলেন। শেখ মুজিব তাঁকে দলটি অসাম্প্রদায়িক করার ব্যাপারে রাজি করান। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের মধ্যে পঞ্চশীলা চুক্তি সম্পাদনের প্রধান কারিগর ছিলেন শেখ মুজিব। চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই যখন ঢাকা সফরে আসেন তখন তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়ার ব্যাপারে বামপন্থীদের সঙ্গে একযোগে কাজ করেন শেখ মুজিব। কেউ বলেন, ইতিহাস নেতা তৈরি করে, আবার নেতাও ইতিহাস তৈরি করে—এটাই হচ্ছে ইতিহাসের বাস্তবতা। আবেগ ও কল্পনা থেকে যা আসে তা স্থায়ী হয় না, কোনো ভৌগোলিক রূপ নিতে পারে না। বর্তমান বাংলাদেশ বাঙালির আবহমান অসাম্প্রদায়িক জাতি চেতনা থেকে উদ্ভূত। কোনো আবেগ থেকে নয়। আবেগ যেখানে কাজ করে, সেখানে রাষ্ট্র কিংবা ইতিহাস তৈরি হয় না। হলেও তা স্থায়ী হতে পারে না। অধ্যাপক শান্তনু মজুমদারের কথাগুলো নিয়ে এই আলাদা মত প্রকাশ করলাম বলে তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

লন্ডন, সোমবার, ১৪ জুন ২০২১