kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

আফগানিস্তানকে যেন ছেড়ে যাওয়া না হয়

অনলাইন থেকে

১৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তালেবানদের পক্ষ থেকে গত ঈদুল ফিতরে তিন দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণাটি ছিল আফগানদের জন্য এক বিরল ও সংক্ষিপ্ত অবকাশ। এর আগে সপ্তাহে কাবুলের একটি স্কুলে ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলায় কমপক্ষে ৮৫ জনের মৃত্যু হয়। এলাকাটি প্রধানত শিয়া হাজারা সংখ্যালঘুদের বসবাস, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলার কারণে বারবার প্রাণ হারিয়েছে। চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সব সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা করার পর এই হামলা আফগানদের সামনের দিনগুলোতে কী রয়েছে তারই এক ভয়াবহ ইঙ্গিত।

গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, ‘এখন চিরস্থায়ী যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে।’ ফলে আমেরিকানরা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যেতে পারে; কিন্তু আফগানরা তো সেটা করতে পারে না। তারা শুধু গত দুই দশক নয়, চার দশক ধরেই সংঘাতের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে। তাদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী কখনো জানতেই পারেনি শান্তি কী জিনিস। দেশটিতে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা এরই মধ্যে ২০১৯ সালের মাত্রায় ফিরে গেছে। বিশ্লেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র চলে যাওয়ার পর তালেবান ও ইসলামিক স্টেট উভয়ের সঙ্গে আফগান জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লড়াইয়ের কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যারা গত এক দশকে অপরিসীম ব্যক্তিগত মূল্য দিয়েও দেশ ছেড়ে যেতে চায়নি, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, তালেবানদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তাদের শাসনের কারণে সেখানে থাকতে পারবে না। বড় ভয় হলো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পর দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং তা মানুষের জীবন, বাড়িঘর ও পরিবারগুলো ধ্বংস এবং তালেবানদের জন্ম দিতে সহায়তা করেছিল। ফলে সামনের দিনগুলোতেও আফগানিস্তানের অস্থিশীলতায় নতুন ঢেউ আসতে পারে।

যদিও শেষ পর্যন্ত আমেরিকা স্বীকার করেছে যে তারা আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না, তবু তাদের এমন ভান করা উচিত নয় যে এর অধিবাসীদের সঙ্গে যা ঘটবে তার জন্য তাদের কোনো দায়িত্ব থাকবে না। শান্তি, নিরাপত্তা ও অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা পাওয়ার জন্য দেশটির জনগণ দীর্ঘদিন ধরে উন্মুখ হয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য আফগানিস্তান আক্রমণকে ন্যায়সংগত করার জন্য তখন নারী অধিকারের ডাক দিয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আহ্বানটি যদি স্বার্থপর (সিনিক্যাল) হয়, তাহলে এখন সেই আফগান নারীদের পরিত্যাগ করা হবে আরো অনেক বেশি কিছু। কারণ এটি এমন একটি দেশ, যেখানে ৩০ শতাংশেরও কম নারী পড়তে পারে। তাদের মেয়েরা ও পরিবারগুলো শিক্ষা লাভের জন্য অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করে।

বাইডেন প্রশাসন এবং তার মিত্রদের অবশ্যই মানবাধিকার ও স্কুল হামলার মতো নৃশংসতার ঘটনায় যথাযথ জবাবদিহির জন্য চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। এই ঘটনায় জাতিসংঘের তদন্তের জন্য আফগান স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের আহ্বানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করতে হবে। দেশটি যে-ই শাসন করুক, নাগরিকদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোতে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন হবে। এখন যে উদ্বেগটা কাজ করছে, সেটা হলো শুধু তহবিলদাতারা ক্রমবর্ধমানভাবে কৃপণতাই প্রদর্শন করছেন না, তাঁরা বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয়টিও এড়িয়ে যেতে পারেন। এখন উপায় হলো, পশ্চিমরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে চলে যেতে পারে; কিন্তু অবশ্যই আফগান জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত নয়।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ