kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

প্রস্তাবিত বাজেটে যুব ও ক্রীড়ায় বরাদ্দ প্রসঙ্গ

ইকরামউজ্জমান   

১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রস্তাবিত বাজেটে যুব ও ক্রীড়ায় বরাদ্দ প্রসঙ্গ

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছরে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ৩ জুন জাতীয় সংসদে। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এবারের বাজেট পুরোটাই ব্যবসাবান্ধব। ব্যবসাবান্ধব বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ীরা খুশি। সিভিল সোসাইটি, ব্যবসায়ী, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা এবং অন্যরা এখন তাঁদের মূল্যায়ন এবং বক্তব্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তুলে ধরছেন।

২০২১-২২ অর্থবছরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় কমে গেছে। এই মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে অনুমিতির ওপর ভর করে। বাজেটে ক্রীড়াঙ্গনের স্বার্থের দিকে যতটুকু নজর দেওয়া উচিত ছিল তা দেওয়া হয়নি। নীতিনির্ধারকদের ত্রুটিপূর্ণ চিন্তা ও সচেতনতার অভাব ফুটে উঠেছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তো কর্মসংস্থান তৈরি করে, সেখানে বাজেট কমেছে। এদিকে বাজেটে তো জীবন-জীবিকার কথা জোর দিয়েই বলা হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে কি ক্রীড়া বাজেট বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সময়মতো আলোচনা হয়েছে?

ক্রীড়াঙ্গন ও ক্রীড়াচর্চা একটি রাষ্ট্রের জীবনে প্রয়োজনীয় বৃত্তাংশ। জাতীয় উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অত্যধিক। ক্রীড়ানীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘টেকসই’ উন্নয়ন। বাংলাদেশ যেহেতু এনডিসি থেকে বেরিয়ে আসছে, এখন আর ক্রীড়াকে দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাইডলাইনে রাখার সুযোগ নেই। এখন থেকে লক্ষ্য হওয়া উচিত উন্নয়নের জন্য খেলাধুলাকে কাজে লাগানো। খেলাধুলার পেছনে বিনিয়োগ মানেই একটি দেশের যুব ও তরুণসমাজকে স্বাস্থ্যকর, সুখী আর উৎপাদনশীল করে তোলা। আর তাই এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বেশি লাভজনক।

সংসদে বাজেট পেশ হওয়ার পর প্রতিটি সেক্টর থেকে সংশ্লিষ্ট মহল ও বাইরে থেকে বিজ্ঞজনরা তাঁদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ব্যতিক্রম ক্রীড়াক্ষেত্র। এখানে গাছাড়া ভাব। এটি দুঃখ ও হতাশাজনক। যেসব ক্রীড়া সংগঠক বছরের পর বছর ধরে ক্রীড়াঙ্গনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বিভিন্ন সংগঠন তৈরি করে ক্রীড়াঙ্গনের সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন—তাঁদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তাঁরা ব্যস্ত ক্রীড়াঙ্গনে অন্য কাজে। তাঁরা অবশ্য প্রাক-বাজেট আলোচনায়ও সম্মিলিতভাবে ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবির প্রশ্নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোনো বৈঠক বা আলোচনা করেননি। তাঁরা ধরে নিয়েছেন, মন্ত্রণালয় তাঁদের কাজ করে দেবে। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণপর্ব পরিচালনা, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে অংশগ্রহণের আগে হাতে সময় নিয়ে প্রশিক্ষণ শিবিরের ব্যবস্থা, ক্রীড়া অন্বেষণ কর্মসূচি পরিচালনা, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বিভিন্ন খেলায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি এবং এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধিক অর্থ বরাদ্দের অনুরোধ করার প্রয়োজন ছিল। ফুটবল ফেডারেশন অবশ্য ফুটবলের উন্নতির জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এ ক্ষেত্রে আর সাড়া মেলেনি।

২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেটে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে মোট এক হাজার ১২১ কোটি ৬০ লাখ টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে উন্নয়ন খাতে ২৭৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং পরিচালনা খাতে ৮৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেট উন্নয়ন খাতের পরিমাণ ছিল ২২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং পরিচালনা খাতের পরিমাণ ছিল ৮৯৭ কোটি ৫০ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত বাজেটের পরিমাণ ছিল এক হাজার ১২৭ কোটি ২৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ক্রীড়াঙ্গনের বাজেটে সব সময় অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে বেশির ভাগ অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে। এর অবশ্যই প্রয়োজন আছে। তবে ক্রীড়াঙ্গনে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে চিহ্নিত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশ করার দুই দিন পর একটি টেলিভিশনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল বলেছেন, বাজেট যেহেতু কমে গেছে, এখন থেকে ১০-১২টি সম্ভাবনাময় খেলা নিয়ে কাজ করতে চাইছি। এ খেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ক্রীড়াঙ্গনে অগ্রাধিকার নির্ণয়ের বিষয়টি নিয়ে গত তিন যুগ থেকে প্রচুর হাতুড়ি ঠোকা হয়েছে। লাভ হয়নি। রাজনৈতিক কারণে ক্রীড়াঙ্গনে সবাইকে খুশি রেখে চলা অব্যাহত থেকে গেছে। এটি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। কখনো বলা হয়নি যে খেলাগুলো পারফরম করতে পারছে না সেই খেলাগুলো বাদ দেওয়া বা এগুলোকে সাহায্য ও সহযোগিতা না করার কথা। সব খেলার চর্চা চলবে। বিশেষজ্ঞরা সম্ভাবনাময়ী খেলার তালিকা এ, বি ও সি ঠিক করবেন। আর এ খেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই তালিকাও চিরস্থায়ী নয়, পরিবর্তনশীল। নির্দিষ্ট সময়ের পর বিশেষজ্ঞ কমিটি পর্যালোচনার মাধ্যমে তাদের মতামত জানাবে। সমস্যা হলো ক্রীড়াঙ্গনে তথ্য-উপাত্তে ঘাটতি আছে। শুধু নীতি সংস্কারের মাধ্যমে ক্রীড়াঙ্গন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না—প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের। দীর্ঘ সময় ধরে ক্রীড়াঙ্গন অনুসরণের পর্যবেক্ষণ হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামষ্টিক উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ এখানে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। গোটা ক্রীড়াঙ্গনের চিন্তা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক নয়। কেন খেলাধুলা করছি এটা বোঝার ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে। পার্থক্য আছে অনুসরণ করার ক্ষেত্রে।

ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট, সেখানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ হয়েছে এক হাজার ১২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। দেশের বাজেটের কত শতাংশ? ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাথাপিছু কত পড়েছে? ক্রীড়াঙ্গন থেকে বলা হয়, চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এর জন্য তো প্রয়োজন অর্থের। সেই অর্থ তো সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আছে টানা প্রায় সাড়ে ১২ বছর। ক্রীড়ানুরাগী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভেবেছেন। এর গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন। তাঁর সরকারের তরফ থেকে সব সময় পৃষ্ঠপোষকতা, সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন। সব সময় ক্রীড়াঙ্গনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ক্রীড়া ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সাফল্য নিশ্চিত হয়েছে তাঁর সরকারের দেশ পরিচালনার সময়। ‘নবম বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমস ২০২০’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার দেশের বিভিন্ন খেলায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে, যাতে আগামী দিনে ক্রীড়াবিদরা বিশ্ব অলিম্পিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর্যায়ে নিজেদের গড়ে তুলতে পারেন। তিনি আরো বলেছেন, একটি জাতিকে উন্নত করতে হলে খেলাধুলাসহ সর্বক্ষেত্রে উন্নতি করা প্রয়োজন। এ জন্য খেলাধুলাটা আমাদের শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুব, তরুণ—সবার জন্য একান্ত অপরিহার্য। দেশের সরকারপ্রধান যেখানে ক্রীড়াঙ্গনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন, সেখানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট কমে যাওয়াটা কি অসংগতি নয়?

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক