kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

টেকসই ও নৈতিক শিল্পায়নে তৈরি পোশাক খাত

ফারুক হাসান

১২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টেকসই ও নৈতিক শিল্পায়নে তৈরি পোশাক খাত

একটি শিল্পের শূন্য থেকে শীর্ষে এগিয়ে চলার পথে অনেক গল্প অজানা থেকে যায়, পোশাক খাত ঠিক তেমনই একটি শিল্প। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে শিল্পটির ভূমিকা অনবদ্য।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে কয়েকজন সাহসী উদ্যোক্তার হাত ধরে এগিয়ে চলা এই শিল্প আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তৈরি পোশাক শিল্প বদলে দিয়েছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা। পিছিয়ে পড়া নারীদের দিয়েছে সামাজিক মর্যাদা ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ। রপ্তানি আয় আর জিডিপিতে অবদান রেখে বিগত চার দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে যে নীরব বিপ্লব ঘটেছে তার পেছনে এই শিল্প খাতটির অবদান অনস্বীকার্য।

গৌরবান্বিত এই পথচলায় অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে পোশাকশিল্পের আজকের এই অবস্থানে আসতে হয়েছে। কোনো প্রকার দেশি কাঁচামাল ছাড়া শুধু উদ্যোক্তাদের মেধা ও সাহস এবং লাখো শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে বিশ্বে আমরা আজ দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পেরেছি।

তবে ৪০ বছরে শিল্পের যে সংগ্রাম, ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ, পরিবর্তনের মানসিকতা, প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন—এ সব কিছুর মাধ্যমে টেকসই শিল্প নির্মাণে তৈরি হয়েছে একটি শক্ত ভিত, যার ওপর ভর করে আমরা আজ অনন্য এক গৌরবের অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছি।

১৯৯৫ সালে সফলভাবে শিশুশ্রম নির্মূল থেকে শুরু করে সোশ্যাল কমপ্লায়েন্সের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের পদক্ষেপ এবং রানা প্লাজা-পরবর্তী নিরাপদ কর্মপরিবেশ স্থাপন এবং শ্রমমান উন্নয়নে যে অগ্রগতি হয়েছে তা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত ও অনুকরণীয়। শুধু শিশুশ্রম নির্মূলই নয়; বরং বাংলাদেশ সরকার, আইএলও এবং বিভিন্ন এনজিওর সহায়তায় শিশুশ্রমিকদের ‘Earn and Learn’ স্কিমের আওতায় পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তী সময়ে পোশাকশিল্পে দেশের প্রচলিত শ্রমনীতি, ক্রেতাদের কোড অব কন্ডাক্টসহ কমপ্লায়েন্সের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

২০১২-পরবর্তী সময়কাল ছিল শিল্প খাতটির জন্য চ্যালেঞ্জিং একটা সময়। তাজরীন অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়ে আমূল পরিবর্তন এসেছে। কারখানায় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে এবং কারখানার কাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স ও ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভের আওতায় প্রায় চার হাজার কারখানা পরিদর্শন করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম নিশ্চিত করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গৃহীত এসব কার্যক্রমের সফলতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে সব অংশীজনকে (সরকার, উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতা) নিয়ে গঠিত হয়েছে আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল (RSC)।

২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুবার শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে এবং ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। কারখানায় সেফটি কমিটি এবং নির্বাচিত পার্টিসিপেশন কমিটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শ্রমিকের কল্যাণের জন্য কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন করা হয়েছে, যেখানে পোশাক রপ্তানি আয়ের ০.০৩ শতাংশ সরাসরি প্রদান করা হয়, যার পরিমাণ বার্ষিক প্রায় ৮০ কোটি টাকা। পাশাপাশি কলকারখানা অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি; বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, আইএলও-আইটিসির সহযোগিতায় Effective Workplace Co-operation এবং Essentials of Occupational Safety and Health শীর্ষক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হয়েছে।

আমাদের এসব প্রচেষ্টার প্রচ্ছন্ন প্রতিফলন ঘটেছে সম্প্রতি হংকংভিত্তিক ইথিক্যাল অডিট প্রতিষ্ঠান ‘QIMA’ কর্তৃক প্রকাশিত ইথিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং নিরীক্ষা প্রতিবেদনে, যেখানে বিশ্বের পোশাক রপ্তানিকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছেছে। এ অর্জন এসেছে অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে।

এ ছাড়া McKinsey & Company তাদের সর্বশেষ ‘Whats next for Bangladesh’s garment industry, after a decade of growth?’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিগত ১০ বছরে পরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে যে স্বচ্ছতা এসেছে এবং এর ফলে বৈশ্বিক পোশাকশিল্প বাজারে বাংলাদেশ তার অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, সে সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।

কারখানায় কর্মপরিবেশের নিরাপত্তার পাশাপাশি পোশাকশিল্পে সবুজ বিপ্লবের প্রসার লক্ষণীয়। বর্তমানে দেশে US Green Building Council (USGBC) সনদপ্রাপ্ত ১৪৩টি লিড সার্টিফায়েড (Leadership in Energy and Environment Design-LEED) সবুজ কারখানা রয়েছে এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ১০০টি LEED সনদপ্রাপ্ত কারখানার মধ্যে ৩৯টি বাংলাদেশে অবস্থিত।

টেকসই শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিজিএমইএ এরই মধ্যে ২০৩০ সাল নাগাদ পোশাকশিল্পে কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যে UNFCCC (United Nation Framework Convention on Climate Change) Gi Fashion Industry Charter for Climate Action G যোগ দিয়েছে।

পাশাপাশি পোশাকশিল্পে Circular Fashion অনুপ্রাণিত করতে GFA (Global Fashion Agenda), জবাবত্ংব জবংড়ঁৎপবং-এর সঙ্গে সার্কুলার ফ্যাশন পার্টনারশিপ তৈরি করেছে। এ ছাড়া বিজিএমইএ Ellen MacArthur Foundation-এর সঙ্গে Making Fashion Circular শীর্ষক নীতিমালা প্রণয়নে অবদান রেখেছে।

শ্রমমান ও পরিবেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এই পথচলায় সরকার, ক্রেতা, শ্রমিক, উন্নয়ন সহযোগী ও স্টেকহোল্ডারদের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তবে দায়িত্বশীল উৎপাদন নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে রেসপনসিবল সোর্সিংকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। শ্রমমান, পরিবেশ ইত্যাদিসহ বিভিন্ন বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী মূল্যে পণ্য সরবরাহের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। কেননা ভোক্তারা পণ্যের মূল্যের পাশাপাশি গুণগত মান ও ইথিক্যাল মানুফ্যাকচারিংয়ের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখে থাকে।

বিশ্ব পোশাক বাজারে আমাদের সম্ভাবনা অপরিসীম। সব অংশীজনের সহযোগিতায় অর্জনগুলো ধরে রাখতে পারলে আর অগ্রাধিকারের জায়গাগুলোয় একসঙ্গে কাজ করতে পারলে আগামী দিনগুলোয় অর্থনীতির বড় লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করতে পোশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 লেখক : সভাপতি, বিজিএমইএ



সাতদিনের সেরা