kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

করোনার টিকায় মেধাস্বত্ব থাকা উচিত নয়

অনলাইন থেকে

৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কভিড-১৯-এর বিভিন্ন টিকার দ্রুত উদ্ভাবন এক বিস্ময়কর প্রযুক্তিগত অর্জন। এ উদ্ভাবন প্রমাণ করে কত দ্রুত কাজ করা সম্ভব যদি মানবিক উদ্ভাবনী শক্তি ও বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্টতা ব্যাপক জনসমর্থন পায়—মৌলিক গবেষণা থেকে ভর্তুকি পর্যন্ত।

যাই হোক, উদ্ভাবনের বিষয়টি নিরর্থক হয়ে থাকবে যদি টিকাগুলো ন্যায়সংগতভাবে বিতরণ করা না হয়। এগুলোর প্রাপ্যতার ব্যাপারে ঘনায়মান কুসংস্কারের কারণে জনস্বাস্থ্য সুবিধা অবজ্ঞাত হচ্ছে। বেশির ভাগ টিকাদানের ঘটনা ঘটছে গুটিকয়েক ধনী দেশে, বিশ্বের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনো অরক্ষিত; এ বৈষম্যের যদি অবসান ঘটানো না যায়, তাহলে চলমান মহামারি দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে। ভাইরাসের নতুন মিউটেশন ঘটতে শুরু করেছে, ফলে কভিড নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য যতটুকু চেষ্টা হয়েছে তা-ও হুমকিতে পড়বে।

এর সমাধান হচ্ছে ‘পিপলস ভ্যাকসিন’, যা সবার জন্য প্রাপ্য, সবার জন্যই সাশ্রয়ী। এটা করতে পারলে ‘টিকা বর্ণবাদ’-এর অবসান হবে—এর কারণে নৈতিক, স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটছে। বর্তমানে টিকার যে ঘাটতি রয়েছে তা কৃত্রিম এবং এটাকে এড়ানো সম্ভব।

ধনী দেশগুলোর টিকার ডোজ সংরক্ষণের কারণে এবং ওষুধ কম্পানিগুলোর প্রযুক্তিকে জিম্মি করার কারণে টিকার অভাব এখনো টিকে আছে। দুনিয়াজুড়ে বিভিন্ন কম্পানি (বাংলাদেশ থেকে কানাডা পর্যন্ত) শত মিলিয়ন ডোজ উৎপাদন করতে প্রস্তুত, যদি তাদের টিকার প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়। তবে তারা উৎপাদন শুরু করতে অক্ষম। যদি তাদের প্রযুক্তি দেওয়া হয়, তাহলে তারা দ্রুত ডোজগুলো উৎপাদন করতে পারবে, যেমন—দ্রুত মডার্না ও ফাইজার গত বছর করেছে। এটা করা গেলে আরো অনেক দেশে আরো অনেক লোককে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে এবং খুব কমসংখ্যক দেশকেই ধনী দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে একচেটিত্বকে বৈশ্বিক এই মহামারির সময়ে কিছুতেই যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করা যায় না।

বড় ওষুধ কম্পানিগুলো দাবি করে, তারা উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে পারে নিজেদের সামর্থ্যেই। কিন্তু এ দাবি প্রশ্নবিদ্ধ। এরই মধ্যে তারা অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি করেছে এবং ধনী দেশগুলোতে তাদের অগ্রাধিকারের বাজারে তারা প্রয়োজনের চেয়ে কম সরবরাহ করেছে।

‘পিপলস ভ্যাকসিন’ বিতরণের দায়িত্ব একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব এবং সব দেশের সব সংগঠনের সামষ্টিক দায়িত্ব। যাই হোক, ধনী দেশগুলো একটা স্ট্র্যাটেজির আশ্রয় নিয়েছে, সেটা হলো আগে নিজ দেশের লোকজনকে টিকার সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়া। এটা বিজ্ঞানীদের ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের বিপরীত—সর্বত্র তারা স্বাস্থ্যকর্মীদের এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ লোকদের টিকাদানে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে।

ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রিত হয় বৈশ্বিক পর্যায়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তির অধীনে, এ চুক্তির নাম ট্রিপস (ট্রেড-রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস)। কভিড-১৯-এর ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এই চুক্তিকে অভিযোজিত করে নেওয়ার বিষয়টি রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি গ্রুপের প্রস্তাবের কেন্দ্রে। তারা একটি বিশেষ দাবি জানিয়েছে, তারা অধিকার পরিত্যাগের ঘোষণা দাবি করেছে—যাতে তারা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটসের নামে বাধাপ্রাপ্ত না হয়, যাতে তারা কভিড-১৯-এর টিকা উৎপাদন, বিতরণ ও ট্রিটমেন্ট করতে পারে।

কেউ কেউ বলেন, ট্রিপস অ্যাগ্রিমেন্টের মধ্যেই এমন ধারা আছে, যাতে প্যাটেন্টের ব্যাপারে ছাড় দেওয়ার বিষয় রয়েছে। কিন্তু এগুলো খুবই সীমিত সুযোগের এবং এসবের প্রয়োগ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ বিষয়ক অধিকার পরিত্যাগের ঘোষণা প্রযুক্তি হস্তান্তরের পথ তৈরি করবে, যেকোনো দেশ টিকা উৎপাদন অথবা আমদানি ও বিতরণ করতে পারবে। এভাবে উৎপাদিত টিকার জন্য খরচ ওষুধ কম্পানিগুলোর খরচের চেয়ে কম হবে। এতে দরিদ্র দেশগুলো ধনী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধ এড়াতে পারবে।

যাই হোক, এটাকে (অর্থাৎ টিকা সবার জন্য উন্মুক্ত করাকে) দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি ত্রাণ হিসেবে দেখা যায় না। ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতায় ছাড় দিলে ধনী দেশগুলোও লাভবান হবে। সবখানে বেশি ডোজ পাওয়া যাবে এবং এতে টিকা সংরক্ষণ কম হবে। সরবরাহ বেশি হলে টিকার দামও কমবে। এতে ট্রিটমেন্টের ব্যয়ভার কমবে এবং নতুন ভেরিয়েন্টের—যেগুলোর জন্য বর্তমান টিকা কাজ না-ও করতে পারে, আবির্ভাবের ঝুঁকি কমবে।

 

লেখকরা : ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক মারিয়ানা মাজুকাতো; ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসের অর্থনীতির অধ্যাপক জয়তী ঘোষ; ইনস্টিটিউট ফর ইনোভেশন অ্যান্ড পাবলিক পারপাসের ভিজিটিং ফেলো এলস টরিল—এর লেখা নিবন্ধ থেকে ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট অনলাইন