kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

টিকার পেটেন্টে ছাড় : বিশ্বকে রক্ষা করুন, বিগ ফার্মাকে নয়

অনলাইন থেকে

১৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কভিড ভ্যাকসিনের দ্রুত আবির্ভাব এক অনন্য সাধারণ ঘটনা। মানবজাতির বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ-উদ্যম এবং এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা—উভয় দিক বিবেচনায় এ টিকা উদ্ভাবন এক তিক্ত সাফল্য। বিশেষজ্ঞরা অসাধারণ গতিতে টিকাগুলো উদ্ভাবন করেছেন। অন্যদিকে মহামারির প্রকোপ বেড়েছে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ঝুঁকিতে থাকা লোকদের অনেকেরই টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ আমরা ভ্যাকসিন বিলিয়নেয়ার তৈরি করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষকে টিকা দিতে পারছি না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রত্যাশিত ও খুবই অভিনন্দনযোগ্য এক রূপান্তর এই পরিস্থিতিটাকে বদলে দিতে পারে। দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি ক্যাথরিন টাই বলেছেন, ‘অস্বাভাবিক পরিস্থিতি অস্বাভাবিক ব্যবস্থাই দাবি করে।’ যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে কভিড টিকার মেধাসম্পদ (আইপি) সুরক্ষা স্থগিত করার পরিকল্পনাকে সমর্থন দিচ্ছে। বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানকে হতাশ করেই এমনটা করছে ওয়াশিংটন। কারণ বিগ ফার্মাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সুরক্ষা পেয়ে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ড. তেদ্রোস আধানম গ্রেব্রিয়াসুস যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে কভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি স্মরণীয় মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন।

গত অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের প্রস্তাবের পর থেকে করোনার টিকা, চিকিৎসা ও পরীক্ষাসামগ্রীর মেধাসম্পদ ছাড়ের (ওয়েভার) বিষয়টি গড়ে উঠতে থাকে। ফার্মাসিউটিক্যাল স্বার্থসম্পন্ন ধনী দেশগুলো এর বিরোধিতায় নামে। তাতে ক্রমান্বয়ে ভ্যাকসিন বণ্টনের তীব্র বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে পড়ে বলেই পেটেন্ট ছাড়ের প্রশ্ন আসে।

এ বিষয়ে মার্কিন সমর্থন যথেষ্ট না-ও হতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তির জন্য সব সদস্যকে একমত হতে হবে। যদিও ইইউ এখন বলছে যে তারা ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনাটি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে যুক্তরাজ্যকে নির্বিকার দেখাচ্ছে। এই পরিবর্তন তিক্ত বিবাদে রূপ নেবে। ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোর আশঙ্কা হচ্ছে, অধিকার কর্মীরা পরবর্তীকালে অন্যান্য ক্ষেত্রেও আইপি ছাড়ের কারণ হিসেবে এই অভূতপূর্ব পদক্ষেপটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।

অভ্যন্তরীণ দিক থেকে এটা হচ্ছে বাইডেন প্রশাসনের প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের জন্য আরেকটি ছাড়। আর আন্তর্জাতিকভাবে এটি ট্রাম্প-পরবর্তী যুগে আমেরিকাকে আকর্ষণীয় শক্তি (সফট পাওয়ার) হিসেবে তুলে ধরতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে এটা মেনে নেওয়া হলো যে আপনি যদি আদৌ ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে না পারেন, তাহলে চীনা ‘ভ্যাকসিন কূটনীতি’ নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশের সুযোগ কোথায়? যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান বদলের পেছনে কেউ কেউ মনে করেন, জলবায়ু আলোচনাও একটি ভূমিকা রেখেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজের পাশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। তবে আরো জঘন্য দৃষ্টিভঙ্গি হলো (এই ওয়েভার নিয়ে) বিলম্বিত আলোচনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় মনোনিবেশ করা, যার অর্থ হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অতি প্রয়োজনীয় টিকা ধনী দেশগুলো কেন মজুদ করছে তা নিয়ে বাজে প্রশ্ন ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হওয়া। এটি অবশ্যই সত্য যে টিকার বিদ্যমান ডোজগুলোর আরো ন্যায়সংগত ভাগাভাগি জরুরি।

সোজা কথা হচ্ছে, মহামারি দূর হচ্ছে না। সুতরাং বিশ্বকে রক্ষা করার জন্য ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত ডোজ উৎপাদন বাড়াতে হবে। কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে বড় ফার্মাগুলো মুনাফা অর্জনের জন্য উৎপাদন আরো বাড়াতে আগ্রহী। কিন্তু এই সন্দেহও তো রয়েছে যে তারা দরিদ্র দেশগুলোর সঙ্গে অপেক্ষাকৃত ছোট ও অল্প টাকার চুক্তির চেয়ে ধনী দেশগুলোর সঙ্গে বড়, নিয়মিত ও লোভনীয় চুক্তিতেই বেশি আগ্রহী। আবার এই যুক্তি বিশ্বাস করাও কঠিন যে  পেটেন্ট ছাড় না দিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিকল্প পদ্ধতিই যথেষ্ট হবে, যেমনটা অ্যাস্ট্রাজেনেকা করেছে ভারতের সেরামের সঙ্গে লাইসেন্সিং চুক্তি করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অ্যাস্ট্রাজেনেকা একটি ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। ক্যাম্পেইনারদের একটি ভাষ্য হচ্ছে, ভ্যাকসিনটির উদ্ভাবনে অর্থ জোগান দেওয়া হয়েছে করদাতা তথা সরকারি অর্থে। তাই ফার্মটি এখনো টিকা বিতরণ এবং দাম নিয়ন্ত্রণ করে। এ জন্যই অধিকার কর্মীরা স্বচ্ছতা চান।

ভ্যাকসিন উৎপাদন মারাত্মক জটিল একটি বিষয় এবং তা জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের চেয়েও অনেক বেশি জটিল। (কিছু বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত নন যে ওয়েভারই সমাধান।) এর সঙ্গে একটা বিশাল পরিমাণ বাস্তব অভিজ্ঞতা জড়িত, সেই সঙ্গে যথেষ্ট উচ্চ মানসম্পন্ন উৎপাদনব্যবস্থার বিষয় রয়েছে। প্রয়োজন হবে বিপুল পরিমাণ সহায়তা ও তহবিলের। এ সব কিছুই সময় নেবে। তবে ছাড়ের বিরোধিতার জন্য এরই মধ্যে অর্ধেকটা বছর ব্যয় হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের বিপরীতে ইইউ ও ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানের কদর্যতা প্রকাশ পেয়েছে। এখনো তাদের সুযোগ রয়েছে নিজেদের ইতিহাসের সঠিক অবস্থানে রাখার।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ