kalerkantho

রবিবার । ২৬ বৈশাখ ১৪২৮। ৯ মে ২০২১। ২৬ রমজান ১৪৪২

জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে কিছু ভাবনা

প্যাট্রিসিয়া এস্পিনোসা

৩ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রায় তিন দশক আগে, ১৯৯২ সালে রিও দে হানেইরোতে অনুষ্ঠিত ‘আর্থ সামিট’-এর সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিবেশের তথা জলবায়ুর বর্ধমান পরিবর্তন মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। ঐতিহাসিক ওই সম্মেলন থেকে কিছু প্রস্তাব এবং কিছু চুক্তি বা সমঝোতার বিষয় উদ্ভূত হয়। ওই সব চুক্তি-সমঝোতার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ইউএন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ।’ এই বহুপক্ষীয় উদ্যোগের আসল লক্ষ্য ছিল অনাবেক্ষিত বা অলক্ষিত ও ক্ষতিকর জলবায়ু পরিবর্তন, যাতে প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, খাদ্য উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, টেকসই উন্নয়ন যাতে ব্যাহত না হয়। সংক্ষেপে বললে, এ বিশ্বকে তেমন রাখার চেষ্টা করা, যেমন আমরা দেখতে অভ্যস্ত।

তিন দশক ধরে বিভিন্ন দেশ বা বিভিন্ন পক্ষ (যেমন—তাদের জানা হয়েছে সে অনুযায়ী) বিতর্ক করেছে এবং তারা চিন্তা-ভাবনা করেছে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে জলবায়ু ব্যবস্থার প্রতি সৃষ্ট হুমকির বিষয়ে এবং এর ধারাবাহিকতায় আমাদের এই গ্রহের ভবিষ্যতের প্রতি যে হুমকি তৈরি হয়েছে সে বিষয়ে। এ বিষয়ে অগ্রগতি ছিল ধীর, প্রায়শ বিরক্তিকরও বটে। কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জনও ছিল যা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে, যেমন—১৯৯২ সালের কিয়োটো প্রটোকল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ২০১৬ সালের প্যারিস চুক্তি, যা পরিবেশসংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক রেজিমের বিকাশ ঘটিয়েছে। এই রেজিম জলবায়ুর সুরক্ষা দেয়।

বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি এখন অস্পষ্ট বা দুর্বোধ্য নয় এবং এসবের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত টানা হয়েছিল সেগুলো ছিল আগ্রহোদ্দীপক (যা অস্বীকার করা যায় না বা অগ্রাহ্য করা যায় না)। গত শতাব্দী ধরে পৃথিবীর উপরিভাগের তাপমাত্রা বেড়েছে এবং সত্যি বলতে কি এখনো বাড়া অব্যাহত আছে, বিপজ্জনক হারে তাপমাত্রা বেড়েছে। এ উষ্ণায়ন প্রক্রিয়ার কারণ কী তা খুবই স্পষ্ট। এর কারণ বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের সঞ্চয়ন। সম্ভবত এখন মানবজাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি কাজ হচ্ছে উষ্ণায়নের এ প্রক্রিয়াকে উল্টোমুখে ঘুরিয়ে দেওয়া।

বলা যায়, এ পৃথিবী এর আগে কখনো এত বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়নি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণগুলো জটিল এবং সর্ববিস্তারী। প্রক্রিয়াটি অনেক অনেক সময় ধরে চলছে এবং এ প্রবণতাকে উল্টোমুখী করার জন্য প্রাপ্ত সময় এত কম যে জলবায়ু পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যকে প্রায়ই অন-অর্জনযোগ্য মনে হয়। করোনাভাইরাস মহামারি—এতে অনেক ভয়ভীতি উৎপন্ন হয়েছে, অনেক ক্ষতি হয়েছে, অনেক ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে—এই মোকাবেলার কাজটিকে আরো কঠিন করে তুলেছে।

চ্যালেঞ্জটি আসলেই খুব কঠিন, ভীতির উদ্রেককারী। এ সমস্যাকে ঠিকমতো মোকাবেলা করতে হলে গ্লোবাল লিডারশিপকে অবশ্যই অসাধারণ গুণের ও দক্ষতার অধিকারী হতে হবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর ঘটাতে হবে পৃথিবীকে টেকসই উন্নয়নের পথে সংস্থাপিত করার জন্য এবং সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশের গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া থামাতে হবে, এটা যেন ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না হয়। এর জন্য দরকার দৃঢ় ও কার্যকর কর্মসূচি। সর্বোপরি দরকার তথ্যবিজ্ঞ এবং ইনক্লুসিভ লিডারশিপ সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই; নারী-পুরুষ সবার মধ্য থেকেই, বিশেষ করে নারীদের মধ্য থেকে। এ রূপান্তর প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেতাদের জলবায়ু সম্মেলন—যেখানে সারা বিশ্বের সরকার এবং রাষ্ট্রের প্রধানদের ভার্চুয়ালি আলোচনা করতে বলা হয়েছিল; এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করার জন্য পরিবেশ, জলবায়ুর উন্নয়নের লক্ষ্যে খুবই ভালো একটা উদ্যোগ ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবায়িত অঙ্গীকার এসংক্রান্ত একটা যৌক্তিক প্রেরণা। নিজ দেশের সীমার মধ্যে পরিবর্তন ত্বরান্বিত করে এবং দেশের বাইরে এ বিষয়ে প্রবল উৎসাহে প্রণোদনা জুগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ‘ক্লাইমেট এজেন্ডা’ অগ্রসর করে নেওয়ায় সহায়তা করছে।

যেসব নেতাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাঁদের একটা সুযোগ ছিল বিষয়াদি উন্মোচিত করার ব্যাপারে এবং সম্ভাব্য নতুন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যের বিষয়ে একমত হওয়ার বিষয়ে এবং মূল বিষয়গুলোতে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার জন্য যেমন অভিবাসন, অভিযোজন (জলবায়ুর পরিবর্তনের বিষয়ে তাল মিলিয়ে) এবং অর্থায়ন। এ বিষয়গুলো জলবায়ুর পরিবর্তন বিষয়ের কেন্দ্রে রয়েছে। অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কমন গ্রাউন্ড খুঁজে পাওয়ার সুযোগও তাদের ছিল। এ সুযোগ একসময় অমূল্য বলে প্রমাণিত হবে। কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আসন্ন কপ-২৬-এর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এটা অনুষ্ঠিত হবে গ্লাসগোতে, যুক্তরাজ্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হবে। এখন নেতৃত্ব প্রদর্শনের, সাহসিকতা দেখানোর এবং দৃঢ় মানসিকতা প্রদর্শন করার সময়। এখন সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার। এই রূপান্তরকে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি এবং সবার আশা-ভরসা হয়ে ওঠার দিকে নিয়ে যাওয়ার সময়।

লেখক : মেক্সিকোর রাজনীতিক ও কূটনীতিক; ইউনাইটেড ন্যাশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জের নির্বাহী সম্পাদক

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান ইউকে অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক



সাতদিনের সেরা