kalerkantho

রবিবার । ২৬ বৈশাখ ১৪২৮। ৯ মে ২০২১। ২৬ রমজান ১৪৪২

শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে

ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান

১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে

মহান মে দিবস আজ। শ্রমজীবী মানুষের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন এটি। এই দিনটি শ্রমজীবী মানুষের কাছে বিজয় ও অনুপ্রেরণার দিন। ১৩৫ বছর আগে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকরা অর্জন করেছিল আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা বিনোদনের অধিকার। কিন্তু মে দিবসের প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের শ্রমিকদের আজকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আবহমান কাল থেকে সারা বিশ্বের সব সৃষ্টির নির্মাতা হলো শ্রমিক, কর্মচারী ও মেহনতি মানুষ। মহান মুক্তিযুদ্ধসহ আমাদের দেশের সব গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও উন্নয়নে শ্রমিক, কর্মচারী ও মেহনতি মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। গার্মেন্ট, নির্মাণ, প্রবাসী, পাট, চা, চামড়া, পরিবহন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, রাবার, স্টিল, রি-রোলিং, শিপ ব্রেকিং, চাতাল, সুতা, ওষুধ, সিরামিক, প্লাস্টিক, স্বাস্থ্য খাত, রিকশা, গৃহশ্রমিকসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা হলো আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে প্রতিনিয়ত বর্ধিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার। কিন্তু শ্রমিক, কর্মচারী ও মেহনতি মানুষকে তাদের ন্যায়সংগত অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সেভাবে দেওয়া হচ্ছে না। তাদের জীবন মানেরও তেমন কোনো উন্নতি ঘটেনি। তারা এখনো পরিবার-পরিজনসহ জীবনধারণ উপযোগী মজুরি ও অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থেকে বঞ্চিত। কর্মস্থলে তাদের চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদাও প্রতিষ্ঠিত হয়নি এখনো। তাদের যে মজুরি দেওয়া হয় তা দিয়ে তারা ভালোভাবে জীবন যাপন করতে পারে না কিংবা সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারে না। দেশের শ্রমবাজারে প্রতিনিয়ত পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি ব্যাপকসংখ্যক নারী শ্রমিকের আগমন ঘটলেও কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত শ্রমিকদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ‘লস অব ইয়ার আর্নিং’ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। অনেক কারখানা প্রতিষ্ঠানে কোনো ক্ষতিপূরণই দেওয়া হয় না।

গত সোয়া বছরেরও বেশি সময় থেকে ঘাতক ব্যাধি মহামারি করোনাভাইরাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা পৃথিবী। এর মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩১ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখনো গড়ে প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট লাখ মানুষের করোনাভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে এবং ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ এই ভাইরাসে মৃত্যুবরণ করছে। আমাদের দেশেও এই ভাইরাস ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত বছরও করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার দুই মাসের বেশি সময় ধরে সাধারণ ছুটি ও লকডাউন দিয়েছে। এবারও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে পর্যায়ক্রমে লকডাউন চলছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চলমান সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ। বহু শ্রমজীবী মানুষ ছাঁটাইয়ের শিকার হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রায় সব সেক্টরে সাধারণ শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির জরিপে দেখা গেছে, মহামারির সময় দেশে দেড় কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ৬.৭৮ শতাংশ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হয়েছে। মানুষের আয় কমেছে। বর্তমানে লকডাউন চলাকালে নতুন করে ১০ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছে।

গত বছরের মতো এবারও লকডাউনের শুরু থেকে শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। নির্মাণ, পরিবহন, ট্যানারি, কৃষি, শিল্প, চাতাল, ওয়েল্ডিং ও শিপ ব্রেকিং, হোটেল রেস্টুরেন্ট, রিকশা, গৃহশ্রমিকসহ প্রায় সব পেশার শ্রমিকরাই আজ বেকার। এসব শ্রমিকের বেশির ভাগই দিন আনে দিন খায় ভিত্তিক শ্রমিক। তাদের উপার্জনের ওপরই তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণ নির্ভর করে। কর্মহীন হয়ে পড়ায় পরিবার-পরিজনসহ এসব শ্রমিক অর্ধাহরে-অনাহারে দিন যাপন করছে।

শ্রমজীবী মানুষ যেহেতু দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তাই মহামারি পরিস্থিতিতে পরিবার-পরিজনসহ তাদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিশ্চিত করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ছিল। করোনাঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে শ্রমঘন শিল্পাঞ্চলগুলোয় শ্রমিকদের করোনা শনাক্তকরণ কেন্দ্র ও আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন করা জরুরি ছিল। কিন্তু তা হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

জাতীয় সংসদের ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন সমাগত। সরকার প্রতিবছর বাজেটের আগে ব্যবসায়ী মহলসহ এফবিসিসিআই, এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বিভিন্ন চেম্বার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে থাকে। ব্যবসায়ী ও মালিকদের বিভিন্ন পরামর্শ ও সুপারিশ গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু দেশের উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি শ্রমিক-কর্মচারীদের কোনো মতামত গ্রহণ করা হয় না। অর্থমন্ত্রী বরাবরই তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বলে থাকেন বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অসমতা হ্রাস করা। কিন্তু প্রতিবছর আমরা দেখতে পাই, বাজেটে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অসমতা হ্রাস তো হয়ই না। বরং বাজেট এলে প্রতিবছর নতুন করে দারিদ্র্যের হার এবং ধনী-গরিবের বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। বাজেটে সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ না নিলেও বাজেটের পর সাধারণ মানুষের নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র ও খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যায়। তাই বাজেট এলে শ্রমিক, কর্মচারী ও মেহনতি মানুষের উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। শ্রমিক-কর্মচারীদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলে শ্রমিকরা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পায় না। কর্মস্থলে চাইল্ড ডে কেয়ার সেন্টারের কোনো দিকনির্দেশনা নেই। শ্রমিক-কর্মচারীরা হেলথ ইনস্যুরেন্স কিংবা গ্রুপ ইনস্যুরেন্স কিছুই পায় না। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রমজীবী মানুষের মেধা ও পরিশ্রমের অবদান ছাড়া কিছুই করা সম্ভব নয়। সেখানে তাদের সঙ্গে আলোচনা না করে যে বাজেট প্রণয়ন হয় তাতে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটে না।

এখানে একটা বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে মহামারি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করলেও এখনো সরকার, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট মালিক কর্তৃপক্ষ এসব কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেনি। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এবারের করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে দেশের শ্রমজীবী মানুষ প্রত্যাশা করে, বাজেটে তাদের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন, সম্মানজনক মজুরি, সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হবে। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। বাঁচার মতো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী ব্যক্তিমালিকানা-নির্বিশেষে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা নিশ্চিত করতে হবে। রেশন প্রথা চালু করে সস্তা ও বাঁধা মূল্যে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে সরবরাহ করতে হবে। নিরাপদ কর্মস্থল, শোভন কাজ ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে ভ্যারিয়েবল ডিএ প্রদান করতে হবে। নারী শ্রমিকদের সমকাজে সমমজুরি, সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা, শিশু যত্নাগার ও প্রসূতিকালীন ছুটি নিশ্চিত করতে হবে। এলাকাভিত্তিক সুলভ মূল্যে বাসস্থান এবং বিনা মূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে শ্রমিক-কর্মচারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র



সাতদিনের সেরা