kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

পারকিনসনস নিয়ন্ত্রণে নতুন আশা

ডা. মোহাম্মদ সেলিম শাহী

৩০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পারকিনসনস নিয়ন্ত্রণে নতুন আশা

আমাদের অজ্ঞতা এবং বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা প্রায়ই আমাদের এমন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায়, যখন আমরা কোনো সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করা তো দূরের কথা, অনেক সময় আমরা সেই সমস্যা শনাক্ত করতেই ব্যর্থ হই। এই কথাটি যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেও সত্য। আপনি যদি কোনো রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান, তাহলে অবশ্যই আপনার সেই নির্দিষ্ট ব্যাধির বিস্তারিত তথ্য, যেমন : প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী কী এবং কিভাবে এটি প্রতিরোধ করা যেতে পারে সে সম্পর্কে জানা উচিত। না জানা থাকলে বিভ্রান্তি, ভুল চিকিৎসা ও অনাস্থার সুযোগ রয়ে যায়। বাংলাদেশে পারকিনসনস রোগের অবস্থা প্রায় একই রকম। বেশির ভাগ মানুষ এমনকি আক্রান্তের কাছের আত্মীয়-স্বজনরা এই রোগের নামও জানেন না, যদিও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে যদি আমরা সত্যিই নিজেকে এবং আমাদের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের এই অসুস্থতার হাত থেকে বাঁচাতে চাই, তাহলে অবশ্যই পারকিনসনস রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত সব তথ্য আমাদের জানা থাকতে হবে।

পারকিনসনস রোগটা আসলে কী? পারকিনসনস রোগ হলো এক ধরনের ক্ষয়িষ্ণু মস্তিষ্কের ব্যাধি, যা সাধারণত বিভিন্ন লক্ষণসহ (ঝাঁকুনি, অলসতা এবং কঠোরতা) প্রবীণদের মধ্যে দেখা যায়। এই রোগের শেষ পর্যায়ে হাঁটা, ভারসাম্য রক্ষা এবং সমন্বয় করতে অসুবিধা হয়। আমাদের দেহের গতিবিধির ধরন বেসাল গ্যাংলিয়া এবং সাবস্টানশিয়া নিগ্রা বরাবর মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত আন্তঃসংযুক্ত স্নায়ু কোষগুলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ হয়। যদি কোনো কারণে সাবস্টানশিয়া নিগ্রার ডোপামিন উৎপাদনকারী স্নায়ু কোষগুলো মারা যায়, তাহলে স্নায়বিক ক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে পারকিনসনস রোগের লক্ষণগুলোর বিকাশ ঘটে। এই রোগটি বয়স্কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, বিশেষত যাঁরা ৬০ বছর বয়সী এবং নারীদের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি পুরুষকে প্রভাবিত করতে পারে।

২০০৬ সালে প্রকাশিত ডি লাউ এবং ব্রেটিলারের একটি পর্যালোচনা থেকে জানা যায় যে বিশ্বের প্রায় এক কোটি মানুষ এবং প্রায় ১ শতাংশ ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি পারকিনসনস রোগে আক্রান্ত এবং এটিকে আলঝেইমারস রোগের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আমরা যদি সত্যই এই ব্যাধিকে দূরে রাখতে চাই, তবে অবশ্যই রোগের লক্ষণ সম্পর্কে জেনে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, যেন আমরা প্রাথমিক পর্যায়েই যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারি। এই রোগের প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে—হাত, পা, চোয়াল বা মাথার কাঁপুনি, মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়া, ধীরতা, পস্টুরাল ইনস্টেবিলিটি এবং গাইট সমস্যা। তবে কিছু মানুষ হতাশা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মূত্রথলির সমস্যা, ঘুমের ব্যাধি, যৌন সমস্যা এবং অন্যান্য নন-মোটর পরিবর্তনের মতো উপসর্গ অনুভব করতে পারে। তবে এটাও সত্যি যে এই রোগের লক্ষণ একেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। যার ফলে কোনো ব্যক্তি আসলে পারকিনসনস রোগে, নাকি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন সেটা নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি কেউ বিশেষত প্রবীণরা আগের উল্লিখিত লক্ষণগুলো অনুভব করেন, তাহলে অবশ্যই একজন নিউরোফিজিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এ রোগের পরিপূর্ণ কোনো চিকিৎসা নেই, তবে নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধ, অস্ত্রোপচার এবং শারীরিক থেরাপি প্রায়ই রোগীকে কিছুটা স্বস্তি দেয় এবং ব্যথা উপশম করতে পারে। তা ছাড়া এই রোগের চিকিৎসার জন্য কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হলেও সেগুলোর দীর্ঘায়িত ব্যবহার ডিস্কিনেসিয়া, মোটরের ওঠা-নামা এবং হ্যালুসিনেশনের মতো কিছু জটিলতা ঘটাতে পারে।

দুর্ভাগ্যবশত, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এই রোগে ভুগছেন তাঁদের ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ বা শারীরিক থেরাপি খুব একটা ভালো ফল দেয় না। তাঁদের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন (ডিবিএস) বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নিরাপদ অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, যা সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে বেশ আশার সঞ্চার করেছে। যেসব রোগীর মূলত ওষুধে খুব একটা সাড়া দেয় না তাঁদের জন্য ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন একটি কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন পদ্ধতিতে পারকিনসনস রোগের জন্য দায়ী মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের নিউক্লিয়াস ইলেকটিক্যাল ইম্পালস পাঠানো হয়। ইলেকট্রিক্যাল ইম্পালস তখন অস্বাভাবিক কার্যকলাপকে ব্যাহত করে এবং সমস্যা হ্রাস করার চেষ্টা করে। অন্যান্য কার্যকর নিউরোসার্জারির তুলনায় ডিবিএসের (ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন) প্রধান সুবিধা হলো এর বিপরীতমুখিতা এবং এটা সহজেই মানিয়ে যায়।

 যেহেতু মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, পারকিনসনস রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাংলাদেশে বাড়ছে। ডিবিএসের মতো একটি চিকিৎসা পদ্ধতির অবলম্বন আমাদের জন্য একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে পারে এবং আমাদের দেশে পারকিনসনস রোগ নিয়ন্ত্রণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার সক্ষমতা রাখে। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের বয়স্ক নাগরিকদের সুন্দর একটি জীবনও উপহার দিতে পারব।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক (নিউরোলজি), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল (এনআইএনএস), ঢাকা