kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

টিকা ও বিশ্ব অর্থনীতি

নেকমেত্তিন কেমাজ

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মহামারির এই পর্যায়ে ভ্যাকসিন কর্মসূচিগুলো এসে আশাবাদ ছড়িয়ে দিয়েছে এবং ২০২১ ও পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণে সংশোধনী আনতেও উৎসাহ জুগিয়েছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের দ্বিবার্ষিক রিপোর্ট ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক (ডাব্লিউইও) প্রকাশ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভয়াবহতম বৈশ্বিক মন্দা নিয়ে আসা কভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর সংস্থাটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তার চেয়ে এবারের প্রতিবেদনটি অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক।

আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী বিশ্ব অর্থনীতি প্রকৃত অর্থে ২০২০ সালে ৩.৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এর মধ্যে অগ্রসর অর্থনীতিগুলোর (এইএস) প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়েছে ৪.৭ শতাংশ এবং উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর (ইএমডিই) প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়েছে ২.২ শতাংশ। দেখা গেছে, ২০২০ সালে জি-২০ অর্থনীতির মধ্যে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির তালিকায় নাম লেখাতে পেরেছে শুধু চীন ও তুরস্ক। অথচ দুটি দেশই ইএমডিইভুক্ত। আর ইউরোপে শুধু তুরস্ক ও আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। অথচ একই বছরে ২৭টি অর্থনীতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছিল ৬.১ শতাংশ।

এখন বেশ কয়েকটি দেশে ভ্যাকসিন বা টিকার সফল কর্মসূচি আশাবাদ এনে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা এবং অর্থনীতিবিদদের ২০২১ ও পরবর্তী বছরগুলোর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ সংশোধন করতে উৎসাহিত করেছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিবেদনে ২০২১ সালে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ৬ শতাংশ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, যা তার অক্টোবর ২০২০ সালের প্রক্ষেপণের চেয়ে ০.৮ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যেমন বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে দেশে দেশে অনেক পার্থক্য দেখা যাবে এবং এর প্রধান কারণ হবে টিকা বিতরণে ‘অসাম্য ও অন্যায্যতা’। এর পরও এ কথা বলা যায় যে বিশ্বজুড়ে টিকাদানের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে না হলেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অনিশ্চয়তা কমিয়ে আনছে। এখন মহামারির প্রভাব হ্রাস ও অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের নীতিগত প্রতিক্রিয়া এবং আর্থিক সহায়তাকে যুক্ত করে অর্থনীতিবিদরা ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাপারে নিজেদের একেবারে নিখুঁত অবস্থানে দেখতে পাাবেন।

 

তেজি প্রবৃদ্ধি আংশিকভাবে বেইস ইফেক্টের (মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত ধাঁধা) একটি ফল। ২০২০ সালে জিডিপির দিক থেকে বিশ্ব অর্থনীতি ক্রয়ক্ষমতার সমতায় তিন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। শক্তিশালী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য এটি একটি ‘ডিনোমিনেটর ইফেক্ট’।

২০২১ সালে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ মূলত উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো থেকে আসবে, যা আইএমএফের সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৫৬টি অর্থনীতি নিয়ে গঠিত এবং এ সময়ে তাদের প্রবৃদ্ধি হবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ৬২ শতাংশ। তবে চীনকে বাদ দিলে ইএমডিইগুলোর অবদান হবে ৩৭.৫ শতাংশ। এই সময়ে অগ্রসর অর্থনীতিগুলো (আইএমএফের সংজ্ঞা অনুযায়ী আবার ৩৯টি অর্থনীতি) পূরণ করবে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৩৮ শতাংশের কিছু বেশি।

২০২১ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির দুই-তৃতীয়াংশ শুধু ১০টি দেশ থেকে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক সময়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ছয় বছরের জন্যও এই ধারা বজায় থাকবে।

আশাবাদী হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত সাফল্য এখনো ‘অপেক্ষা করো ও দেখো’র মতো একটা বিষয়। যদিও উচ্চ হারে টিকাদানে সফল দেশগুলোতে কভিড সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

টিকা কর্মসূচির অর্থনীতিগুলো শক্তিশালীভাবে প্রত্যাবর্তন করবে, কিন্তু অপর্যাপ্ত টিকার অর্থনীতিগুলোর পুনরুদ্ধার কার্যক্রম তাৎপর্যপূর্ণভাবে হোঁচট খাবে। কিছু দরিদ্র দেশ এর শোচনীয় পরিণতি ভোগ করবে। এই বিষয়ে সিওভিএএক্স (কভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাকসেস) ভ্যাকসিনের ন্যায়সংগত প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এবং উন্নত অর্থনীতিগুলোকে এ ধরনের উদ্যোগে আরো সমর্থন জানানো উচিত।

একবার যদি উন্নত অর্থনীতিগুলো তাদের ট্র্যাকে ফিরে আসতে পারে, তাহলে পর্যায়ক্রমে তারা আর্থিক সহায়তা বন্ধ করতে পারে। কিন্তু সহায়তা যদি সমন্বয়হীন হয়, তাহলে এটাও ২০১৩ সালের ‘টেপার ট্যানট্রামের’ (বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি) পুনরাবৃত্তি করতে পারে, যা উদীয়মান বাজারগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য মূলধন বহিঃপ্রবাহের কারণ হয়েছিল।

মনে রাখতে হবে, মহামারি-পূর্ব প্রবণতা, যেমন—ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সুরক্ষাবাদ ও বৃদ্ধ জনসংখ্যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে কিছুটা কম করে হলেও। এখন এই সব চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকির জন্য শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বয় প্রয়োজন।

 লেখক : ওয়াশিংটনে কর্মরত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ উপদেষ্টা ও আমেরিকায় নিয়োজিত তুর্কি বিনিয়োগ দপ্তরের কান্ট্রি ডিরেক্টর

সূত্র : টিআরটি ওয়ার্ল্ড

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা