kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

সব পেয়ে সব হারানো মানুষদের গল্প

মোস্তফা মামুন

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সব পেয়ে সব হারানো মানুষদের গল্প

আমার পরিচিত এক মধ্যবয়সী মানুষ ব্যাংকে বড় কর্তা ছিলেন। এক সন্তান, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। স্ত্রীও স্কুলে চাকরি করতেন। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠিত পরিবার। ওদিকে ভাইয়েরা সবাই আমেরিকায় স্থায়ী হওয়ায় সম্পত্তি নিয়ে ভাগাভাগির ঝামেলা নেই, বরং তিনিই সব ভোগ করতে পারেন। উপরি হিসেবে ভাইদের কাছ থেকে ডলারও আসে, ভাগ্নের জন্য-ভাবির জন্য এটা-ওটা।

এমন সুখে বাংলাদেশে খুব কম মানুষই থাকে। কিন্তু সুখে থাকলে সেটাকে সুখ মনে হয় না। ‘ওপারেতে সর্বসুখ’—এই বিশ্বাস থেকে ভাবলেন, ওরা সব আমেরিকায় মহানন্দে আছে, আমি আর এখানে পড়ে পড়ে ভুগব কেন? বাংলাদেশে আছেটা কী!

ভাইয়েরা আবেদন করে রেখেছিলেন। একসময় কাগজপত্র চলে এলো। তিনি সব ছেড়েছুড়ে এক সন্ধ্যায় স্বপ্নের দেশের প্লেনে চেপে বসলেন।

মাস কয়েক পর একদিন গভীর রাতে ফোন। ধরতেই ওপাশ থেকে কান্না। ‘আমি এখন কী করি জানো? একটা পেট্রলপাম্পের নাইটগার্ড।’

‘বিদেশে কোনো কাজ ছোট নয়।’ সান্ত্বনা দিতে বললাম।

‘তা ছোট নয়। কিন্তু তুমি কি জানো আমি-আমার বউ আর ছেলে তিনজন তিন জায়গায় থাকি।’

‘কেন?’

‘এখনো তো ঠিক নিজের বাসা করার মতো টাকা হয়নি। তাই আমি এক ভাইয়ের বাসায়, বউ আরেকজনের বাসায়, ছেলে আরেকজনের...’

আমি বুঝতে পারি। লন্ডন-নিউ ইয়র্কে কেউ যত প্রতিষ্ঠিতই হোক, পুরো পরিবারকে একসঙ্গে রাখার বিলাসিতা দেখানো একটু কঠিন। তা ছাড়া একজনের ওপর চাপ পড়ে যাবে ধরে ভাইয়েরা ওদের ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।

ভদ্রলোক ফিরে এলেন। সপরিবারে। কিন্তু থাকতে পারলেন না। এবার স্ত্রী বলেন, বিদেশেই স্বাধীনতা অনেক বেশি। এদিকে যাওয়া-আসার তালে ছেলে যে এক বছর পিছিয়ে পড়ল এটাও ওর পছন্দ হচ্ছিল না। সে-ও আমেরিকামুখী। ভদ্রলোক চিৎকার করে বললেন, ‘তোমরা যাও। আমি যাব না। নো। নেভার।’

ওরা চলে গেল। তিনি রয়ে গেলেন।

শুরুতে বলতেন, ‘স্বাধীন জীবন। না খেয়ে শুয়ে থাকি। লাইট নেভাই না। বেশ একটা প্রথম জীবনের আনন্দ পাচ্ছি।’

বেশিদিন আনন্দটা থাকল না। এক রাতে দুঃস্বপ্ন দেখলেন ছেলেকে নিয়ে। ওখানে নিগ্রোরা ওকে গাল দিয়েছে। ছেলে দিয়েছে পাল্টা বাংলা গালি। তারপর ওদের পকেট থেকে বেরিয়েছে পিস্তল।

তিনি আবার ফ্লাইটের টিকিট কাটলেন। কিছুদিন পর ফিরলেন। আবার গেলেন। মোটের ওপর যাওয়া-আসার ওপরেই জীবন কাটে। মাঝেমধ্যে আফসোস করে বলেন, ‘জীবনে সব অঙ্ক ঠিকঠাকমতো করলাম, তবু কেন এমন ভুলভাল হয়ে গেল। স্ত্রী-সন্তান এক দেশে। আমি আরেক দেশে।’

এই অঙ্কজনিত সমস্যাটা আসলে বহু লোকের। যা আবার সামনে এলো তারেক শামসুর রেহমানের করুণ মৃত্যুতে। সামান্য আলাপ-পরিচয় ছিল। ক্ষমতার দিকে ঝুঁকে যাওয়ার এই যুগে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মানুষ খুব কম। তাই পছন্দ করতাম। কিন্তু হাসি-খুশি চেহারা আর অন্তরঙ্গতা দিয়ে যে একাকিত্বের কষ্টটা আড়াল করে রাখতেন সেটা জানতাম না। স্ত্রী-কন্যা বিদেশে থাকতেন। নিজে বোধ হয় সামাজিক মর্যাদা-গুরুত্ব ইত্যাদির টানে দেশে রয়ে গিয়েছিলেন। তাই এমন নিষ্ঠুর পরিণতি। জানার পর মনে হচ্ছে, এ আসলে তাঁর একার নয়। আরো বহুজনের সমস্যা। সময় বোধ হয় এসেছে এই সামাজিক প্রবণতা, বৃদ্ধ বয়সের একাকিত্ব, সামগ্রিকভাবে আমাদের সিনিয়র সিটিজেনদের জীবন নিয়ে ভাবার।

এ জীবনে বহু জ্ঞানী লোকের সঙ্গে মিশেছি। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছি, অসামান্য সব দার্শনিক কথাবার্তা সাধারণ লোকের মুখ থেকেই বেরোয়। তেমনি একজন চেনা মানুষ একবার বলছিলেন, ‘এই দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানো? মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ভাবে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বড় বেশি দুশ্চিন্তা।’

ভবিষ্যৎ ভাবনা তখনো খুব ভালো ব্যাপার বলে জানি। আর ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ভাববে না? যারা ভাবে না, তারা জীবনে উন্নতি করতে পারে না—এই ধারণাই তো প্রতিষ্ঠিত সমাজে।

তিনি ব্যাখ্যা করলেন, ‘ধরো একজন চাকরিজীবী ঠিকমতো খায় না, পরে না, কী করে টাকা দিয়ে? জমায়। ছেলে-মেয়েদের কথা ভেবে। অথচ ঠিকমতো না খেয়ে, ঠিকমতো কিছু উপভোগ না করে দেখা যায় শরীরে সমস্যা দেখা দেয়। বুড়ো বয়সে সন্তানদের কাঁধে জোটে একজন অসুস্থ-আক্রান্ত মানুষ। এদিকে বেশি টাকা করতে পারলে, সেটার ভাগাভাগি নিয়ে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে লাগে। বিরাট ঝামেলা।’

‘ঝামেলা দূরের উপায় কী?’

‘ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি না ভাবা। বর্তমানটা ধরে বেঁচে থাকা। তাহলে দেখবে দুর্নীতিও কমে যাবে।’

‘এতে দুর্নীতিও কমবে?’

‘হ্যাঁ। ছেলেকে অস্ট্রেলিয়া পাঠাতে হবে, মেয়েকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াতে হবে—এই ভাবনা বাদ দিলে তো বাড়তি টাকার দরকার হবে না।’

বিষয়টা হয়তো অত সরলীকৃত নয়। দুর্নীতিবাজরা শুধুই বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ ভেবে খারাপ কাজ করেন, এমনও নয়। ওদের দুর্নীতি করার আরো ১০১টা কারণ বের করা যাবে; কিন্তু এই ভাবনা এখন হাজির হচ্ছে অন্যভাবে।

মানুষ এখন যা-ই করুক, খুব বেশি দেশে থাকতে চায় না। প্রতিষ্ঠিত মানুষদের একটা বিশ্বাসই হলো, এখানে ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ নেই। বিদেশে পাঠাও। সে স্থায়ী হোক। সে হলে, তাঁর সূত্র ধরে নিজেরাও একটা দ্বিতীয় নিবাস বানিয়ে ফেলেন। খুবই উত্তম ব্যবস্থা। তা ছাড়া রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে দুঃসময় এলে তার জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয়ও দরকার। সবই হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় অনেকের ক্ষেত্রে সব হারাতে হয়।

বাচ্চাদের জন্য বিদেশ আকর্ষণীয় জায়গা। ভোগ-উপভোগ অনেক বেশি। স্ত্রীদের জন্যও অনেক ক্ষেত্রে বিদেশের স্বাধীনতা অনেক আনন্দের। এই দেশে নারীদের জন্য খুব নিরাপদ বা আরামপ্রদ ব্যবস্থা আমরা করতে পারিনি। কিন্তু দোটানা পরিবারের সেই কর্তার, যাঁদের এখানে আছে সম্মান। ওখানে আছে সম্ভাব্য অপমান।

তাই তাঁরা অনেকেই মায়া কাটিয়ে রয়ে যান। হয়ে যান একা থেকে আরো একা। বয়সের কারণেই বন্ধু-বান্ধবও খুব পাওয়া যায় না। এদিকে বৃদ্ধ বয়সের মানুষের জন্য আমাদের সমাজ আসলে খুব ভাবেই না। নইলে গড় বয়স যেখানে ৪৬ থেকে বেড়ে ৭২-এ গেছে, সেখানে তাঁদের জন্য একটা বৃহত্তর সামাজিক ব্যবস্থাপনা দরকার ছিল। বৃদ্ধাশ্রম ব্যাপারটা শুনলেই আমরা কেঁপে উঠি, আমাদের সামাজিকতার সঙ্গে ওটা যায়ও না। কিন্তু যায় এমন একটা উপায় তো বের করতে হবে। একসময় গড় আয়ু কম থাকার কারণে বয়স্ক মানুষ চাকরি থেকে অবসরের পর আর খুব বেশিদিন থাকতেন না। এখন ৫৯ বছর বয়সে অবসর নেওয়ার পর আরো ১৫-১৬ বছর সক্ষম শারীরিকতা নিয়েই টিকে থাকেন। কিন্তু জীবন বলতে সর্বোচ্চ নাতি-নাতনিদের নিয়ে খেলাধুলা। পরিচয় বলতে, অমুকের বাবা-তমুকের কাকা। কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। পারিবারিক বৃত্তের বাইরে সঙ্গ-ভোগ-উপভোগের কোনো আয়োজনই রাখে না সমাজ। কী আর বলব, হুইলচেয়ারে রাস্তায় চলাচলের যে সামান্য নিশ্চয়তা দরকার, সেটা পর্যন্ত নেই। টিকিটের লাইনে, হাসপাতালের সারিতে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য অগ্রাধিকারের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাও দেখি না। ‘এই মুরব্বিকে যেতে দে’ ‘খেতে দে’ এই জাতীয় কিছু আওয়াজ শোনা যায়। বিচ্ছিন্ন সেসব আওয়াজ বরং করুণা দেখানোর নামে ওদের বাতিল করার ঘোষণাই যেন।

ওদের সম্মান নিয়ে একটা গল্প বলি। আমাদের পরিচিত এক বয়স্ক মানুষকে সব জায়গায় খুব খাতির করা হতো। কিন্তু তিনি কিছু বলতে গেলেই লোকজন বলে, ‘আরে চাচা, আপনি এত বড় মানুষ। এই সব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আপনি কেন কথা বলবেন। আমরা দেখছি। এই চাচাকে চা খেতে দে।’

চাচাকে প্রচুর চা খেতে হতো। খেয়ে খেয়ে ডায়াবেটিস বাড়ত। একদিন শেষে প্রতিবাদ করলেন। কেউ একজন ‘এই চাচাকে চা দে’ বলতেই চিৎকার করে উঠলেন, ‘আজকে চা না। আজ কথা হবে ।’

সবাই একটু অবাক।

কথা শুরু করেই কেঁদে দিলেন। ‘বুড়োরা তোমাদের সালাম-আদাব চায় না। চায় একটু সঙ্গ। একটু কথা বলা। একটু কথা বলার সুযোগ, একটু শোনার মানুষ যে কী দরকার...।’

আজও মানুষটার করুণ আর্তি কানে ভাসে আর কেমন যেন অসহায় বোধ করি।

মনটা খারাপ হয়ে গেল! ভালো করতে একটা কৌতুক বলি। বয়স্ক মানুষদের নিয়েই। পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠানে গেলে বয়স্ক মানুষদের খোঁজখবর সবাই করে। তো তেমনি এক আয়োজনে সবাই জানতে চাইছে, ‘আপনি কেমন আছেন? শরীর ভালো তো।’

তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘খুব আনন্দে আছি। শত্রুরা সব শেষ।’

‘শত্রুরা শেষ? কিভাবে?’ একটু অবাক প্রশ্নকারীরা।

‘সব মরে সাফ হয়ে গেছে। কেউ আর বেঁচে নেই।’

বুড়ো হলে এটা একটা সুবিধা। শত্রু আর থাকে না খুব একটা। এখন অবশ্য দেখা যাচ্ছে, পাশে দাঁড়ানোর বন্ধুও থাকে না কেউ।

 

লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 



সাতদিনের সেরা