kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

ধরিত্রী পুনরুদ্ধার ও বিশ্বনেতৃত্বের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন

বিধান চন্দ্র দাস

২২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধরিত্রী পুনরুদ্ধার ও বিশ্বনেতৃত্বের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন

মাতা ধরিত্রীর বুকে সর্বনাশা মহামারির প্রবল তাণ্ডব চলছে। বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন আর বাস্তুতাত্ত্বিক অবনয়নজনিত অভিঘাত সহায়তায় কভিড-১৯ রীতিমতো সংহার মূর্তি ধারণ করেছে। জাতি-ধম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুঃসময়। উষ্ণায়ন, বাস্তুতাত্ত্বিক অবনয়ন আর কভিড-১৯-এর ত্রিমুখী ঝঞ্ঝায় মাতা ধরিত্রীর অবস্থা আজ টালমাটাল হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির প্রতিশোধ বিষয়টি মগজ থেকে আমরা একপ্রকার বের করেই দিয়েছিলাম। দিনের পর দিন ধরে পরিবেশের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছি। সুখ সুখ নামক খেলায় আমরা মত্ত হয়ে উঠেছিলাম। কভিড-১৯ আমাদের চৈতন্যে চাবুক মেরে দেখিয়ে দিল প্রকৃতি আর পরিবেশ বিরুদ্ধতার পরিণাম। এই মহামারি আগামী দিনে আরো বড় কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস—এই সতর্কবার্তা বুঝতে ব্যর্থ হলে ধরিত্রীর বুকে মানুষের অস্তিত্ব এক চরম সংকটে উপনীত হবে। জাতিসংঘ বলছে, প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ আত্মহত্যারই নামান্তর।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রতিবেদনে (২০২০) বিগত দশকটি মানব ইতিহাসের উষ্ণতম দশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমুদ্রের উষ্ণতা পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলা অব্যাহত আছে। বছরে এর পরিমাণ পৌনে ৩০০ গিগাটনেরও বেশি। বরফঢাকা অঞ্চলগুলোর পার্মাফ্রস্ট (বরফ দ্বারা আবদ্ধ মাটি, শিলা, বালু ও অন্যান্য পদার্থ) গলে যাওয়ার কারণে সেসব জায়গার উদ্ভিদ তথা জৈবপদার্থ উন্মুক্ত হচ্ছে ও সেসব পচে গিয়ে বিপুল পরিমাণ শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেন তৈরি হচ্ছে। ধ্বংসাত্মক দাবানল, বন্যা, সাইক্লোন এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। কভিড-১৯ লকডাউনের মধ্যেও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন মাত্রা আগের মতোই বেড়ে চলেছে। বলা হচ্ছে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে মানবপ্রজাতির জন্য অপেক্ষা করছে ভয়ংকর এক পরিণতি।

এ রকম একটি অবস্থায় এ বছর ধরিত্রী দিবসের (২২ এপ্রিল) প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘আমাদের ধরিত্রী পুনরুদ্ধার করি’ (Restore Our Earth) । এই প্রতিপাদ্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা জাতিসংঘের মহাসচিবের কিছুদিন আগে দেওয়া এক বক্তৃতা (ডিসেম্বরে ২০২০) স্মরণ করলে বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, ‘জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। ১০ লাখ প্রজাতি এখন অবলুপ্তির প্রহর গুনছে। আমাদের চোখের সামনে বাস্তুতন্ত্র হয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য। মরুভূমির বিস্তার ঘটছে। জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর আমরা এক কোটি হেক্টর বন হারাচ্ছি। অতি আহরণে সমুদ্রের মত্স্যভাণ্ডারে সৃষ্টি হয়েছে প্রচণ্ড চাপ। প্লাস্টিক দূষণে সমুদ্রের দম বন্ধ হয়ে আসছে। মূল্যবান প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বায়ু ও পানিদূষণে বছরে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা বর্তমান মহামারির মৃত্যুর চেয়ে ছয় গুণ বেশি। মানুষ ও গবাদি পশু, বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে ঢুকে পড়ছে। বন্য প্রাণীর ভাইরাস কিংবা অন্যান্য রোগজীবাণুতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।’ সন্দেহ নেই এসব তথ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে মাতা ধরিত্রী কেমন আছে। ধরিত্রী দিবসের বার্তায় জাতিসংঘের মহাসচিব করোনাভাইরাস ও জলবায়ু পরিবর্তন উভয়ের বিরুদ্ধে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

মানবপ্রজাতির অস্তিত্বের জন্য ধরিত্রীকে তার আগের স্বাস্থ্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক পদ্ধতি (বৃক্ষরোপণ), বিকাশমান সবুজ প্রযুক্তি (সৌরবিদ্যুৎ) ও সৃজনশীল চিন্তার (বাতাসচালিত যন্ত্রে বাতাস বিশুদ্ধকরণ) মাধ্যমে ধরিত্রী পুনরুদ্ধার এখনো সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবেলায় প্রশমন ও অভিযোজন ছাড়াও প্রাকৃতিক পদ্ধতি, সবুজ প্রযুক্তি ও সৃজনশীল চিন্তা কার্যকর বলে প্রমাণিত।

 বর্জ্য থেকে দূষণের কারণে জীববৈচিত্র্য তথা পরিবেশ হুমকির মধ্যে পড়েছে। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত উৎপাদিত প্লাস্টিকের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রাকৃতিক পরিবেশে পড়ে থেকে পরিবেশের ক্ষতি করছে। পৃথিবীতে ২০০ কোটি মানুষ বর্জ্য দূরীকরণ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। গৃহস্থালি বর্জ্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পোড়ানোর ফলে বছরে প্রায় তিন লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। ধরিত্রীর বুকে তার আগের স্বাস্থ্যকর পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের ‘পরিষ্করণ দর্শন’ মেনে চলা প্রয়োজন।

এবারের এই ধরিত্রী দিবসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশসহ ৪০টি দেশের সরকারপ্রধানদের নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে দুই দিনব্যাপী (২২-২৩ এপ্রিল ২০২১) একটি ভার্চুয়াল সম্মেলন (লিডারস ক্লাইমেট সামিট) উদ্বোধন করছেন। বাইডেন নির্বাচনী প্রচারে কথা দিয়েছিলেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে বিশ্বনেতাদের নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে শীর্ষ সম্মেলন করবেন। তিনি তাঁর সেই প্রতিশ্রুতি পালন করছেন। এটি বাইডেনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হলেও জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলা তথা ধরিত্রী রক্ষায় সম্মেলনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ধরিত্রী দিবসে শুরু হওয়া এই সম্মেলনের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ হ্রাস ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে দেড় ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি না হওয়ার উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে বলে বাইডেন প্রশাসন আশা করছে। কার্বন নিঃসরণ হ্রাসজনিত কর্মকাণ্ডে কর্মসংস্থান, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাত মোকাবেলায় অভিযোজন ও সহনশীলতা তৈরি, প্রকৃতিনির্ভর সমাধান ও রূপান্তরক্ষম প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদানমূলক কর্মসূচির বিষয়গুলো প্রধানত সম্মেলনে আলোচনা হবে। উল্লেখ্য, যে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ৪০টি দেশের মধ্যে উচ্চ অর্থনীতির দেশের সংখ্যা ১৭ এবং এই দেশগুলোই বিশ্বে ৮০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর নেতারাও এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছেন। বলা হচ্ছে, বাইডেন প্রশাসন আয়োজিত এই ভার্চুয়াল সম্মেলনটি আগামী নভেম্বরে (২০২১) অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-২৬) মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। প্রকৃতপক্ষে এই সম্মেলনের মাধ্যমে জলবায়ু কূটনীতির মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন হবে। মাতা ধরিত্রী পুনরুদ্ধারে এর প্রয়োজন ছিল।

তবে এই সম্মেলন থেকে ফলাফল পাওয়ার জন্য চারটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া দরকার। এগুলো হচ্ছে : ১. যুক্তরাষ্ট্রকে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অর্ধেক করা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অর্থায়ন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি প্রদান, ২. উচ্চ অর্থনীতির দেশগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার পর্যায়ক্রমিক সাল ঠিক করা, ৩. উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থ দ্রুত প্রদান করা ও গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপাদনকারী শিল্প-কারখানায় অর্থায়ন বন্ধ করা, ৪. কভিড-১৯ জনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি সবুজ অর্থনীতির মাধ্যমে পূরণের প্রতিশ্রুতি প্রদান। সম্মেলনে এই চারটি বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসা প্রয়োজন। আশা করা যায়, বাইডেন প্রশাসন আয়োজিত এই সম্মেলন জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলায় বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করবে।

ধরিত্রীকে তার আগের ভারসাম্যময় অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারলে অনাগত বহু সমস্যাকে আমরা জয় করতে পারব। তবে এ জন্য দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও কিছু দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সাশ্রয়, জীবাশ্ম জ্বালানির কম ব্যবহার, পানি ও খাদ্যের অপচয় বন্ধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা, বৃষ্টির পানি ব্যবহার, ভূমি ও জলাশয় দখলের মানসিকতা পরিত্যাগ, যেখানে-সেখানে স্থাপনা তৈরি না করা, দূষণ ঘটানো থেকে নিবৃত্ত হওয়া, বৃক্ষরোপণসহ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজ করার মাধ্যমে ধরিত্রী রক্ষায় ব্যক্তি পর্যায়ে আমরা অবদান রাখতে পারি।

 

লেখক : অধ্যাপক, কনজারভেশন বায়োলজি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ রিসার্চ ইউনিট

প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়