kalerkantho

রবিবার । ২৬ বৈশাখ ১৪২৮। ৯ মে ২০২১। ২৬ রমজান ১৪৪২

ভ্যাকসিনগুলো নীরবে কাজ করছে

স্টিফেন বুরানি

২১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সংবাদপত্র পড়ে এমন বিশ্বাস সহজেই জন্ম নিতে পারে যে মহামারি কখনোই শেষ হবে না। এমনকি শরৎকালে যখন ভ্যাকসিন সম্পর্কে সুসংবাদ আসতে শুরু করে, তখনো এ ধরনের ভয়াবহ কথাবার্তা শক্তিশালী হতে থাকে। গত মাসেও এমন খবর আপনি পড়ে থাকতে পারেন যে ‘পাঁচ কারণে হার্ড ইমিউনিটি প্রায় অসম্ভব’, এমনকি যদি ব্যাপক আকারেও টিকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভারতে করোনার ‘ডাবল মিউট্যান্ট ভেরিয়েন্ট’ (ভিন্ন দুটি ধরন থেকে সৃষ্ট তৃতীয় ধরন) অথবা ক্যালিফোর্নিয়ার সম্ভাব্য ‘মিউটেশন অদল-বদলের’ মতো কিছু শ্বাসরুদ্ধকর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এসব দেখে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ‘স্থায়ী মহামারি’র জন্য প্রস্তুত হোন।

আমার পরিচিত অনেক লোকের মধ্যেও এক ধরনের ‘নিম্নস্তরের সর্বনাশ’ ঘটছে। তারা মনে করে যে ভ্যাকসিনগুলো শুধুই আশার আলো, শুধুই অল্প সময়ের জন্য ভাইরাসটিকে আটকে রাখবে, সর্বদা চতুর ভেরিয়েন্টগুলোর আক্রমণের দ্বারা ক্লান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের চারপাশে ঘোরাফেরা করবে এবং এর মাধ্যমে সম্ভবত চিরস্থায়ী হয়ে উঠবে। তারা মনে করে পরিস্থিতি শুধু একটু উন্নত হতে পারে, টেকসই নয়।

যা হোক, এ ধরনের অশুভ কথা এবং ভ্যাকসিন কর্মসূচির পথে সম্ভাব্য বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও আমি এখনো আশাবাদী রয়ে গেছি। গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে আমি বিশ্বাস করেছি যে অত্যন্ত শক্তিশালী ভ্যাকসিনগুলো মহামারির অবসান ঘটাতে যাচ্ছে। এগুলো হয় রোগটিকে প্রায় বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাবে, না হয় তার শক্তি ও ছড়িয়ে পড়াকে এতটাই সীমাবদ্ধ করবে যে অনেকটা হাম বা মাম্পসের মতো নিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে পড়বে। প্রকৃতপক্ষে আমি মনে করি, এটি পরিষ্কারভাবে তখনই ঘটবে, যখন আমরা সবাইকে অর্থাৎ শুধু ধনীদের নয়, বিশ্বের সবাইকে টিকা দিতে পারব।

এই আশাবাদের পথে বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে চলছে। আমাদের কাছে যে টিকা আছে, তা খুব ভালো না হলেও এ পর্যন্ত তৈরি হওয়া সবচেয়ে কার্যকর টিকাগুলোর মধ্যেই এগুলো রয়েছে। বাস্তবিক পরিস্থিতিতে টিকাগুলোকে শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত যে ফলাফল দেখা গেছে, তাতে এর সুরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হবে। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে সেখানে ব্যবহৃত এমআরএনএ ভ্যাকসিনগুলো কার্যকরভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করেছে। যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, টিকা দেওয়া লোকদের থেকে সামগ্রিকভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা কম। এই মুহূর্তে মহামারি দমিয়ে রাখতে আমাদের ঠিক এটাই প্রয়োজন। সুতরাং ভ্যাকসিন শুধু রক্ষাই করে না, আসলে ভাইরাসের সংক্রমণ ও ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করে দেয়।

যখন নতুন ভেরিয়েন্ট (ধরন) আসে, তখন পরিষ্কারভাবেই কিছুটা বেশি সংক্রামক ও প্রাণঘাতী হয়। আবার এটি সত্য যে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনগুলোর সঙ্গে নতুন ধরনগুলোর মিথস্ক্রিয়ার বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি। একটি গবেষণা বলছে যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন দক্ষিণ আফ্রিকান ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে কম শক্তিশালী হতে পারে; কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মত, ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত ঠিক লাইনেই আছে। আর ভেরিয়েন্টগুলো যদি নিজেদের রূপান্তরে আরো অগ্রসর হয়, তাহলে ভ্যাকসিনগুলোকেও আরো উন্নত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কয়েক দশক ধরে বেশির ভাগ ভাইরাসই ভ্যাকসিন সুরক্ষাকে এড়িয়ে যেতে পারেনি। তবে গল্পগুলো যে অনিবার্যভাবেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বিপজ্জনক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়, তাতে কোনো ভুল নেই। মহামারির অবসানে স্পষ্টতই অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে।

চলমান মহামারি নিয়ে জনমত প্রকাশ কখনো কখনো একটি মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের মধ্যে পড়ে আছে বলে মনে হয়। সত্যটি হলো আমরা এখন যে বিজ্ঞানকে দেখছি, তা নিজেই অনিশ্চিত। এটি কয়েক বছরের নির্দিষ্ট অধ্যয়ন প্রক্রিয়া নয়, যা প্রায় নিশ্চিত জবাব এনে দেবে। আমরা এখনো সবাই বৈজ্ঞানিক পর্দার আড়ালে ঘুরছি। কী হচ্ছে তার জন্য বিজ্ঞানের দিকে তাকিয়ে আছি, সেটি অনুমান ও পূর্বানুমানে অসম্পূর্ণ ও চলমান অধ্যয়নে।

আমাদের সামনে অনিশ্চয়তার দুটি বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে। ভ্যাকসিনগুলো কার্যকরভাবে সংক্রমণ বন্ধ করবে কি না, তা আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না। যদিও এ বিষয়ে আমাদের কাছে কিছু ইঙ্গিত রয়েছে যে এটি ভালো করছে এবং চূড়ান্ত জবাব সামনের দিনগুলোতে আসছে। আরেকটি হচ্ছে আমরা জানি না, আরো কী কী ভয়ানক ভেরিয়েন্টের আবির্ভাব ঘটতে পারে। তবে এটি সত্য যে ভেরিয়েন্টগুলো পূর্বনির্ধারিত এমন কিছু ‘ইমিউনোলজিক্যাল অ্যান্টিম্যাটার’ নয় যে ভ্যাকসিনগুলোকে হঠাৎ উড়িয়ে দেবে।

এভাবে দেখা গেছে, সম্ভাবনাগুলো এতটা ভয়াবহ দেখাচ্ছে না। মহামারির প্রথম দিকে আমাদের কিছুই ছিল না, ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের সময়সীমা এবং তারা কাজ করবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এমন ছোট আশঙ্কাও ছিল যে টিকাগুলো কয়েক বছর সময় নেবে অথবা তারা ব্যর্থ হবে। তখন পরিপ্রেক্ষিত ছিল ভাইরাস কতটা খারাপ হতে পারে। আর এখনকার পরিপ্রেক্ষিত হচ্ছে ভ্যাকসিনে ভাইরাস শুধুই তার যাত্রা বিলম্বিত করতে পারে।

 

লেখক : বিজ্ঞান এবং পরিবেশ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা