kalerkantho

বুধবার । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৯ মে ২০২১। ৬ শাওয়াল ১৪৪

দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বদলে দিচ্ছে ই-কমার্স

সৈয়দ মোস্তাহিদল হক

২১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বদলে দিচ্ছে ই-কমার্স

আজ আপনি যে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন, যে গাড়িতে চেপে অফিসে যাচ্ছেন কিংবা যে টেলিভিশনে ম্যাচ দেখে সময় কাটাচ্ছেন, কয়েক মাস বা বছর পর তার আবেদন আপনার কাছে আর একই রকম থাকবে না। মোবাইল, গাড়ি বা টিভির মতো আমাদের জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হতে থাকে। দিনের শুরুতে খবরের কাগজের শিরোনামে কখনোই পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, সামাজিক মাধ্যমে একই হ্যাশট্যাগ মাসের পর মাস দেখতে পাওয়া যাবে না, এই সাধারণ, সাবলীল প্রক্রিয়াটিই যেন আমাদের ছকে বাঁধা জীবনকে একঘেয়েমি থেকে দূরে রাখে।   

জীবনকে আরো সহজ ও উপভোগ্য করে তোলার ইচ্ছা একটি সহজাত প্রবৃত্তি, যেমনটি আমরা দেখতে পাই আব্রাহাম মাসলোর চাহিদা-সোপান তত্ত্বে। এই প্রবৃত্তিই বেশির ভাগ মানুষকে পরিশ্রমী হয়ে উঠতে আগ্রহী করে তোলে, গতকালকের চেয়ে আজকের অবস্থাকে আরেকটু উন্নত করার চেষ্টায় অবিরত রাখে। কিন্তু গোলমালটা বাধে তখনই, যখন আমরা ‘উন্নত’ কিংবা ‘আগের চেয়ে ভালো’—এই কথাগুলো অতি সরল করে ফেলি। কিছু উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট করা যেতে পারে।

আমরা যারা মাঝবয়সের কোঠা পেরিয়েছি, তাদের শৈশব-কৈশোরে মা-বাবার মুখে খুব পরিচিত একটি কথা ছিল—‘তোমার বয়সে আমি...।’ এই কথাগুলো আমাদের তখন মনে হতো ক্লাসের লেকচার, যা শুনলে মনে মনে বলে চলতাম, ‘সেই দিন কি আর আছে?’ মজার কথা হলো, এখন যখন আমরা নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের কাছে বছরে একবার কি দুইবার পরীক্ষায় ভালো ফল করলে চায়নিজ রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া কিংবা হাতখরচের টাকা জমিয়ে নতুন সিনেমা দেখতে যাওয়ার গল্প করি, তারাও আমাদের একই কথা বলে। হাতের নাগালে শপিং কিংবা ফুড ডেলিভারি অ্যাপ আর স্মার্টফোনে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি সিনেমা নিয়ে বসে থাকা তরুণদের মুখে আমাদের সেই মন্থর, স্থিতিময় জীবন প্রসঙ্গে মন্তব্য একটাই—‘সেই দিন কি আর আছে?’

সময়ের এই গতিময়তা, এই প্রাচুর্যই সম্ভবত আমাদের ‘উন্নত’ করে, ‘আগের চেয়ে ভালো’ রাখে। নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়। তাই এখন যখন করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ঘরে বসেই কোরবানির গরু কেনার সুযোগ তৈরি হয়ে যায়, আমি অবাক হই না। বরং আমার মনে হয়, এটাই স্বাভাবিক, এটাই প্রমাণ করে যে আমরা এক জায়গায় বসে নেই। এই পরিবর্তন একটি ভবিষ্যত্মুখী প্রক্রিয়া, যার একটি সর্বময় বিস্তৃত প্রভাব আমরা লক্ষ করি, অনুভব করতে পারি। এই পরিবর্তনের হাওয়া যখন ব্যক্তির জীবনের পালে লাগে, তার বেগে একসময় অবধারিতভাবেই বেগবান হয়ে ওঠে সমাজ ও রাষ্ট্র।

দেশের ই-কমার্স খাতের কথাই চিন্তা করুন। গত এক দশকে ওয়েবভিত্তিক ব্যবসাগুলো যতটা সাফল্য ও সম্ভাবনার সন্ধান পেয়েছে, অতীতে কখনোই তা দেখা যায়নি। দেশের শীর্ষ পর্যায়ের অনলাইন মার্কেটপ্লেসের সঙ্গে পেশাগতভাবে জড়িত থাকার সুবাদে বর্তমান ই-কমার্স খাতের খুঁটিনাটি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বলা বাহুল্য, এই কাজটি করতে গিয়ে গত কয়েক বছরে আমি বারবার অবাক হতে বাধ্য হয়েছি। দেশের বাজার পরিস্থিতি ও ভোক্তাসাধারণের পরিবর্তনশীল ক্রয়-অভ্যাস আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন করে ভাবাচ্ছে। আমি ও আমার সহকর্মীদের নিয়ে দারাজ বাংলাদেশের গোটা পরিবার প্রতিনিয়ত নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে চলেছে এবং আমি নিশ্চিত, এই খেলায় আমরাই একমাত্র খেলোয়াড় নই। আর যেহেতু যেকোনো পরিবর্তন বা রূপান্তরপ্রক্রিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং দিক হচ্ছে সম্ভবত এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনির্দেশ্য বিষয়গুলো। আমার বিশ্বাস, ই-কমার্স খাতে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারা এ ক্ষেত্রে পুরস্কারের চেয়ে পরীক্ষার অংশটিকেই বেশি উপভোগ করছে!

ঈদুল ফিতর আসন্ন। বছরজুড়ে কোনো না কোনো বিশেষ উপলক্ষ বাজারে ক্রেতাদের ক্রয়ের মানসিকতাকে জাগিয়ে রাখছে। এদিকে ই-কমার্স খাতে নবজোয়ারের ফলস্বরূপ ক্রেতাদের জন্য আগের তুলনায় কেনাকাটা করার মাধ্যম এখন বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে টিকে থাকার দৌড়ে বিক্রেতারা দিচ্ছে বিশেষ ছাড়। ‘সুফল’ ভোগ করছেন কারা? আমাদের গ্রাহকরাই।

আজ বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে যে প্রবৃদ্ধির রেখা ফুটে উঠছে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করছে—এ অবস্থায় সবাইকেই বলা যেতে পারে বিজেতা। জার্মান পরিসংখ্যান পোর্টাল স্ট্যাটিস্টার মতে, চলতি বছরে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের আকার ফুলেফেঁপে দাঁড়াবে ১৯৫ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি, যা টাকার হিসাবে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সাল নাগাদ এ খাতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ২৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ই-কমার্স বাণিজ্যের বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে ৪৬তম অবস্থানে। দ্রুতগতির ইন্টারনেটের প্রসারে শহুরে আধুনিকতার সীমা অতিক্রম করে ই-কমার্সের ছোঁয়া এখন লেগে গেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও। ফলে ব্যবসায় প্রতিভার জোরে দূরত্বের বাধা কাটিয়ে এখন লাভের মুখ দেখছেন দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, যাঁরা এত দিন শুধু ইট-কাঠের শহরে মাথা গোঁজার সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে ছিলেন। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সিস্টেম (এমএফএস) ও অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা, দেশে ই-কমার্স খাতে উন্নয়নের পেছনে যার রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আমাদের ব্যাংকগুলোও ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যায় ইতিবাচক অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছে, যা সমসাময়িক পুঁজিবাজারকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবর্তনের হাওয়ায় ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার সবচেয়ে জোরালো কিছু উদাহরণ সম্ভবত ই-কমার্সের হাত ধরেই সৃষ্টি হয়েছে। গাড়ি, মোটরসাইকেল বা সাইকেল চালিয়ে তরুণরা পৌঁছে দিচ্ছেন যাত্রী, খাবার কিংবা পার্সেল। যানজটের শহরে চাপ কমছে গণপরিবহনের ওপর, বাঁচছে মূল্যবান সময়, দুই বেলার অন্নসংস্থান হচ্ছে কর্মসংস্থানহীন এক যুবকের। অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে গৃহস্থালির কাজে সহায়তা করার কর্মী, ভারী মালপত্র পৌঁছে দিতে আঙুলের ছোঁয়াতেই মিলছে ট্রাক বা পিকআপ। এ ছাড়া করোনা মহামারির প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ঘরে বসে পেয়েছি অ্যাপভিত্তিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য-পরামর্শ লাভের সুবিধা। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও আমাদের সন্তানরা বিভিন্ন ওয়েব বেইসড ক্লাসরুমে নিজেদের মানসিক বিকাশ অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে।

দেশের বাজারকে অকল্পনীয় রূপে সম্প্রসারিত করে ই-কমার্স প্রমাণ করেছে, সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা থাকলে যে কারোর পক্ষেই ব্যাবসায়িক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। আজ রাজধানীর আধুনিকতম এলাকার জমকালো ফ্যাশন হাউসটি প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য হচ্ছে দূর মফস্বলের এক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্বল্প পুঁজির বুটিকের সঙ্গে। কেননা পণ্যের গুণগত মানের ক্ষেত্রে আপস না করায় তারা সমানে সমান। এক বেলা ভাত-ডাল না খেয়ে আজ যদি আপনার ইচ্ছা হয় নামি কোনো রেস্টুরেন্টের পিত্জা চেখে দেখতে, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন কোনো না কোনো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম আপনাকে ঠিকই আপনার পছন্দসই খাবারটি পৌঁছে দেবে। আর যখন আপনি সেই খাবারটির জন্য অপেক্ষা করছেন, কোনো এক ডেলিভারিম্যানের মুখে আপনি হাসি ফোটাচ্ছেন। কেননা আপনার এই অংশগ্রহণ তাকে করে তুলছে স্বাবলম্বী। ই-কমার্স একই সুতায় আমাদের সবাইকে জড়িয়ে ফেলছে, যার শেষ প্রান্তে আছে দিনবদলের আশ্বাস। আর এই আশ্বাসই আমাদের আত্মবিশ্বাসের জায়গা তৈরি করেছে, যার ভরসায় আমরা এখন বলতে পারি—‘সেই দিন আর নেই!’

 

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দারাজ বাংলাদেশ

 



সাতদিনের সেরা