kalerkantho

রবিবার । ২৬ বৈশাখ ১৪২৮। ৯ মে ২০২১। ২৬ রমজান ১৪৪২

সাম্প্রদায়িক অপশক্তি পরাজিত হবে

আলী হাবিব

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সাম্প্রদায়িক অপশক্তি পরাজিত হবে

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন করল কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। গণপরিষদে সংবিধানের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।’ ১৯৭২ সালের সেই সংবিধানে রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র হবে, রাষ্ট্রের স্তম্ভ কোনো ধর্মীয় কাঠামো দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হবে না। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। সকল ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি এই যে ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।...পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না।’

কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাম্প্রদায়িক শক্তি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। পাকিস্তানপন্থী জামায়াত-বিএনপি, এমনকি প্রগতিশীলতার দাবিদার অনেক সংগঠনও এই চিহ্নিত সাম্প্রদায়িক শক্তির সহযোগী হিসেবে রাজনীতির মাঠে অবতীর্ণ।

হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশে কক্সবাজারের রামুতে ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর। বৌদ্ধমন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বৌদ্ধদের বাড়িঘরেও হামলা চালানো হয় তখন। ফেসবুকে কথিত একটি ইসলামবিদ্বেষী ছবি পোস্ট করার অভিযোগে নাসিরনগরে হিন্দুদের মন্দির ও বহু বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছিল ২০১৬ সালে। এর ঠিক এক বছরের মাথায় ২০১৭ সালে রংপুরের গঙ্গাচড়ায়ও ঘটে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা। অতি সম্প্রতি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় কয়েক শ মানুষ। হামলাকারীরা অন্তত ৮৮টি বাড়িঘর এবং সাত-আটটি পারিবারিক মন্দিরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।

এরপর চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা নিঃসন্দেহে আমাদের আতঙ্কিত করে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে থানা ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা হামলা চালিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হামলা চালিয়ে রেলওয়ে স্টেশন, জেলা পরিষদ ভবন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের বাসভবন, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়।

এসব ঘটনা থেকে প্রগতিবাদী সচেতন যেকোনো মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবে, এই কি আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ? এই বাংলাদেশের জন্যই কি শহীদদের আত্মত্যাগ? মা-বোনের সম্ভ্রমহানির এই কি মূল্য? স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমাদের অর্জন কী? বাংলাদেশ কি পথ হারাল?   

না, বাংলাদেশ পথ হারায়নি, হারাবে না। সেই বিশ্বাস আশাবাদ ফুটে উঠছে বিশ্বনেতৃত্বের উচ্চারণেও। সেই গত ১৭ মার্চ জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত ১০ দিনের ‘মুজিব চিরন্তন’ অনুষ্ঠানমালায় সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান। কভিড পরিস্থিতিতে আসতে পারেননি, এমন অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান পাঠিয়েছিলেন ভিডিও বার্তা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং তাঁর ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দারুণ কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হয়েছে এবং দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্বের কাতারে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে। ৬ শতাংশের অধিক জিডিপির মাধ্যমে বাংলাদেশ তার দেশের মানুষের জীবনকে উন্নত করছে এবং বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।’ ভিডিও বার্তায় কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ উচ্চ মাত্রার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে। এসব চমকপ্রদ সাফল্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ বছর জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সব যোগ্যতা অর্জন করেছে।’ ভারতের কংগ্রেস পার্টির বর্তমান প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, ‘৫০ বছর আগে বাংলাদেশের সাহসী জনগণ এই উপমহাদেশের ইতিহাস ও ভূগোলের রূপান্তর ঘটিয়েছিল। গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অর্জন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং এটি বিশ্বের স্বীকৃতি পেয়েছে।’ ৫০ বছর পূর্তিতে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বদলে যাওয়ার চিত্রই ধরা পড়ছে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর চোখে। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘গত ৫০ বছরে এ দেশ ব্যাপক উন্নতি করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’ জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগাও তাঁর ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন।

শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে ঢাকায় এসে বলে গেলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের যে সাফল্য ও অগ্রগতি দেখাচ্ছেন, তা তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য সবচেয়ে সম্মানের বিষয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। গত ৫০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের জনগণের অনুপ্রেরণামূলক অগ্রগতি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হওয়ার পথে অগ্রসর হওয়ার নিদর্শন।’ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, উন্নয়ন ও জনগণের জীবন-মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে এবার অনেক অগ্রগতি চোখে পড়ছে নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যাদেবী ভাণ্ডারীর। ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন পূর্বাভাস আরো চমৎকার। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল।’ এমন কথা উচ্চারিত হয়েছে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিংয়ের মুখ থেকে। অনুষ্ঠানমালার শেষ দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বে তার সক্ষমতা প্রদর্শন করছে।’

এই সক্ষমতার বিষয়ে নিঃসন্দেহ থেকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বিক সতর্কতার বিষয়ে দেশের মানুষকে সচেতন করতে চান। ‘মুজিব চিরন্তন’ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি তাই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করে দেশকে এগিয়ে নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তি এখনো দেশে-বিদেশে সক্রিয় রয়েছে। তারা নানা অপতৎপরতার মাধ্যমে আমাদের অর্জনকে নস্যাৎ করতে চায়।’

নানা প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে সমাপনী দিনের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে তাঁর সরকার।

১২ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আর্থ-সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে উল্লেখ করে গত ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভেতরে-বাইরে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে নানা অপতৎপরতা চালিয়েছে। সে প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত আছে।

অপশক্তির সব অপতৎপরতা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। তার প্রমাণ হেফাজত নেতাদের একের পর এক গ্রেপ্তার। তাঁদের কাউকে কাউকে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে।

সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।  এমন শক্ত অবস্থানই কাম্য। এতেও প্রমাণিত হয়, কখনো পথ হারাবে না বাংলাদেশ। আর একেবারে সামনে থেকে দেশের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বে তার সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্বের কাতারে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে। নেতৃত্বে তিনি আছেন বলেই পথ হারাবে না অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে পরাজিত করে এগিয়ে যাবে উদারনৈতিক কল্যাণের পথে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]



সাতদিনের সেরা