kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে’

আব্দুল বায়েস

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে’

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের শুভ জন্মদিন আজ। শুভ জন্মদিনের মহতী এই মুহূর্তে আমরা তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাই। হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ স্যার।

১৯৪২ সালের ১৮ এপ্রিল হবিগঞ্জের রতনপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তারপর সিলেট এমসি কলেজ হয়ে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা অর্থনীতি অধ্যয়নের জন্য। দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণের প্রতিটি পয়েন্টে তিনি তাঁর মেধা বা প্রতিভা-প্রযুক্তি চিত্তাকর্ষক ফলাফল উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন শুধু যে মেধাবী মানুষ তা কিন্তু নন, কারণ মেধাবী বলেই কেউ ‘মানুষ’ হয় না, মানবতাবোধ সর্বদা বিরাজ করত তাঁর পরানের গহিন ভেতরে। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন শেষে বিদেশে থেকে যাওয়ার প্রচুর সুযোগ থাকার পরও কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন স্বপ্নপূরণের অঙ্গীকারবোধ থেকে।

পরবর্তীকালে মানবতাবোধ, মেধা ও মননে সিদ্ধ এই মানুষটি প্রশাসক, শিক্ষক এবং সংগঠক হিসেবে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেছেন। করেছেন বলছি কেন, এই বয়সেও করে চলেছেন।

দুই.

তাঁর ভাগ্য ভালো যে কর্মজীবনের প্রায় শুরুতেই এক স্বপ্নদ্রষ্টার খুব কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। সমুদ্রের বিশালতা বুঝতে গেলে যেমন সমুদ্রের কাছাকাছি যেতে হয়, তেমনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুব কাছে থেকে তিনি বুঝেছেন মহান ওই মানুষটির মনের বিশালতা। অতি কাছ থেকে জানতে পেরেছেন জাতির পিতার স্বপ্নের কথা। সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করা ছিল ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের জীবনের এক স্বর্ণসৌভাগ্য, জীবন পঞ্জিকায় এক সোনালি অধ্যায়। ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন আর তাঁকে দেখেছেন বলেই তিনি জাতির পিতার চিন্তা ও চেতনার প্রতি অতটা নিষ্ঠার সঙ্গে নিবেদিত।

তিন.

সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া পর্যন্ত সততা, নিষ্ঠা আর দক্ষতা দিয়ে সব পর্যায়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন এই মানুষটি। একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিযুক্ত হন। একদিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন! অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যে দু-একজন ভারসাম্যমূলক এ কাজটি করতে পেরেছেন তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর আমলে ব্যাংকিং খাতে স্ক্যাম হয়েছে বলে অন্তত আমার মনে পড়ছে না, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে জোরেশোরে সমালোচনার কথাও কানে আসেনি। মুদ্রাবাজার তথা ব্যাংকিং খাতে তেমন কোনো অস্থিরতা ছিল না; তাঁঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক সব প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিল।

তা ছাড়া চাকরি-পরবর্তী সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থে সরকার কর্তৃক গঠিত বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিশনের প্রধান হয়ে দক্ষতার সঙ্গে সময়মতো বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন দাখিল করে জনতার সুনাম অর্জন করেছেন, সে তদন্তের ফলাফল আলোর মুখ দেখেছিল কি না সে বিতর্কে আপাতত না-ই বা যাওয়া হলো।

চার.

তিনি দেশের উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং নিম্নমুখী মান নিয়ে প্রচুর চিন্তা-ভাবনা করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। বাংলাদেশে ব্যক্তি খাতে মানসম্মত ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার অন্যতম রূপকার তিনি। নগরীর আফতাবনগরে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সিরামিক ইটের বিশাল বিল্ডিংটি, যা এখন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাস।

দেশে-বিদেশে প্রশংসিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য আমাদের মনের মানুষ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁর ব্রেনচাইল্ড বললেও বোধ করি খুব একটা ভুল হবে না। মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন প্রথমে ছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য, পরে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ছিলেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের প্রেসিডেন্ট, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান উপদেষ্টা। নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন ইস্ট ওয়েস্টের সঙ্গে, যেমন করে মা-বাবা জড়িয়ে থাকেন সন্তানের জীবনের সঙ্গে।

পাঁচ.

৮০ ছুঁই ছুঁই ফরাসউদ্দিন এখনো পুরোদস্তুর একজন কাজপাগল মানুষ। কবির ভাষায়, ‘আমি সন্ধ্যাদীপের শিখা, অন্ধকারের ললাট—মাঝে পরানু রাজটিকা।’ তিনি ছুটিকে ছুটি দিয়েছেন বহু আগেই আর তাই আটাত্তরে দাঁড়িয়ে কখনো অর্থনীতির ক্লাসে, সরকারি তদন্ত কমিটিতে, সেমিনার-সিম্পজিয়াম কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়কে সেবা প্রদানের নিমিত্তে নিবেদিত মন-প্রাণ। বিদেশে গেলে তো কথা নেই, দেশে থাকলে প্রায় প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন, দিবসের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করেন নিবিষ্ট মনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উন্নতির সিঁড়ি খোঁজার মানসে। এই নিরন্তর সেবা প্রদানের জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেন না, শুধু প্রতীক হিসেবে এক টাকা নেন। বৃক্ষের পরিচয় যেমন ফলে, মানুষের পরিচয় তেমনি তার কর্মে। ফরাসউদ্দিন কর্মে বেঁচে থাকার পথ বেছে নিয়েছেন।

‘যা কিছু জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা,

তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা।

নিশিদিন এই জীবনের তৃষার ’পরে, ভুখের ’পরে

শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।’

 

আপনার একটা দীর্ঘ ‘উৎপাদনশীল’ জীবন কামনা করি, মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।

 

লেখক : অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক ও উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

খণ্ডকালীন শিক্ষক, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি