kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ : প্রথম সরকার গঠনের ইতিহাস

মাহবুব উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ : প্রথম সরকার গঠনের ইতিহাস

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ আমার সৌভাগ্য হয়েছিল একটা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের। সেদিন সকালে ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় এমপি জে কে এম এ আজিজ আমার কাছ থেকে একটা গাড়ি নিয়ে মাগুরা চলে যান। আগের মধ্যরাতে পদব্রজে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা থেকে মাগুরায় পৌঁছেছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই নেতা তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। তাঁরা মাগুরার এমপি সোহরাব হোসেনের বাড়িতে রাত কাটান। এরই মধ্যে মাগুরা-ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর সড়কটির দুই পাশের বড় বড় গাছ কেটে ব্যারিকেড সৃষ্টি করায় মাত্র ২০ মাইল পাড়ি দিতে সকাল ১১টা বেজে যায়। জে কে এম এ আজিজ নেতাদের গোপনে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দিতে আমাকে অনুরোধ করেন। সে মোতাবেক আমি বন্ধু তৌফিকের সহযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গ বিএসএফ প্রধান গোলক মজুমদার, চব্বিশ পরগনার বিএসএফ প্রধান কর্নেল চক্রবর্তী এবং চ্যাংখালী বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন মহাপাত্রের মাধ্যমে তাঁদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, সম্মান ও সৌহার্দ্যসহকারে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সরকারি হুডওয়ালা পুলিশ জিপ ব্যবহার করেছিলাম। ড্রাইভার ছিলেন কনস্টেবল মান্নান।

২৯ মার্চ সকাল ১১টার দিকে যখন নেতৃদ্বয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, তখন তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘বঙ্গবন্ধু কোথায় এবং কেমন আছেন?’

তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন।’

আমার মনে হয়েছিল, এ কথাটি ঠিক হয়নি। কিন্তু উচ্চবাচ্য করিনি।

২৯ তারিখ দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দুই নেতা গাড়িতে আমার সঙ্গে ছিলেন। ড্রাইভার মান্নান নীরবে গাড়ি চালাচ্ছেন। আমরা তিনজন আলাপসাগরে ডুবে ছিলাম। হাজারো কথার ফুলঝুরি এক দুর্দান্ত ব্যঞ্জনায় আমাদের তিনজনকেই ঘুমন্ত বাঙালি জাতির জেগে ওঠার দুরন্ত কাহিনির এক বিচিত্র উল্লাসে বৃত্তাবদ্ধ করেছিল। সে উল্লাসের মধ্যমণি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। আর জাতিকে জাগিয়ে তোলার তাঁর কালজয়ী ভাষণ। কেন তাঁরা নেতাকে ঢাকায় ফেলে চলে আসতে বাধ্য হলেন সে গল্প বলতে বলতে দুজনেই চোখের জলে ভাসছিলেন। বিকেল ৫টার দিকে আমরা যখন চুয়াডাঙ্গায় অপারেশন হেডকোয়ার্টার স্থানীয় জেলা পরিষদের পরিদর্শন বাংলোতে পৌঁছি তখন গোপনীয়তার প্রয়োজনে তাঁরা কেউই গাড়ি থেকে বের হননি। আমি খুব দ্রুত গিয়ে বাংলোর ভেতরে কর্মব্যস্ত মেজর ওসমানকে অফিস থেকে ডেকে আনি। এরই মধ্যে তৌফিক তার সরকারি গাড়ি নিয়ে জেলা পরিষদ বাংলোর সামনে উপস্থিত। দুজনকে আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম। তাঁরা কুশল বিনিময় করলেন। মেজর ওসমান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আমাদের প্রস্তুতির কথা তাঁদের জানালেন, ইপিআরের ৪ নম্বর উইংয়ের বিদ্রোহের কথা জানালেন, পাকিস্তানি অফিসার ও সেনা হত্যার কথা জানালেন। স্থানীয় এমপি ডক্টর আসহাবুল হকের নেতৃত্বে বেসামরিক প্রশাসন চালু করার কথা জানালেন এবং ঝিনাইদহে পুলিশের বিদ্রোহের কথাও জানালেন। ওয়্যারলেস ও রেডিও মাধ্যমে খবর এসেছে চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক জায়গায় যুদ্ধ চলছে। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর রেডিও থেকে বারবার প্রচারিত হচ্ছে—এ কথাও তাঁদের জানালেন।

আলাপ-আলোচনার পর অতিথি দুজন যত শিগগির সম্ভব ভারত সীমান্তে পৌঁছার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আমি তৈরিই ছিলাম। তৌফিকও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল। মেহেরপুর থেকে রওনা করার আগেই সীমান্তে ভারতীয় কর্মকর্তাদের দু-একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।

রাত ৯-১০টার সময় তাঁরা নিরাপদে কলকাতা রওনা হয়ে যান। এ কথা সেদিনের মতো আজও ধ্রুব সত্য। আগেই বলেছি, তাঁদের গমনাগমনের ব্যাপারটি বিএসএফের উচ্চতম পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা চরম গোপনীয়তায় রক্ষা করতে চেষ্টা করেছেন। নেতা দুজনও তাঁদের ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক নিরাপত্তার কথা ভেবে মোহাম্মদ আলী ও রহমত আলী ছদ্মনামেই চলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিলেন। এ জন্য ভারতীয় ব্যুরোক্রেসি ও সেনাবাহিনী তাঁদের সঠিকভাবে চিনতে যথেষ্ট সময় নিয়েছিল। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের ভাষায়, সেদিন আমি আর তৌফিক স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছিলাম।

যাই হোক, পথের প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা রক্ষা করে দিল্লি পৌঁছতে অনেক কষ্ট করেছেন তাঁরা। বিশেষ করে কলকাতা-দিল্লি মালবাহী উড়োজাহাজে চড়ে যাওয়ার সময় সারা রাত গরমে আর ঘামে সিদ্ধ হয়েছেন। ওই জাহাজে বসার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। সারা রাত প্লেনের দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা আর ঝাঁকুনি খেতে খেতে, জাহাজের ইঞ্জিনের বিকট শব্দে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তার ওপর ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রচেষ্টার মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে অসাধ্য সাধন করার প্রচেষ্টা। সাক্ষাতের পর সরকার গঠনের প্রচেষ্টায় শিলিগুড়ি-আগরতলা-কলকাতা-চব্বিশ পরগনা—একটা পুরনো উড়োজাহাজে চড়ে ভ্রমণ। দেশের চারদিকে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নেতাদের আস্তানা খুঁজে বের করা, তাঁদের নিরাপদে কলকাতা-দিল্লি-আগরতলা-শিলিগুড়িতে নিয়ে আসা। সরকার গঠনের আলাপ-আলোচনার বিভিন্ন স্তরে পদে পদে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হওয়া। বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্বের বাধা ও সার্বিক চাপ ডিঙিয়ে শেষ পর্যন্ত স্বাধীন সরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এরই মধ্যে কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালি জনতার অসম প্রতিরোধ লড়াইয়ে জনগণের অভাবিত অনির্বচনীয় নিরঙ্কুশ বিজয় সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। এই বিজয়কে পুঁজি করে বহির্বিশ্বে, বিশেষ করে ভারতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের প্রতি ভারতীয় জনগণ, সরকার ও রাষ্ট্রের সহানুভূতি আদায়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকে শাণিত করার ব্যবস্থায় বিশাল অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে তাঁরা বারবার ছুটে আসছেন কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে, আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সরকার গঠনের সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করতে। নির্বাচিত নেতাদের একত্র করার জন্য তাঁরা ময়মনসিংহে যাচ্ছেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের খোঁজে, আলোচনা করছেন চট্টগ্রামের এম আর সিদ্দিকীর সঙ্গে, খুঁজে বের করছেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামান সাহেবদের, আলোচনা চালাচ্ছেন ডক্টর আনিসুর রহমান, রেহমান সোবহানের সঙ্গে, কথা বলছেন বিশ্বের ডাকসাইটে সাংবাদিকদের সঙ্গে, কথা বলছেন বিভিন্ন স্তরের ভারতীয় জনসাধারণ, রাজনীতিবিদ, সরকার, ব্যুরোক্রেসি, সামরিক বাহিনী, আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে। সহানুভূতি খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সহায়তাকারী সংস্থার। খুঁজে বেড়াচ্ছেন কী করে হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষের বাঁচার ব্যবস্থা করা যায়, সহানুভূতিশীল মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। সেসব কি শুধুই কতগুলো শব্দচয়ন, নাকি আরো কিছু—এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? সে সময়কার মানসিক, দৈহিক ভাষা—এগুলো কি কেউ কোনোভাবে সঠিক চিত্রায়িত করতে পারে?

বঙ্গবন্ধুর ২৩ বছরের প্রস্তুতি, ৭ই মার্চের ডাক না জন্ম নিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ আলোর মুখ কখনোই দেখত কি না তা নিয়ে পৃথিবীর সবারই সন্দেহ আছে। আর ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি খুন, ধর্ষণ আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে যদি বাংলার জনগণ সর্বত্র ফুঁসে না উঠত; যদি বাংলার অকুতোভয় বীর সেনানীরা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অজান্তেও দীর্ঘ ৯ মাস ছোট-বড়, জানা-অজানা খণ্ড খণ্ড অসংখ্য যুদ্ধ পরিচালনা না করত, নির্দ্বিধায় জীবন উৎসর্গ না করত, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনি সংগ্রামে পর্যবসিত হতেও পারত। কলকাতার বাইরে দিল্লি, আগরতলাসহ পৃথিবীব্যাপী লন্ডন, ওয়াশিংটন, প্যারিস, নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত বাঙালি ও বাংলাপ্রেমী জনগোষ্ঠী যদি বাংলাদেশের পক্ষে পৃথিবীর জনমত সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হতো, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত মৈত্রী চুক্তি যদি না হতো, তাহলেও মুক্তিযুদ্ধ পথ হারাতে পারত। কাজেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি বিশাল কর্মকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি অথবা সংগঠন কিংবা স্থান কোনোটাই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। এখন সময় এসেছে ইতিহাস রচনার। ইতিহাস ইতিহাসের গতিতেই চলবে। কোনো বিশেষ পণ্ডিত কিংবা পাণ্ডিত্যই এই ধারাকে বিবর্ণ করতে পারবে না।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। (মূল লেখাটি পড়ুন কালের কণ্ঠ অনলাইনে)

লেখক : ১৯৭১ সালে ঝিনাইদহের এসডিপিও। ১৭ এপ্রিল তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়