kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

চেতনাঋদ্ধ এক সৃজনশীল মানুষ

এম. নজরুল ইসলাম

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চেতনাঋদ্ধ এক সৃজনশীল মানুষ

বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে অন্যতম দিকপাল তিনি। রংতুলিতেই ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের পরিচয়। রেখেছেন সৃজনশীলতার অনন্য স্বাক্ষর। শিল্পকলায় নিমগ্ন শিল্পী হাশেম খান ৭৯ পূর্ণ করে আজ ১৬ এপ্রিল পা দিয়েছেন ৮০-তে। সৃষ্টিশীল শিল্পী হাশেম খান তাঁর সৃজনশীল কর্মপ্রবাহে সমৃদ্ধ করে চলছেন চারুকলা। বাংলাদেশের চিত্রকলায় শিল্পী হাশেম খানের নিজস্বতা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। 

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খ্যাতিমান এই শিল্পী দীর্ঘ ৬২ বছর যাবৎ শিল্পচর্চায় ও সংকৃতি বিকাশে নিয়োজিত। ১৯৬৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত চারুকলা অনুষদের সফল শিক্ষক এবং তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরাই বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে শিল্পচর্চায় সুনাম অর্জন করে চলছেন।

দেশের চারুকলা বিকাশের আন্দোলনে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এবং প্রগতিশীল সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ সৃষ্টিতে তিনি নিবেদিতপ্রাণ।

তরুণ বয়সে তিনি কচি-কাঁচার মেলার মাধ্যমে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উপদেশ ও সহযোগিতায় শিশুচিত্রকলাকে সংস্কৃতিচর্চার বিষয় হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাংলাদেশে শিশুশিক্ষা ও শিশুচিত্রকলার ক্ষেত্রে শিল্পী হাশেম খানেরই অগ্রণী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে। শিশুচিত্রের সংস্কৃতি বাংলাদেশের সমাজে তিনিই প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং এই বিষয়ে গবেষণা করেছেন। শিশুপুস্তকে ছবি এঁকে শিশুপাঠকে শিশুদের কাছে আনন্দের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। এভাবে তিনি বাংলাদেশের জনগণ, যাঁরা এখন ৬০-৬৫ বছর বয়সে, তাঁদের স্কুলপাঠ্য বইয়ের চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিনিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ ও জীবনধারাকে চিনিয়েছেন। আজ শিশুচিত্রকলা বাংলাদেশে শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। তিনি এই ধারার পথিকৃৎ।

হাশেম খান ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুর অনুসারী। তিনি ষাটের দশকে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও প্রগতিশীল রাজনীতির প্রায় সব পোস্টার, ফেস্টুন, ছবি, প্রচার পুস্তিকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন। ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফার লোগো, পতাকা নকশা, পোস্টার ও অন্যান্য শিল্পকর্ম করেছেন শিল্পী হাশেম খান। ছয় দফা সর্বপ্রথম জনগণের সম্মুখে ঘোষণার জন্য তৎকালীন হোটেল ইডেনের সামনে যে মঞ্চ তৈরি হয়েছিল তার ‘ব্যাকসিনে’ ছয় দফার প্রতীকী নকশা দিয়ে সাজিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে যে ঐতিহাসিক পোস্টার ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ এই শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল, তা এঁকেছিলেন শিল্পী হাশেম খান।

বাংলাদেশের ‘সংবিধান গ্রন্থের’ প্রতি পৃষ্ঠায় চারদিক জুড়ে রয়েছে নকশা এবং ভেতরে লেখা। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের তত্ত্বাবধানে প্রধান শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন শিল্পী হাশেম খান।

বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক প্রায় ৩০০ ছবির একটি অ্যালবামের তিনি নির্বাহী সম্পাদক। ওই অ্যালবামের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা, যা ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে। ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশু গ্রন্থমালা’ সিরিজের সম্পাদকীয় বোর্ডের তিনি সভাপতি। এই সিরিজে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে বই ও ছবির অ্যালবাম মিলে মোট ২৫টি ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ওই ২৫টি বই ও ছবির অ্যালবামের নতুন সংস্করণ ১৭ মার্চ আবার প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্রের তিনটি অ্যালবামের এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের শিল্পকলা সংগ্রহ অ্যালবামের তিনি যুগ্ম সম্পাদক ও টাকা জাদুঘর বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান।

ঢাকা নগর জাদুঘরের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত স্বাধীনতাস্তম্ভের জুরি বোর্ড ও বাস্তবায়ন বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। শিল্পী হাশেম খান ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা, জাতীয় নাট্যশালা এবং জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্রের বাস্তবায়নের তিন সদস্যবিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান। তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যানও ছিলেন।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় কমিটির অন্যতম উপদেষ্টা। ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ট্রাস্টি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিল্পী হাশেম খান এখন প্রতিষ্ঠানটির কর্মপরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

শিল্পকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৯২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। ২০১১ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এ ছাড়া তিনি দেশি ও আন্তর্জাতিক বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য ১৬ বার জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০০৭ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সম্মানসূচক ফেলো মনোনীত করে। তিনবার অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

তিনি একজন সুলেখকও। এযাবৎ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ২০টি।

বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক এই প্রত্যয়দীপ্ত মানুষটি বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে ২৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৯ ফুট উঁচু বিশাল একটি ক্যানভাস শুরু করেছেন। একই সঙ্গে আঁকছেন আরো কিছু ঐতিহাসিক ঘটনাবিষয়ক ক্যানভাস। যেমন—শেখ মুজিবের ছয় দফা ঘোষণা, সোনার বাংলা শ্মশান কেন?, ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু, সবুজ বিপ্লব ১৯৭২ এবং বাকশাল ১৯৭৫ ইত্যাদি।

শিল্পী হাশেম খানের ৮০তম জন্মদিনে আমাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন। শুভ জন্মদিন হাশেম ভাই।

লেখক : সর্ব-ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী
[email protected]



সাতদিনের সেরা