kalerkantho

বুধবার । ২৮ বৈশাখ ১৪২৮। ১১ মে ২০২১। ২৮ রমজান ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

নির্বাচনে বিজেপির রাজনৈতিক ইস্যু এনআরসি

জয়ন্ত ঘোষাল

১২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নির্বাচনে বিজেপির রাজনৈতিক ইস্যু এনআরসি

ভারতের মতো একটা বিশাল দেশে এত অঙ্গরাজ্য যে সব সময়ই কোনো না কোনো রাজ্যে ভোট হতেই থাকে। বিধানসভা নির্বাচন হয়। তার পরই উপনির্বাচন এসে যায়। এখন পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামে শুধু নয়, কেরালা, পন্ডিচেরি, তামিলনাড়ুসহ মোট পাঁচটা রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে। আবার এই নির্বাচন চলতে চলতে রাজস্থানে বেশ কয়েকটা আসনে উপনির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত। কিন্তু সেই দেশের আবার দুটি রাজ্য বাংলাদেশের একেবারেই সীমান্তবর্তী। পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের কথা বলছি। এই দুটি রাজ্যের নির্বাচন নিয়ে সেই কারণে বাংলাদেশের মানুষের উৎসাহ বেশি। আর প্রাসঙ্গিকতা এবং তাৎপর্যও বেশি। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে এলো, না এআইডিএমকে এলো সেটা সম্পর্কে যে আগ্রহ ঢাকার মানুষের আছে, তার চেয়ে নিশ্চয় বেশি আগ্রহ আসামে বিজেপি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারছে কী পারছে না। সেখানে কংগ্রেসের তরুণ গগৈ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি প্রয়াত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর দল কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে কি না; আর অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১০ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে সেখানে বিজেপি আসবে কি না এই বিষয়গুলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে আগ্রহের। এমনকি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাছে অর্থাৎ শাসকদলের কাছেও বিষয়টা তাৎপর্যপূর্ণ।

এবারে খুব সহজ ভাষায় আমি কিছু সোজাসাপ্টা কথা বলি। একটা ধারণা সাধারণভাবে আছে যে যদি ত্রিপুরার মতো পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি ক্ষমতায় এসে যায়। সে ক্ষেত্রে যেটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার ‘ডাবল ইঞ্জিন’-এর তত্ত্ব বলছেন। তাহলে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ মানে কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের ইঞ্জিন যদি কাজ করে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে তিস্তার চুক্তির ব্যাপারে সম্মতি আদায় করাটা নরেন্দ্র মোদির কাছে এক সেকেন্ডের ব্যাপার হবে। সেখানে আর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোর যে বিবাদ, সেই বিবাদভঞ্জন হয়ে যেতে পারে। সেখানে ক্ষমতায় আসার পরে সঙ্গে সঙ্গে করে নিলে অন্তত ভোট পর্যন্ত আর দেরি না করে, সেটা কৌশলগতভাবে বিজেপির জন্যও ভালো। বাংলাদেশের জন্যও ভালো। যেমন ত্রিপুরায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর খুব সহজে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু বোঝাপড়ার জন্য, সেটা একটা যৌথভাবে সেতু নির্মাণের জন্য হোক বা অন্যদিকে রেল যোগাযোগ, বিদ্যুৎ প্রকল্প—এগুলো এখন অনেক সহজে ত্বরান্বিত হচ্ছে। তাই নরেন্দ্র মোদি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন এই তত্ত্বকে। ত্রিপুরা, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ইতিবাচক দিক পালন করছে। যেটা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে হচ্ছে না। তার কারণ পশ্চিমবঙ্গ এ ব্যাপারে সব সময় নেতিবাচক ভূমিকা নিয়েছে। যেটা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ত্বরান্বিত করতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এটা ভারতের নির্বাচনের ভেতরেও বিজেপির দিক থেকে এটা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারের বিষয়বস্তুও হয়েছে।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে প্রশ্নটা হচ্ছে, সত্যি সত্যি বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে তিস্তা চুক্তি এত সহজে স্বাক্ষরিত হয়ে যাবে? এখানে আরেকটা মত হচ্ছে, যেহেতু এটা একটা মস্তবড় রাজনৈতিক ইস্যু। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস যদি বিরোধী দল, তাহলেও বিরোধী দল হিসেবে তার আসনসংখ্যা শূন্য হয়ে যাবে না। আর সেই দল যদি খুব আক্রমণাত্মক শক্তিশালী বিরোধী দল হয়। তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করতে শুরু করে। যেহেতু সেটাতে বাংলা এবং উত্তরবঙ্গের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। এ কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এটা করতে চাইছেন না। তাহলে সেটা বিজেপির পক্ষেও যদি করা হয়, তাহলে বিজেপির পক্ষেও কিন্তু জনসমর্থন অর্থাৎ দেশের বাইরে বাংলাদেশের সঙ্গে সখ্য রচনা করতে গিয়ে দেশের ভেতরে নিজের রাজ্যে জনসমর্থন হারানোটা কী বিজেপির জন্য কৌশলগত ভালো হবে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলে গেলেও আরো বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে আগামী দিনে বিজেপির জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কারণ হবে। এই প্রশ্নগুলো আছে। পশ্চিমবঙ্গে এখন যে ভোট পর্বটা চলছে, এটা আটটা পর্ব। এ রকম ভোট আমি আগে কখনো দেখিনি। এই এত দিন ধরে নানা রকমের চিত্তাকর্ষক ঘটনা ঘটেছে। তবে এই ভোটের ফলাফল কী হবে সেটা এখনো পর্যন্ত অনিশ্চিত।

আমি সেফোলজিস্টও নই আবার জ্যোতিষীও নই। তাই পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফল কী হবে সেটা বলা আমার পক্ষে উচিত কাজও নয়। কিন্তু এটা বলা যায় যে বিজেপি বিরোধী দল হিসেবে এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তার একটা রাজনৈতিক পরিসর দখল করে নিয়েছে। বিজেপির কোনো অস্তিত্বই পশ্চিমবঙ্গে ছিল না। একটা সময় কংগ্রেস ছিল শাসকদল। আর বিরোধী দল হিসেবে আস্তে আস্তে বামেরা তৈরি হলো। সিপিএম বনাম কংগ্রেস এই রাজনীতিটা দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেছে। কংগ্রেসকে সরিয়ে সিপিএম ক্ষমতায় আসার পর ৩৪ বছর শাসনে ছিল। তারপর সিপিএম চলে যাওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১০ বছরের শাসন। কিন্তু বিরোধী দল হিসেবে কংগ্রেস ও সিপিএম যে জায়গাটা নিতে পারত, সেটা তারা নিতে না পারায় বিজেপি নিয়ে নিয়েছে। বিজেপি জাতীয় রাজনীতিতে একটা সময়ে দুই থেকে ২০০ হয়ে গিয়েছিল। সেটা তাদের সর্বভারতীয় বৃদ্ধি। আবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কিন্তু একটা রাজনৈতিক পরিসর গ্রহণ করল। যেখানে বিজেপির এখন তিনজন এমএলএ। কিন্তু ২০১৯ সালে ১৮ জন সংসদ সদস্য বিজেপি অর্জন করল। ২০১৬ সালে মমতার যে দাপট ছিল, ২০১৯-এ সেটার পরিবর্তন হয়েছে। শতকরা ভোট বিজেপি যেভাবে বাড়িয়েছে, সেটার ধারাবাহিকতাটা বিজেপি এই বিধানসভা নির্বাচনে রাখতে চাইছে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আন্ডারএস্টিমেট করা যায় না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে ভোটব্যাংক তফসিলি ভোটব্যাংক, মুসলমান ভোটব্যাংক, আদিবাসী ভোটব্যাংক সেগুলোকে ভাঙা বিজেপির জন্য এখনো সহজ কাজ নয়। সর্বশক্তি দিয়ে বিজেপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অপসারিত করতে চাইছে। সেই মাস্টার স্ট্র্যাটেজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ২৯৪টি আসনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন, তাতে কি সফলতা আসবে? ১৭০টি আসন পাওয়া বিজেপির জন্য খুব সহজ কাজ নয়।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এবারের পশ্চিমবঙ্গ এবং আসাম নির্বাচন। দুটি রাজ্যে দুইভাবে বিজেপির মতো একটা সর্বভারতীয় দলকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। সেটা হলো নাগরিকত্ব বিল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি অনেক আগেই ঘোষণা করেছিল যে শিগগিরই এই নাগরিকত্ব বিল প্রয়োগ করা হবে। তার ফলে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ বসবাসকারী, যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে আছেন, তাঁদের কলকাতা সংবাদমাধ্যমে বারবার অনুপ্রবেশকারী বলে অভিহিত করা হয়। সেই অনুপ্রবেশকারী হিন্দিতে যেটাকে বলে ‘ঘুষপেটিয়া’, তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। এটা একটা মস্তবড় ইস্যু। যেটা ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কুপ্রভাব ফেলে। এই বিষয়টি এ রকমভাবে রাজনৈতিক মাত্রা পাওয়ায় বেশ সমস্যা দেখা দিয়েছিল। বিজেপির বক্তব্য হলো, ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমান সমাজে সেই অনুপ্রবেশকারীরা মুসলমান। তাঁদেরই ফেরত পাঠানো হবে। হিন্দু শরণার্থীদের রক্ষা করা হবে। কিন্তু এবারে ভোটের সময় কিন্তু দেখা গেছে বিজেপি তাদের ইশতেহারে এই বিষয়টা রেখেছে। এবং বলেছে, ক্ষমতায় এলে প্রথম ক্যাবিনেটে প্রথম সিদ্ধান্ত এটাই হবে। কেননা এটা নিয়ে একটা মস্তবড় ইস্যু করার চেষ্টা বিজেপি করেছিল; কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি।

আবার আসামের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। কেননা সেখানে রাহুল গান্ধী ঘোষণা করেছেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে এই আইন প্রয়োগ করা হবে না। তার ফলে সংখ্যালঘু ভোট অনেক বেশি নিরাপদ বলে মনে করছে। আসামে ১২৬টি বিধানসভা আসন। সেখানে রাজনীতিটা একেবারে অন্য রকম। সেখানে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে এই নাগরিকত্ব বিলের আওয়াজ তুলে। তার ফলে এই মুসলিম এবং কংগ্রেসের জোট পরাস্ত হয়েছে। তার কারণ আসামে আরো বেশি করে এনআরসি কার্যকর করার জন্য বদ্ধপরিকর বিজেপি। তারা এখন সেটা আসামের নির্বাচনে আরো বেশি করে প্রচারও করছে। আর কংগ্রেস বলছে, তারা যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা সেটা আটকাবে। অর্থাৎ মুসলমান সমাজের ভোটটা রাহুল গান্ধী পেতে চাইছেন এই এনআরসি বিরোধিতা করে। ঠিক যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বিরোধিতা করে সংখ্যালঘু ভোটকে সুসংহত করতে চাইছেন। আসামে বিজেপি শাসকদল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিরোধী দল। কিন্তু এনআরসি নিয়ে দুটি রাজ্যে দুই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, প্রধানমন্ত্রী নিজে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটাকে অনেক বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তাঁর মনে হচ্ছে যে এই এনআরসিটা দেশের ভেতরে বিজেপির একটা রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারে। কিন্তু সেটাকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি না হয়, যা ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে। সুতরাং এককথায় পরিস্থিতি বেশ জটিল। তবে আসামে বিজেপি আবার ফিরে আসবে কি না আর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাতে পারবে কি না সেটা জানার জন্য আমাদের ২ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা