kalerkantho

বুধবার । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৯ মে ২০২১। ৬ শাওয়াল ১৪৪

দায়মুক্তি থেকেই মিয়ানমার আর্মির নিষ্ঠুরতার জন্ম

অনলাইন থেকে

১১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আয়ে মিয়াত থু। মিয়ানমারের ১১ বছর বয়সী একটি মেয়েশিশু। সম্প্রতি দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মারা যায় সে। এর কয়েক ঘণ্টা পর তার খেলার পুতুলটিসহ তাকে সমাহিত করা হয়। তার মৃত্যুর এই ভয়াবহতাই মিয়ানমারের একমাত্র ঘটনা নয়। ফেব্রুয়ারি মাসে সংঘটিত সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে চলা বিক্ষোভে যে নৃশংস অভিযান চালানো হচ্ছে, তাতে মিয়াত থুর মতো ৩০টির বেশি শিশু মারা যায়। তাদের মধ্যে একজন পাঁচ বছরের ছেলে এবং নিজ বাড়িতে গুলিতে মারা যাওয়া সাত বছরের একজন মেয়েও রয়েছে।

মিয়ানমারের বিক্ষোভে গত ২৭ মার্চ এক দিনেই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। সব মিলিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বেসামরিক নেতা অং সান সু চি এবং তাঁর দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) থেকে নির্বাচিত অন্য রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁরা জনগণকে যে ক্ষমতা দিয়েছিলেন তা আবার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব মৃত্যু এবং গ্রেপ্তার অভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতির অংশমাত্র। এই অভ্যুত্থানের ফলে মহামারির প্রভাব আরো জটিল হয়ে উঠেছে; এশিয়ার অন্যতম দরিদ্র দেশটির অর্থনীতি এখন মারাত্মক সংকটে।

তাতমাদোর (মিয়ানমার আর্মির দাপ্তরিক নাম) নিষ্ঠুরতায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং আরো ভীতিকর বিষয় হচ্ছে নাগরিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সামরিক শাসনের অধীনে বেড়ে ওঠেনি। তারা বরং হংকং ও থাইল্যান্ডের আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। যদিও অতীতের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনগুলো বন্দুকের নলের মুখে দ্রুত উধাও হয়ে গেছে; কিন্তু এবার অসংখ্য মানুষ মিয়ানমারের রাস্তায় নেমে এসেছে।

তাতমাদোর অবস্থান হচ্ছে নিজেদের সহিংসতা তীব্র করা, যা মানুষকে আরো ক্ষুব্ধ করে তুলছে। এই বিক্ষোভ ব্যাপকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে সংঘটিত হলেও কিছু আন্দোলনকারী সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ঝুঁকছে। মিয়ানমারের জাতিগত সংখ্যালঘুরা দীর্ঘদিন ধরে সামরিক বাহিনীর নিপীড়নের শিকার। গত মাসের শেষের দিকে কারেন যোদ্ধারা একটি সেনাচৌকি দখল করে নেওয়ার পর মিয়ানমার বাহিনী থাই সীমান্তের কাছে বিমান হামলা চালায়। এর মধ্যেই কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপ বলেছে যে তারা গণতন্ত্রের আন্দোলনের পক্ষে থাকবে। এই ঘোষণা এমন সময়ে এলো যখন তাদের মধ্যে একটি অভূতপূর্ব ঐক্য এবং এমনকি তাদের একটি ‘ফেডারেল আর্মি’ গঠন নিয়েও কথাবার্তা চলছে। এর আগে অবশ্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের একাত্মতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রাজনীতিকরা, যা পরে ছুড়ে ফেলা হয়। তাই অর্থ ও অস্ত্রসমৃদ্ধ সামরিক বাহিনী বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

জেনারেলরা এমনভাবে সংবিধান তৈরি করেছেন, যাতে তাঁরা সামরিক বাজেট ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। একই সঙ্গে সু চির দল এনএলডিও শক্ত শিকলে বাঁধা থাকে, যার ফলে নির্বাচনে তাদের দ্বিতীয় ভূমিধস বিজয়ও তাতে পরিবর্তন আনতে পারত না। অনেকে সন্দেহ করছেন যে মিন অং হ্লাইংয়ের সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাঁর দায়িত্বে থেকে যাওয়ার ইচ্ছাই মিয়ানমারকে ভুল পথে নিয়ে যায়। অবশ্য সামরিক বাহিনী এই প্রতিক্রিয়া নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন না হলে তারা ক্ষমতা দখল করতে পারত না।

মিয়ানমারের জেনারেলরা কয়েক দশক ধরেই দায়মুক্তি উপভোগ করে আসছেন। দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সময়ও তারা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে। ২০১৯ সালে জাতিসংঘের একটি তথ্য অনুসন্ধান মিশন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও তার পরিচালিত কম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছিল। তারা সতর্ক করে দিয়েছিল যে সেনা পরিচালিত কম্পানিগুলোর মুনাফা রোহিঙ্গাসহ জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতন চালানোর সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তখন কেউ তা শোনেনি। এখন এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া হয়তো সশস্ত্র বাহিনীর অধিকতর নিষ্ঠুর প্রবণতা দমনের জন্য কিছু একটা করতে পেরেছে— না হওয়ার চেয়েও বিলম্বে হওয়া ভালো।

গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ফিরে না আসা পর্যন্ত মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করেছে। যুক্তরাজ্যও দেশটির সামরিক বাণিজ্যের সঙ্গে লেনদেন আংশিকভাবে ছিন্ন করেছে। তবে ইইউ বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে, তাকে অবশ্যই এখানে ভূমিকা পালন করতে হবে। বাণিজ্যিক কম্পানিগুলো, বিশেষ করে বড় বড় তেল ও গ্যাস কম্পানিগুলোকে অবশ্যই এটা নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের অর্থ যেন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে না যায়। এই দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের প্রতিবেশীদের চাপ দেওয়া, যাতে তারা পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের ফেরত না পাঠায়। তাতমাদোর বিরুদ্ধে হয়তো কোনো চরম আঘাত আসবে না। তবে তাদের অপরাধের প্রতি কোনো উদাসীনতাও থাকতে পারে না।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গাডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা