kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

প্যাকেটজাত খাবারে অজানা হুমকি টল্যুইন

অংশুমান মুখার্জি

৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্যাকেটজাত খাবারে অজানা হুমকি টল্যুইন

বাজার থেকে প্যাকেটজাত কোনো পণ্য কেনার সময় পণ্যটি ব্যবহার বা খাওয়ার জন্য নিরাপদ কি না তা নিশ্চিত করতে আমরা বেশির ভাগ সময় পণ্যের উৎপাদন এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ লক্ষ করি। কিছু ব্র্যান্ড আবার পণ্যে হলোগ্রাম, সিল, প্লাস্টিকের মোডক এবং এজাতীয় সুরক্ষা স্তর যুক্ত করে, যাতে গ্রাহকদের কাছে সুরক্ষিতভাবে আসল পণ্যটি পৌঁছায়। কিন্তু সাধারণভাবে যে বিষয়টি আমাদের চিন্তার বাইরে থাকে তা হচ্ছে, পণ্যের প্যাকেজিং নিজেই পণ্যের গুণগত মান, এমনকি আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। বিভিন্ন প্যাকেজিং উপকরণে ব্যবহৃত মুদ্রণের কালি বিভিন্ন রকম রাসায়নিক পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত জটিল মিশ্রণ, যার মধ্যে কয়েকটি মানবদেহের ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিভিন্ন নকশা ও রং তৈরিতে এবং স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতে মুদ্রণ কালি প্রস্তুতকারকরা উপাদান হিসেবে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে। যদিও এর ভেতর কিছু রাসায়নিক হলেও নিরাপদ বলে প্রমাণিত, তবে অনেক সময় প্যাকেজিংয়ে সস্তা বিকল্প ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হয়।

এমন উপাদানগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় টল্যুইন। এই বর্ণহীন তরল পদার্থটি রং, রং পাতলাকরণ, নেইলপলিশ এবং বার্নিশের বৃহৎ স্কেলে উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান। এটি মুদ্রণ কালি উৎপাদনের মূল উপাদান। ক্ষতিকর দিকগুলো আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘদিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সস্তা উপাদান হিসেবে টল্যুইন ব্যবহার করে আসছিল। বিষাক্ততার জন্য টল্যুইন সারা বিশ্বে অসমাদৃত। এর নানা ধরনের ক্ষতিকর দিক কার্যক্রমগত এবং ভোক্তা সুরক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিষাক্ততার জন্য টল্যুইন ইউরোপীয় ইউনিয়নে সিএমআর (কার্সিনোজেনিক, মিউটাজেনিক, রেপ্রোটক্সিক) ক্যাটাগরি-২ (অনাগত সন্তানের ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়) শ্রেণিভুক্ত। বিরূপ প্রকৃতির বিষাক্ত উপাদান থাকার কারণে নেসলে, পারফেটি, ফেরেরো, রিগলিস এবং আরো অনেক বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের পণ্যের খাবার প্যাকেজিংয়ে যে কালি ব্যবহৃত হয়, তা তৈরিতে টল্যুইনের ব্যবহার সীমাবদ্ধ অথবা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। বিভিন্ন উন্নত দেশের মতো ভারত, চীনসহ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো খাদ্য প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত কালিতে টল্যুইনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে টল্যুইন মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর আশঙ্কাজনক প্রভাব ফেলতে পারে। টল্যুইন সহজেই রক্ত-মস্তিষ্কের বাধা অতিক্রম করতে পারে এবং মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, হ্যালুসিনেশন, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং বিভ্রান্তির মতো বিভিন্ন অসুস্থতার কারণ হতে পারে। টল্যুইনের ফলে অন্য যেসব স্বাস্থ্যহানি ঘটতে পারে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হচ্ছে ওটোটক্সিসিটি। এটি উৎপাদন শ্রমিকদের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ কারখানার শব্দে ওটোটক্সিক প্রভাব আরো তীব্র হয় এবং ফলস্বরূপ মানুষ সম্পূর্ণ বধির হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া এর ফলে মুখ, চোখ, গলায় জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট এবং ত্বকে জ্বালাপোড়া হতে পারে। টল্যুইন এক প্রকার স্লিপিং ড্রাগ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সিঙ্গাপুরে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মহামারির মতো এটি ছড়িয়ে পড়েছে এবং আমেরিকার ৩-৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী গেটওয়ে ড্রাগ হিসেবে টল্যুইন ব্যবহার করছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, টল্যুইনের ব্যাপারে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেমন? উত্তর হচ্ছে, কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে টল্যুইন ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। দেশীয় কালি উৎপাদনকারীদের এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠিত নিয়ম মেনে চলতে হয় না, যা কি না মানুষকে টল্যুইনের যেকোনো ঝুঁকি থেকে রক্ষা করবে। যেসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কালি আমদানি করে তাদের কোনো টল্যুইন ফিল্টারেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। মোটকথা, বাংলাদেশে আমরা এমন অগণিত জিনিস প্রতিদিন ব্যবহার করে যাচ্ছি, যেগুলো আমাদের অজান্তে নীরব ঘাতকের মতো স্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি করছে।

যেসব দেশ টল্যুইনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে বা আংশিকভাবে সীমাবদ্ধ করেছে, তারা বিকল্প উপাদান ব্যবহার করছে। অন্য বিভিন্ন সলভেন্ট কার্যকর উপায়ে টল্যুইনকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। এ কারণে এখন অনেক দেশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টল্যুইনমুক্ত খাবার প্যাকেজিংয়ের নির্দেশ দিচ্ছে। বাংলাদেশে কয়েকটি সচেতন ব্র্যান্ড এরই মধ্যে টল্যুইনমুক্ত কালি ব্যবহার শুরু করেছে। তবে এখন একটি সঠিক নীতিমালা প্রয়োজন।

জাতি হিসেবে পণ্য নিরাপত্তা মানদণ্ডকে উন্নীত করতে আমাদের আইনকে বৈশ্বিক মানের সঙ্গে তুলনা করে এগোতে হবে। পেশাগত সুরক্ষায় ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা না হলে মানব স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করে সম্প্রতি ভারত খাদ্য প্যাকেজিং উপকরণে ব্যবহৃত কালির ক্ষেত্রে টল্যুইন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। এটি হালকাভাবে নেওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। মুদ্রণ কালিতে টল্যুইনের ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে দেশে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

 

লেখক : কান্ট্রি হেড, জিগওয়ার্ক বাংলাদেশ লিমিটেডং

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা