kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩০ চৈত্র ১৪২৭। ১৩ এপ্রিল ২০২১। ২৯ শাবান ১৪৪২

ইয়েমেন এবং খাশোগির উপাখ্যান

অনলাইন থেকে

৯ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



২০১৮ সালের ২ অক্টোবর গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি ইস্তাম্বুলের সৌদি কনসুলেটে প্রবেশ করেন। প্রবেশের কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি খুন হন এবং তাঁর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করা হয়, তাঁর দেহাবশেষ খুঁজেই পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে রিয়াদের অনেক গল্প চালু আছে। একটা কাহিনিতে বলা হয়েছে, এটা (খাশোগি হত্যাকাণ্ড) একটা নাখাস্তা ঘটনা; সিআইএ দ্রুত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান খাশোগি হত্যাকাণ্ড অনুমোদন করেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প, তরুণ যুবরাজের ‘সুহৃদ’ হওয়ায় অন্য রকম কথা বললেন এবং তাঁর ব্যাপারে কোনো রকম ব্যবস্থা নিতে অস্বীকার করলেন।

জো বাইডেন—তখন তিনি প্রেসিডেনশিয়াল ক্যান্ডিডেট—জোর গলায় বললেন যে তিনি সৌদি আরবকে এর মূল্য চোকাতে বাধ্য করবেন এবং সৌদিকে সত্যিকার অর্থে তারা যে রকম ‘দুর্বৃত্ত’ সে রকমই তাদের পরিণত করবেন। এখন যখন তাঁর নিজের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করার কথা, মনে হচ্ছে তিনি তাঁর মন পরিবর্তন করেছেন।

সম্প্রতি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ওয়াশিংটন ওই হত্যাকাণ্ড বিষয়ক একটি ইন্টেলিজেন্স অ্যাসেসমেন্ট ডিক্লাসিফাই করেছে; প্রেসিডেন্ট (বাইডেন) যুবরাজকে এড়িয়ে চলবেনও, তিনি শুধু আলাপ-আলোচনা করবেন বাদশাহ সালমানের সঙ্গে। কিন্তু যুবরাজ মোহাম্মদ ‘খাশোগি নিষেধাজ্ঞায়’ পড়বে কি না সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি যুক্তরাষ্ট্র, এই নিষেধাজ্ঞা ৭৬ জন সৌদি কর্মকর্তার ভিসার ওপর আরোপ করা হয়েছে; এর অর্থটা পরিষ্কার—বাণিজ্য আলোচনা চলবে যথারীতি, এতে পরিবর্তন সামান্যই।

বাস্তবতা হচ্ছে যুবরাজ শুধু দৈনন্দিন কাজের বিষয়াদিই দেখছেন না, বরং ৩৫ বছরের এই যুবক বৃদ্ধ এবং অসুস্থ রাজার উত্তরাধিকারীও বটে। তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবেলায় নিষ্ঠুরও বটে, যুবরাজ হিসেবে তাঁর পূর্বসূরি মোহাম্মদ বিন নায়েফ এখন কারান্তরিন। যুবরাজ মোহাম্মদের কর্মকাণ্ডে একদিকে যেমন সৌদি রাজপরিবারে টেনশন রয়েছে এবং রাজপরিবারে বিভাজন বেড়েছে, অন্যদিকে ক্ষমতার ওপর যুবরাজের নিয়ন্ত্রণও বেড়েছে। ওয়াশিংটন জানে, আসন্ন দিনে যুবরাজের সঙ্গে তাঁর হয়তো কাজ করতে হবে দশকের পর দশক। বাইডেন হয়তো যুবরাজকে ডাকবেন না, কিন্তু তাঁর শীর্ষ কর্মকর্তারা ডাকবেন।

খাশোগির ব্যাপারে হল্লাগোল্লা করছে মূলত রাজনীতিকরা এবং সিআইএর সাবেক পরিচালক জন ব্রেনানের মতো লোকেরা, ক্ষুব্ধ এবং ভীত সৌদি ভিন্ন মতাবলম্বীদের কাছ থেকেও আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সপ্তাহ কয়েক আগে একজন উধাও হয়ে গেল অটোয়ায় সৌদি দূতাবাস দেখতে গিয়ে, রহস্যজনকভাবে সে আবার হাজির হলো সৌদি আরবে। অ্যাগনেস কালামার্ড জাতিসংঘের হয়ে খাশোগি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করেছেন; তিনি বলেছেন, চরম বিচারহীনতার বার্তা ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রয়েছে। যুবরাজ চরম বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া উচিত। কিন্তু হচ্ছে কী? এরই মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িত লোকেরা যারা সাংবাদিক খাশোগি হত্যার পর সৌদি আরব থেকে দূরে সরে গিয়েছিল, তারা আবার সৌদি আরবের দিকে ঝুঁকছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন আর সৌদি তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়, একসময় যেমন ছিল; তবে তারা দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাসঙ্গী হিসেবে দেখে। নতুন প্রশাসনের (মার্কিন) কাছে নামমাত্র ছাড় দিয়েছে রিয়াদ, সেই ছাড়ের মধ্যে রয়েছে উইমেন রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট লোয়াইন আল-হাছলুলকে মুক্তি দেওয়া; একই সঙ্গে তাঁর ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা আছে। আর অন্যদের জেলে পোড়া হয়েছে। কারণ এসব কিছুই প্রবল প্রশংসিত আধুনিকায়ন—যুবরাজ মোহাম্মদের তত্ত্বাবধানে সম্পাদিত। এ আধুনিকায়ন দেশে অনেক বেশি নিপীড়নমূলক এবং বিদেশের মাটিতে এটা লাগাম আচরণের প্রকাশ।

ইয়েমেনে যুদ্ধের সূচনাকারী যুবরাজ মোহাম্মদ; রিয়াদ এখন ওই ঘটনার জন্য অনুশোচনা করছে এবং এর থেকে বেরিয়ে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। হাজার হাজার বিমান হামলা, অসংখ্য স্কুল-হাসপাতাল-বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার পরও হুতি ব্রিদ্রোহীদের দমানো যায়নি। একের পর এক ভূমি তাদের দখলেই যাচ্ছে। এটা একটা জটিল এবং মরণপণ গৃহযুদ্ধ; এটাতে বহু পক্ষ জড়িত, দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও এতে জড়িত রয়েছে। এ যুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের সংঘাত; বেসামরিক নাগরিকরা পরবর্তী ভাবনার বিষয়। প্রেসিডেন্ট বাইডেন নতুন দূত নিয়োগ করেছেন এবং বলেছেন, এ যুদ্ধের অবশ্যই অবসান হতে হবে; তাঁর এজেন্ডায় অন্যান্য প্রসঙ্গ গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি।

যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সৌদি-প্রণোদিত উদ্যোগে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করেছে এবং আক্রমণাত্মক অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করেছে, যদিও তারা বলেছে, এখনো তারা প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র বিক্রি করবে সৌদির কাছে—কথা হচ্ছে ‘দ্য ডেভিল উইল বি ইন দ্য ডিটেইল’। বিপরীতে যুক্তরাজ্য রিয়াদে অস্ত্র পাঠানো অব্যাহত রাখার বিবমিষাকর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অথচ এ বছর ইয়েমেনে সহায়তা ৫০ শতাংশ কমিয়েছে। ফলে মানবিক দুর্যোগ আরো খারাপ পরিস্থিতির দিকে গেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, লাখ লাখ লোক প্রচণ্ড অভাবে আছে, এ সময়ে সহায়তা কর্তন করা মৃত্যুদণ্ডের শামিল।

যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্ত খুবই লজ্জাজনক; এটা শুধু এ কারণে নয় যে যুক্তরাজ্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইয়েমেনের অছি (পেনহোল্ডার)। দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে তার ভূমিকা খুবই নগণ্য। লজ্জার আরেকটা কারণ যুক্তরাজ্য সৌদি নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনের সরবরাহকারী এবং সমর্থক। মিস্টার বাইডেন যথার্থভাবেই সমালেচিত হয়েছেন। কারণ তিনি সৌদিকে শায়েস্তা করার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছেন। যুক্তরাজ্যে দেখে করুণা হয়, ক্রমান্বয়ে তারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে—ইয়েমেনিদের জীবন নিয়ে তাদের চরম অবজ্ঞার কারণেই এটা হয়েছে।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান ইউকে অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য