kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

শিক্ষা ব্যবস্থাপনার গভীরতা অনুভব করুন

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শিক্ষা ব্যবস্থাপনার গভীরতা অনুভব করুন

বাংলাদেশের মতো আর কটা দেশ আছে আমার জানা নেই, যেখানে বিভিন্ন যুগপর্বের সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালকরা শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে অ্যাডহক ভিত্তিতে দেখেছেন এবং দেখেন। আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণে যে প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার মানুষ সরকার টিকিয়ে রাখার ভূমিকা পালন করতে পারে, তারাই সবক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই নীতিনির্ধারকরা পানির ওপরের স্তরটিতে তৃপ্ত থাকেন, পুকুর বা নদীর গভীরের দিকে দৃষ্টি দেন না। এই সক্ষমতা থাকতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব থাকতে হয় শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের হাতে। কিন্তু তাঁরা কখনো গুরুত্ব পাননি। সব কিছুতে রাজনৈতিকীকরণের অন্ধত্ব কাম্য লক্ষ্য অর্জন করতে দেয়নি। বর্তমান সরকার কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে বটে; কিন্তু তা লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়। শুধু সাক্ষরতার হার বাড়লে আর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা যুক্ত করলেই শিক্ষার উন্নয়ন হয় না। ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষাকাঠামোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তাই প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত পরিমার্জনা করা হয় সবচেয়ে মনোযোগে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সরকারের গুরুত্বের তালিকার সবচেয়ে ওপরে থাকেন।

পাশাপাশি আমাদের অবস্থাটা কেমন তা আমার এক সহকর্মীর ভাষায় বলি—তিনি বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পাশে দুটো সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। উত্তরে সাভার সেনানিবাস আর দক্ষিণে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা পিএটিসি। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেন আর বিসিএস উত্তীর্ণ ক্যাডাররা প্রশিক্ষণ নিতে পিএটিসিতে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া সেনানিবাসের পরিচালনায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রথমে হয়তো অবাক হয়ে দেখেন এই দুই প্রতিষ্ঠানকে। অনেক গুণ বেশি আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা উপকরণ রয়েছে সেখানে, যা তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনে দেখেননি।’ অর্থাৎ গভীরের দূষিত পানির শুদ্ধতা রক্ষার পরিচর্যা না করে উপরিকাঠামোকে ঝলমলে করা হচ্ছে।

এ দেশের নীতিনির্ধারণ অনেকটা চলমান ইতিহাস বোধের মতো হয়ে গেছে। অনেক শিক্ষিত মানুষও বুঝতে চান না, ডাক্তারি বিদ্যার মতো ইতিহাস বিদ্যারও নানা ভাগ রয়েছে। কেউ প্রাচীন বাংলার, কেউ মধ্যযুগের, আবার কেউ আধুনিক যুগের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ হতে পারেন। এরপর কেউ রাজনৈতিক ইতিহাস, কেউ শিল্প ইতিহাস, কেউ অর্থনৈতিক ইতিহাস আবার কেউ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পণ্ডিত হতে পারেন। চোখের ডাক্তারকে দিয়ে যে দাঁতের চিকিৎসা করা যায় না, সে সত্যটি তো বুঝতে হবে। এতে মাঝে মাঝে হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমাদের জাতীয় জাদুঘরের বিশাল পরিচালনা পর্ষদের তালিকা দেখিয়ে জাদুঘরের একজন সাবেক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুললেন, এখানে জাদুঘর, বিশেষ করে প্রাচীন ও মধ্যযুগের শিল্প ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব অভিজ্ঞ একজনকেও কি খুঁজে পাবেন? তাহলে কেমন করে লাগসই নীতি নির্ধারিত হবে এখান থেকে!

অন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। বেশ কয়েক বছর আগের কথা, মহাস্থানগড় প্রত্ন অঞ্চল নিয়ে কাগজে খুব লেখালেখি হচ্ছিল। মহাস্থানগড়ে অবস্থিত শাহ সুলতান বলখীর মাজারে দর্শনার্থীদের দানে প্রচুর টাকা জমা পড়ে। তাই মাজার কমিটিতে থাকা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের নজর সেদিকে। এই সূত্রে মাজার কমিটি প্রত্ন আইন ভেঙে মাজারের পাশে মহিলা দর্শনার্থীদের থাকার জন্য চারতলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা মানছে না তারা। মিডিয়ার প্রচারের কারণে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই সময়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন সরকারের একজন যুগ্ম সচিব। অধিদপ্তরের অনেক বিশেষজ্ঞ কমিটিতে আমাকে মাঝে মাঝে দায়িত্ব পালন করতে হয়। আমার দেখা এই মহাপরিচালক প্রত্নসম্পদ রক্ষার ব্যাপারে বেশ আন্তরিক ছিলেন। তিনি হতাশ হয়ে আমাকে ফোন করলেন। উচ্চ আদালতের করা তদন্ত কমিটি দেখে তিনি হতাশ। মহাস্থানগড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলের বিষয়ে কমিটিতে থাকার কথা ফিল্ড আর্কিওলজিস্ট, প্রত্নতাত্ত্বিক, শিল্প ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ। কমিটি গঠন করা হলো একজন পরিচিত ইতিহাসবিদকে দিয়ে, যাঁর একাডেমিক বিদ্যার সঙ্গে প্রত্নতত্ত্বের সম্পর্ক নেই। সেই সঙ্গে যুক্ত করা হলো কয়েকজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম, যাঁদের কারো প্রত্নস্থল-সংশ্লিষ্ট তদন্তের প্রয়োজনে একাডেমিক যোগাযোগ থাকার কথা নয়। এরপর হয়তো মনে হয়েছে এমন কমিটিতে প্রত্নতত্ত্ববিদ না থাকলে কেমন হয়। তখন বলা হলো যুক্ত থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অস্তিত্বই নেই।

আমাদের দেশে জ্ঞানচর্চা এই পর্যায়ে নেমে এসেছে, কারণ শিক্ষা ব্যবস্থাপনা তার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। আমগাছ থেকে কি আর কাঁঠাল আশা করা যায়! এত কথা মাথায় এলো সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া, হল খুলে দেওয়া আর পরীক্ষা চালু রাখার জন্য বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলন এবং সেই সঙ্গে সরকারি নীতির পেন্ডুলাম দশা দেখে।

এ সত্য মানতে হবে, মারণঘাতী করোনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। করোনার করালগ্রাসে সারা পৃথিবীই পর্যুদস্ত। এমন অবস্থায় বর্তমান সরকার অনেকটা দৃঢ়তার সঙ্গেই করোনা মোকাবেলা করেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। সরকার অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে সাহসিকতার সঙ্গে কারো সমালোচনা না শুনে অনেক আগেই পোশাক কারখানাগুলো চালু করে দিয়েছে। কারখানা মালিকরাও সচেতন থেকেছেন স্বাস্থ্যবিধি মানিয়ে চলায়। ধীরে ধীরে দেশের অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সবই স্বাভাবিক হয়ে যায়। এতে যে দেশে করোনার হার বেড়ে গেছে তেমন শোনা যায়নি। বরং ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে থাকে করোনা। শুধু বন্ধ রয়ে গেল সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই হয়তো তা করা হয়েছে। এক বছর বন্ধ থাকার ক্ষতি যে কত তা সংশ্লিষ্টরা যতটা অনুধাবন করতে পারেন, অন্যদের পক্ষে হয়তো সেভাবে সম্ভব নয়। ভার্চুয়াল পড়ালেখা সর্বত্র সাফল্য এনে দিতে পারেনি। এটি সত্য যে জীবনের দায় সবচেয়ে বেশি। তেমন পরিস্থিতি হলে হয়তো আরো অনেক কাল বন্দিজীবন কাটাতে হতো। মেনে নিতে হতো দুর্ভাগ্য। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যখন দেখছে দেশের সব কিছু স্বাভাবিক চলার পরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে সরকারের তেমন উদ্যোগ নেই, তখন ধৈর্যহারা হওয়ারই কথা। দেশে টিকা প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ধারণা ছিল, শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে টিকার ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী (যতটা বয়স পর্যন্ত টিকা দেওয়া সম্ভব) অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু সরকার তখনো সে পথে হাঁটেনি। শিক্ষার্থীদের ধৈর্যহারা হওয়ার পেছনে মন্ত্রণালয়ের একটি দুর্বল সিদ্ধান্তও দায়ী। সাধারণ ধারণা তৈরি হয়েছিল, হয়তো ঈদুল ফিতরের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে যাবে। কিন্তু সরকারপক্ষ থেকে নিশ্চিত ধারণা দেওয়া হচ্ছে না। শুধু একের পর এক ছুটি বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি হচ্ছে। অবশেষে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর চাপে পড়ে ঠিকই তো হল খোলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার নির্দিষ্ট তারিখের ঘোষণা এলো। এই নিশ্চয়তাটুকুই শিক্ষার্থীরা পেতে চেয়েছিল। আমরা মনে করি, অযথা ষড়যন্ত্র থিওরিতে না গিয়ে দূরদর্শিতা প্রয়োগ জরুরি ছিল মন্ত্রণালয়ের।

দ্বিতীয় অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত হলো, হলে ওঠা ঠেকাতে গিয়ে অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে সব পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া। সরকারপক্ষের খবর রাখা উচিত ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কভিডের আগে আটকে থাকা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষা শেষ করার উদ্যোগ নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পরীক্ষা সম্পন্ন করে আসছিল। এতে কভিড ছড়িয়ে গেছে এমন প্রমাণও নেই। অনেকেই এক-দুটি সপ্তাহ পেলেই শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে পারত। এমন অবস্থায় নির্বাহী ঘোষণা দিয়ে দু-তিন মাসের জন্য সব পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া আমাদেরও কম বিস্মিত করেনি। দেখলাম, অগত্যা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে অসমাপ্ত পরীক্ষা চালানোর অনুমতি দিতে।

শিক্ষা নিয়ে এই ধারার হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিভিন্ন যুগপর্বেই আমাদের দেখতে হয়েছে। এ কারণেই আমাদের মনে একটি ধারণা স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে যে শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে যেমন দক্ষতার সঙ্গে দেখতে হয়, উপরিকাঠামো নয়, গভীর থেকে অনুভব করে নীতিনির্ধারণ করতে হয়—সে কথা আমাদের বিধায়করা তেমনভাবে ভাবেন না। চমক দিয়ে আর যা-ই অর্জন করা যায়, ভিত্তি শক্ত করা যায় না।

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য